জিকির বান্দা ও রবের মধ্যকার দূরত্ব কমিয়ে দেয়

প্রতীকী ছবি
মানুষের জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক মুহূর্তগুলো সবসময় অভাবের কারণে আসে না। কখনো কখনো সবকিছু থাকার পরও হৃদয়ের ভেতর এক অদৃশ্য শূন্যতা বাসা বাঁধে। চারপাশে মানুষ থাকে, তবু নিজেকে নিঃসঙ্গ মনে হয়। মুখে হাসি থাকে, অথচ অন্তরে জমে থাকে অজানা বিষাদ। এমন অবস্থায় পৃথিবীর কোনো বিনোদন, কোনো সম্পদ কিংবা কোনো প্রশংসা মানুষের হৃদয়কে স্থায়ী প্রশান্তি দিতে পারে না। কারণ মানুষের হৃদয় এমন এক সত্তার দিকে মুখাপেক্ষী, যিনি মানুষের স্রষ্টা, পালনকর্তা এবং আশ্রয়স্থল। আর সেই সত্তার সঙ্গে সম্পর্ককে জীবন্ত রাখার সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যমগুলোর একটি হলো জিকির।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ
‘জেনে রাখো, আল্লাহর জিকিরের মাধ্যমেই হৃদয়সমূহ প্রশান্তি লাভ করে।’ (সূরা রা‘দ, আয়াত : ২৮)
এ আয়াত শুধু একটি ধর্মীয় নির্দেশনা নয়, বরং মানব-মনস্তত্ত্বের এক চিরন্তন সত্য। মানুষের হৃদয় প্রকৃত প্রশান্তি খুঁজে পায় তখনই, যখন সে তার রবের স্মরণে নিমগ্ন হয়। কারণ মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে আল্লাহর ইবাদতের জন্য, আর জিকির হলো সেই ইবাদতের প্রাণ।
আমরা যখন পাপ করি, গাফিলতিতে ডুবে যাই, দুনিয়ার মোহে হারিয়ে যাই, তখন আমাদের হৃদয়ের ওপর অদৃশ্য পর্দা জমতে থাকে। মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
كَلَّا بَلْ ۜ رَانَ عَلَىٰ قُلُوبِهِم مَّا كَانُوا يَكْسِبُونَ
‘বরং তাদের কৃতকর্মের কারণে তাদের অন্তরের ওপর মরিচা পড়ে গেছে।’ (সূরা মুতাফফিফীন, আয়াত : ১৪)
এই মরিচা দূর করার অন্যতম কার্যকর উপায় হলো জিকির। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
إِنَّ لِكُلِّ شَيْءٍ صِقَالَةً وَإِنَّ صِقَالَةَ الْقُلُوبِ ذِكْرُ اللَّهِ
‘প্রত্যেক বস্তুর একটি পালিশ বা মরিচা দূর করার উপায় আছে, আর অন্তরের পালিশ হলো আল্লাহর জিকির।’ (সুনানে বায়হাকি, শুআবুল ঈমান)
মানুষ যখন আল্লাহকে ভুলে যায়, তখন সে নিজের প্রকৃত পরিচয়ও ভুলতে শুরু করে। পবিত্র কোরআনে সতর্ক করা হয়েছে,
وَلَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ نَسُوا اللَّهَ فَأَنْسَاهُمْ أَنْفُسَهُمْ
‘তোমরা তাদের মতো হয়ো না, যারা আল্লাহকে ভুলে গেছে; ফলে আল্লাহ তাদের নিজেদেরকেই ভুলিয়ে দিয়েছেন।’ (সূরা হাশর, আয়াত : ১৯)
জিকিরের সবচেয়ে মর্মস্পর্শী দিক হলো, এটি শুধু বান্দার পক্ষ থেকে আল্লাহকে স্মরণ করা নয়; বরং এর প্রতিদানে আল্লাহও বান্দাকে স্মরণ করেন। মহান আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন,
فَاذْكُرُونِي أَذْكُرْكُمْ
‘তোমরা আমাকে স্মরণ করো, আমিও তোমাদের স্মরণ করব।’ (সূরা বাকারা, আয়াত : ১৫২)
ভাবুন, কোটি কোটি মানুষের রব, আসমান-জমিনের মালিক, আরশের অধিপতি, তিনি একজন দুর্বল বান্দাকে স্মরণ করছেন! একজন মুমিনের জন্য এর চেয়ে বড় সম্মান আর কী হতে পারে?
সহিহ বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত হাদিসে কুদসিতে মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
وَإِنْ ذَكَرَنِي فِي نَفْسِهِ ذَكَرْتُهُ فِي نَفْسِي، وَإِنْ ذَكَرَنِي فِي مَلَإٍ ذَكَرْتُهُ فِي مَلَإٍ خَيْرٍ مِنْهُمْ
‘সে যদি আমাকে মনে মনে স্মরণ করে, আমিও তাকে মনে মনে স্মরণ করি। আর যদি সে আমাকে কোনো সমাবেশে স্মরণ করে, আমি তাকে তার চেয়ে উত্তম সমাবেশে স্মরণ করি।’ (বুখারি, ৭৪০৫; মুসলিম, ২৬৭৫)
এ কারণেই ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেছেন, ‘জিকির হৃদয়ের জন্য ঠিক তেমন, যেমন মাছের জন্য পানি। পানি ছাড়া মাছের অবস্থা যেমন হয়, জিকির ছাড়া মানুষের হৃদয়ের অবস্থাও তেমন।’ (আল-ওয়াবিলুস সাইয়্যিব)
মানুষ যখন দুঃখে ভেঙে পড়ে, তখন অনেকেই আশ্রয় খোঁজে মানুষের কাছে। অথচ সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় হলো আল্লাহর স্মরণ। কত মানুষ আছে, যারা গভীর রাতে ঘুমাতে পারে না, বুকভরা অস্থিরতা নিয়ে বিছানায় এপাশ-ওপাশ করে। কিন্তু যখন তারা তাসবিহ হাতে নেয়, অথবা নীরবে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ উচ্চারণ করতে থাকে, তখন অন্তরে এক ধরনের প্রশান্তি নেমে আসে, যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।
ইমাম ইবন তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলতেন, ‘দুনিয়াতে একটি জান্নাত আছে। যে ব্যক্তি সেই জান্নাতে প্রবেশ করতে পারেনি, সে আখিরাতের জান্নাতেও প্রকৃত স্বাদ অনুভব করতে পারবে না।’
তার শিষ্যরা ব্যাখ্যা করেছেন, তিনি এখানে আল্লাহর স্মরণ, ভালোবাসা এবং নৈকট্য থেকে অর্জিত হৃদয়ের প্রশান্তির কথা বুঝিয়েছেন।
জিকির শুধু একটি ইবাদত নয়; এটি বান্দার সঙ্গে রবের সম্পর্ককে পুনর্জীবিত করার মাধ্যম। যখন মানুষ বারবার ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ বলে, তখন সে শুধু ক্ষমা চায় না; বরং সে তার রবের দরজায় ফিরে আসে। যখন সে ‘সুবহানাল্লাহ’ বলে, তখন সে তার রবের পবিত্রতা ঘোষণা করে। যখন সে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলে, তখন সে তার রবের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। আর যখন সে ‘আল্লাহু আকবার’ বলে, তখন সে পৃথিবীর সব ভয়, সব দুশ্চিন্তা, সব শক্তির ওপরে আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্বকে স্বীকার করে।
হাসান আল-বাসরী (রহ.) বলেছেন, ‘তোমরা জিকিরের মাধ্যমে ঈমানের মাধুর্য অনুসন্ধান করো।’ কারণ জিকির এমন একটি আমল, যা ধীরে ধীরে হৃদয়কে নরম করে, চোখে অশ্রু আনে এবং আত্মাকে আল্লাহমুখী করে তোলে।
আজকের যুগে প্রযুক্তি মানুষকে মানুষের কাছে এনেছে, কিন্তু অনেককে তার রব থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। এই দূরত্ব দূর করার জন্য প্রয়োজন অন্তরের জাগরণ, আর সেই জাগরণের সবচেয়ে সহজ ও শক্তিশালী উপায় হলো জিকির।
তাই আসুন, আমরা শুধু ঠোঁটের জিকিরে সীমাবদ্ধ না থেকে হৃদয়ের জিকিরে অভ্যস্ত হই। পথ চলতে, কাজ করতে, অবসরে, নিভৃতে, আনন্দে, দুঃখে, সর্বাবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করি। কারণ জিকির এমন এক নূর, যা অন্ধকার হৃদয়কে আলোকিত করে; এমন এক সেতু, যা বান্দাকে তার রবের নৈকট্যের দিকে নিয়ে যায়; এমন এক ওষুধ, যা আত্মার ক্ষত সারিয়ে তোলে।
যে হৃদয় আল্লাহর জিকিরে জীবিত থাকে, সে হৃদয় কখনো সত্যিকার অর্থে একা নয়। আর যে বান্দা তার রবকে স্মরণ করে, সে একসময় অনুভব করে, গাফিলতের সব দেয়াল ভেঙে যাচ্ছে, পাপের সব কুয়াশা সরে যাচ্ছে, আর তার ও তার রবের মধ্যকার দূরত্ব ক্রমেই কমে আসছে। তখন তার অন্তর থেকে একটি আর্তি উচ্চারিত হয়: ‘হে আল্লাহ! আপনার স্মরণ ছাড়া আমার হৃদয়ের আর কোনো আশ্রয় নেই।’
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক


