Agamir Somoy E-Paper
শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬
আগামীর সময়
জনকল্যাণে বাবা-ছেলের দৃষ্টান্ত
শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬
আগামীর সময়
  • সর্বশেষ
  • জাতীয়
  • রাজনীতি
  • অর্থনীতি
  • চট্টগ্রাম
  • সারা দেশ
  • বিদেশ
  • খেলা
  • বিনোদন
  • লাইফস্টাইল
  • মতামত
  • ফিচার
  • ভিডিও
  • শিক্ষা
  • ক্লাব
  • বিচিত্রা
  • চাকরি
  • ছবি
  • সাহিত্য
  • বিবিধ
  • ধর্ম
  • প্রবাস
  • ফ্যাক্টচেক
  • সোশ্যাল মিডিয়া
  • ধন্যবাদ
  • বিশেষ সংখ্যা
  • সর্বজনের গল্প
  • বিশেষ লেখা
EN
  • সর্বশেষ
  • জাতীয়
  • রাজনীতি
  • অর্থনীতি
  • চট্টগ্রাম
  • সারা দেশ
  • বিদেশ
  • খেলা
  • বিনোদন
  • লাইফস্টাইল
  • মতামত
  • ফিচার
  • ভিডিও
  • শিক্ষা
  • ক্লাব
  • ইপেপার
  • EN
লোড হচ্ছে…

প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক : আবদুস সাত্তার মিয়াজী

সম্পাদক : মোস্তফা মামুন

আগামীর সময়
আমাদের সম্পর্কেযোগাযোগশর্তাবলিগোপনীয়তাআমরা

ইডিবি ট্রেড সেন্টার (লেভেল-৬ ও ৭), ৯৩ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ানবাজার, ঢাকা-১২১৫

যোগাযোগ: ০৯৬৬৬ ৭৭১০১০

বিজ্ঞাপন: ০১৭৫৫ ৬৫১১৬৪

[email protected]

স্বত্ব © ২০২৬ | দৈনিক আগামীর সময়

advertiseadvertise
আগামীর সময় ইসলাম

উম্মে আম্মারাহ (রা.) : ঈমান, আত্মত্যাগ ও সংগ্রামের এক অনন্য ইতিহাস

মুফতি সাইফুল ইসলাম
মুফতি সাইফুল ইসলাম
agamir somoy
প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬, ১৩:২৬
উম্মে আম্মারাহ (রা.) : ঈমান, আত্মত্যাগ ও সংগ্রামের এক অনন্য ইতিহাস

প্রতীকী ছবি

ইসলামের প্রথম যুগের মুসলিম মনীষীদের হৃদয় আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)-এর ভালোবাসায় পরিপূর্ণ ছিল। সেই ভালোবাসার কারণে মুসলিমরা দ্বীনের দাওয়াত ও ইসলাম প্রচারের জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে নিজেদের মূল্যবান ও প্রিয় সবকিছু উৎসর্গ করেছিলেন। তাঁরা এ পথে এমন সব মহান বীরত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন, যা ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম তাঁদের উত্তরসূরিদের সেসব গৌরবময় জীবনকাহিনি বর্ণনা করেছে। এভাবেই সিরাতের পাতাগুলো সম্মানিত সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর জীবন থেকে অসংখ্য আলোকোজ্জ্বল চিত্রে সমৃদ্ধ হয়েছে।

দীনের দাওয়াতে নিজেদের সময়, শ্রম ও আন্তরিক আত্মত্যাগের শ্রেষ্ঠ অংশটুকু উৎসর্গকারী সাহাবিয়াদের মধ্যে ছিলেন মহীয়সী উম্মে আম্মারাহ (রা.)। তিনি নিজ ত্যাগ ও আত্মোৎসর্গের দৃষ্টান্ত স্থাপন করে প্রত্যেক যুগের মুসলিম নারীর জন্য রেখে গেছেন উজ্জ্বল শিক্ষা। একজন মুসলিম নারীর জীবন কেমন হওয়া উচিত এবং তার দায়িত্ব কী হওয়া উচিত। এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুজতেই আমরা এই মহান নারীর জীবন সম্পর্কে সংক্ষেপে কিছু আলোকপাত করার চেষ্ঠা করবো ইনশাআল্লাহ।

উম্মে আম্মারাহ (রা.)-এর অবস্থান ছিল তাদের মতোই, যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে ভালোবেসে দুনিয়ার ভোগ-বিলাসকে তুচ্ছ করেছিলেন এবং আল্লাহর সাক্ষাৎ ও তাঁর প্রস্তুত করা জান্নাতের নেয়ামতের আকাঙ্ক্ষায় তাদের অন্তর ব্যাকুল ছিল। এ মহীয়সী মুজাহিদা ইসলামের প্রতি ভালোবাসার ক্ষেত্রে যেমন অসাধারণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, তেমনি প্রকৃত মাতৃত্বেরও অনন্য উদাহরণ হয়ে উঠেছিলেন। তিনি এমন এক স্বতন্ত্র মাতৃশিক্ষালয়ের আদর্শ ছিলেন, যেখানে সন্তানদের জন্য একজন মা নিজের সর্বোচ্চ শ্রম ও সাধনা ব্যয় করেন। তিনি সন্তানদের ইসলামের মৌলিক শিক্ষা দিতেন এবং তাদের অন্তরে আল্লাহর পথে সংগ্রাম ও শাহাদাতের ভালোবাসা প্রোথিত করতেন।

ইমানদার ও সংগ্রামী পরিবার

উম্মে আম্মারাহ (রা.)-এর জীবন ও তার রেখে যাওয়া আত্মত্যাগ ও সংগ্রামের উজ্জ্বল অধ্যায়ে প্রবেশের আগে তার এবং তার পরিবারের বিষয়ে সংক্ষেপে জানা প্রয়োজন। এ মহীয়সী সাহাবিয়ার নাম ছিল নুসাইবা বিনতে কাব ইবনে আমর ইবনে আওফ ইবনে মাবদুল আল-খাজরাজিয়া আল-মাজনিয়া আল-মাদানিয়া। তিনি ছিলেন মর্যাদাশীল বংশের অধিকারী এক সাহাবিয়া। তার বংশ বনু নাজ্জার গোত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। রাসুলুল্লাহ (সা.) বহু সম্মানজনক হাদিসে এই গোত্রের প্রশংসা করেছেন। (আল-তাবাকাতুল কুবরা, ৮/৪১২; আল-ইসাবা, ৪/৪৭৯) তার মা ছিলেন রাবাব বিনতে আবদুল্লাহ ইবনে হাবিব আল-খাজরাজিয়া। কিছু সূত্রে উল্লেখ রয়েছে, তার মা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এবং উহুদের দিন উপস্থিত ছিলেন। সেদিন তিনি তার কন্যা উম্মে আম্মারাহ (রা.)-এর জখমের পরিচর্যাতেও অংশ নিয়েছিলেন। (সিফাতুস সাফওয়া, ২/৩৪)

উম্মে আম্মারাহ (রা.)-এর ভাইদের মধ্যেও ইসলামের জন্য আত্মত্যাগের উজ্জ্বল ইতিহাস রয়েছে। তাদের মধ্যে প্রথম ছিলেন আবদুল্লাহ ইবনে কাব আল-মাজনি (রা.)। তিনি বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পক্ষ থেকে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ দেখাশোনার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। তিনি উহুদ, খন্দক এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে সংঘটিত পরবর্তী অন্যান্য যুদ্ধেও অংশ নিয়েছিলেন। (আল-তাবাকাতুল কুবরা, ৩/৫১৮)

তার দ্বিতীয় ভাই ছিলেন আবদুর রহমান ইবনে কাব আল-মাজনি (রা.)। তিনি সেই ‘কান্নাকারী’ সাহাবিদের একজন ছিলেন, যারা তাবুক যুদ্ধে যাওয়ার জন্য অত্যন্ত আগ্রহী থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় রসদ ও বাহনের অভাবে যেতে পারেননি। তাদের এবং তাদের মতো অন্যদের প্রসঙ্গেই আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘তারা ফিরে গেল এবং তাদের চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠল এ দুঃখে যে, তারা ব্যয় করার মতো কিছুই পেল না।’ (সুরা তাওবা, আয়াত : ৯২)। তিনি উহুদ, খন্দক এবং পরবর্তী অন্যান্য যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। (আল-তাবাকাতুল কুবরা, ৩/৫১৮)

উম্মে আম্মারাহ (রা.)-এর স্বামীদের মধ্য থেকে প্রথম ছিলেন জায়েদ ইবনে আসিম ইবনে কাব। তিনি আকাবা, বদর ও উহুদের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। ইসলাম গ্রহণের আগেই তার সঙ্গে উম্মে আম্মারাহ (রা.)-এর বিবাহ হয়েছিল। তাদের ঘরে জন্মগ্রহণ করেন হাবিব ও আবদুল্লাহ, যারা উভয়েই রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাহাবি ছিলেন। তার দ্বিতীয় স্বামী ছিলেন গাজিয়াহ ইবনে আমর ইবনে আতিয়্যাহ। তিনিও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে উহুদে এবং আকাবায় অংশগ্রহণ করেছিলেন। (আল-ইস্তিআব, ১/৫৫৫)

উম্মে আম্মারাহ (রা.)-এর সন্তানদের মধ্যেও আত্মত্যাগের সেই শিক্ষা গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছিল। তার প্রথম সন্তান ছিলেন আবদুল্লাহ ইবনে জায়েদ ইবনে আসিম আল-মাজনি। তিনি ছিলেন বিশিষ্ট সাহাবিদের একজন। বদর যুদ্ধে তিনি অংশগ্রহণ করেন এবং ইয়ামামার যুদ্ধে ওয়াহশির সঙ্গে মিলে মুসাইলিমা কাযযাবকে হত্যায় অংশ নেন। আবদুল্লাহ তার মায়ের ঘরেই বেড়ে ওঠেন। তিনি বিভিন্ন সংকটময় পরিস্থিতিতে সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন এবং আল্লাহর পথে শাহাদাতের আকাঙ্ক্ষা পোষণ করতেন। অবশেষে ৬৩ হিজরিতে যখন ফিতনা ছড়িয়ে পড়ে এবং শামের বাহিনী মদিনায় প্রবেশ করে লুণ্ঠন করে, তখন হাররার ঘটনায় তিনি শহীদ হন। (সিয়ারু আ'লামিন নুবালা, ২/৩৭৮)

উম্মে আম্মারাহ (রা.)-এর দ্বিতীয় সন্তান ছিলেন হাবিব ইবনে জায়েদ ইবনে আসিম আল-মাজনি। তিনি আকাবা, উহুদ, খন্দকসহ বিভিন্ন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে ইয়ামামার সময় মুসাইলিমা কাযযাবের কাছে পাঠিয়েছিলেন। মুসাইলিমা তাকে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘তুমি কি সাক্ষ্য দাও যে আমি আল্লাহর রাসুল?’ হাবিব (রা.) উত্তর দিয়েছিলেন, ‘আমি তা শুনতেও চাই না।’ তখন মুসাইলিমা তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ একে একে কেটে নির্মমভাবে নির্যাতন করে। তার দুই হাত কাঁধ থেকে এবং দুই পা উরু থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়। এরপর তাকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু এই ভয়াবহ নির্যাতনের মধ্যেও তিনি তার ঈমান ও দ্বীন থেকে একটুও সরে যাননি। অবশেষে তার আত্মা তার প্রতিপালকের কাছে ফিরে যায় এবং তিনি সেই শাহাদাত লাভ করেন, যা তিনি কামনা করতেন। এ ছিল উম্মে আম্মারাহ (রা.)-এর মাতৃত্বের আরেকটি ফল, কারণ তার সন্তান এমনভাবে বেড়ে উঠেছিলেন যে জিহাদ ও শাহাদাতের ভালোবাসা তার সমগ্র সত্তাকে আচ্ছন্ন করেছিল। (আল-ইসাবা, ১/৩০৬)

তার তৃতীয় সন্তান ছিলেন দামরাহ ইবনে গাজিয়াহ ইবনে আমর। তিনি তার পিতার সঙ্গে উহুদের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং তার দুই ভাইয়ের মতো তিনিও শাহাদাতের আকাঙ্ক্ষা পোষণ করতেন। পরবর্তীকালে মুসলিমদের সঙ্গে পারসিকদের এক তীব্র যুদ্ধে, যা ‘ইয়াওমু জিসরি আবি উবাইদ’ নামে পরিচিত, আল্লাহ তাঁকে শাহাদাতের মর্যাদা দান করেন। (উসদুল গাবাহ, ৩/৪৬)

আলোর সূচনা ও দাওয়াতের প্রারম্ভ

মক্কার অলিগলিতে যখন নতুন দ্বীনের কথা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছিল, উম্মে আম্মারাহ (রা.) তখন সেই নতুন ধর্মের কথা শুনেছিলেন। তিনি গভীর আগ্রহে তার সংবাদ অনুসরণ করতে থাকেন এবং সত্যের সন্ধানে অনুসন্ধান চালান। অবশেষে ঈমানের আলো তার হৃদয়ে উদ্ভাসিত হয় এবং তা তার সমগ্র সত্তাকে আলোকিত করে দেয়। ইসলাম গ্রহণে তার আর দেরি হয়নি। তিনি ছিলেন ইসলামের প্রথম যুগে ইসলাম গ্রহণকারী নারীদের অন্যতম। তিনি দ্বিতীয় আকাবার বাইআতে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাতে বাইআত করার মাধ্যমে ইসলামের ছায়াতলে আসেন। (আল-তাবাকাতুল কুবরা, ৮/৪১২)

ইসলামে প্রবেশের প্রথম মুহূর্ত থেকেই উম্মে আম্মারাহ (রা.) নিজের শক্তি ও সামর্থ্যকে দ্বীনের সেবায় উৎসর্গ করতে থাকেন। মুসলিম নারীর জন্য দাওয়াতের কাজে সুস্পষ্ট ভূমিকা রয়েছে- এ কথা তিনি নিজের জীবন দিয়ে প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন। একই সঙ্গে তিনি সঠিক শিক্ষা ও সুন্দর প্রতিপালনের মাধ্যমে একটি মুসলিম প্রজন্ম গড়ে তুলতে অসাধারণ ভূমিকা রাখেন। তিনি তার সন্তানদের অন্তরে জিহাদ ও আল্লাহর পথে শাহাদাতের আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তোলেন। তারা মায়ের গভীর ঈমান থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে বীরত্ব ও আত্মত্যাগের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে উম্মে আম্মারাহ (রা.) অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ অভিযান ও ঘটনায় উপস্থিত ছিলেন। দ্বিতীয় আকাবার বাইআতের পাশাপাশি তিনি বাইআতে রিদওয়ান, হুদাইবিয়ার সন্ধি এবং উমরাতুল কাজাতেও অংশগ্রহণ করেন। (আল-মাগাজি, ২/৭৩১)

এই আত্মত্যাগ তার মধ্যে কোনো ক্ষণস্থায়ী আবেগের ফল ছিল না; বরং তা ছিল আল্লাহ ও তার রাসুলের প্রতি গভীর ঈমান ও দৃঢ় বিশ্বাসের ফল। কোনো জুলুমের শক্তিই তার সেই বিশ্বাসকে টলাতে পারেনি। এভাবেই তিনি ইতিহাসের পাতায় এমন সব কর্ম ও গুণের স্বাক্ষর রেখে যান, যার দৃষ্টান্ত খুবই বিরল।

আরও ত্যাগ ও সংগ্রাম

এত কিছু করার পরও উম্মে আম্মারাহ (রা.) নিজেকে থামিয়ে রাখেননি। বরং তিনি ত্যাগ ও আত্মোৎসর্গের আরও উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে থাকেন। কঠিন বিপদের মুহূর্তে তাঁর দৃঢ়তা প্রকাশ পেতে থাকে এবং তাঁর সাহস অনেক পুরুষের সাহসকেও ছাড়িয়ে যায়। এর সবচেয়ে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত দেখা যায় তৃতীয় হিজরির উহুদ যুদ্ধে।

সেদিন তিনি মুসলিম সৈন্যদের পানি পান করাচ্ছিলেন। একটি ছোট পানির পাত্র হাতে নিয়ে আহত ও তৃষ্ণার্তদের কাছে পানি পৌঁছে দিচ্ছিলেন। কিন্তু তার ভূমিকা শুধু সেবা ও পানীয় সরবরাহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। তিনি নিজেই বর্ণনা করেছেন, ‘আমি দিনের শুরুতে উহুদের দিকে বের হয়েছিলাম। মানুষ কী করছে, তা দেখছিলাম। আমার সঙ্গে ছিল একটি পানির পাত্র। আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে পৌঁছলাম, তখন তিনি তার সাহাবিদের মধ্যে ছিলেন এবং তখন জয় ও পরিস্থিতি মুসলিমদের অনুকূলে ছিল। কিন্তু যখন মুসলিমরা পরাজিত হয়ে ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল, তখন আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে অবস্থান নিলাম। আমি তরবারি দিয়ে যুদ্ধ করতে থাকলাম এবং ধনুক দিয়ে তীর নিক্ষেপ করলাম, অবশেষে আমিও আহত হলাম।’ হাদিসের বর্ণনাকারী জামিলা বিনতে সাদ ইবনে রাবি বলেন, ‘আমি তার কাঁধে একটি গভীর ক্ষত দেখতে পেয়েছিলাম।’ (আস-সিরাতুল হালাবিয়্যাহ, ২/২৩০)

সেদিন উম্মে আম্মারাহ (রা.)-কে প্রচণ্ড যুদ্ধ করতে দেখা যায়। তিনি তার পোশাক কোমরে বেঁধে নিয়েছিলেন এবং তেরোটি আঘাত পেয়েছিলেন। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ আঘাতটি এসেছিল মুশরিক যোদ্ধা ইবনে কুমাইআহর তরবারির আঘাতে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে নিজের শরীর দিয়ে রক্ষা করতে গিয়ে তিনি সেই আঘাত গ্রহণ করেছিলেন। সেই ক্ষত তাকে এক বছর ধরে চিকিৎসা করতে হয়েছিল।

উহুদের ময়দানে উম্মে আম্মারাহ (রা.) পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে পেরেছিলেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) শত্রুর প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছেন দেখে তিনি তাকে নিজের জীবন দিয়ে রক্ষা করতে এগিয়ে যান। নিজের শরীরে আঘাত আসছে কি না, তা নিয়ে তিনি চিন্তিত ছিলেন না। রাসুলুল্লাহ (সা.) তার এই অসাধারণ ভূমিকা দেখে বলেন, ‘নুসাইবা বিনতে কাবের অবস্থান অমুক অমুকের অবস্থানের চেয়ে উত্তম।’ তিনি আরও বলেন, ‘তুমি যা করতে পারো, তা কে করতে পারে, হে উম্মে আম্মারাহ?’ আরেকবার বলেন, ‘আমি ডানে কিংবা বামে যতবার তাকিয়েছি, ততবারই তাকে আমার হয়ে যুদ্ধ করতে দেখেছি।’ এসব বক্তব্যে উহুদের দিনে তার সরাসরি যুদ্ধ, সাহসিকতা এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে রক্ষায় তার অবদানের স্বীকৃতি রয়েছে। (আল-তাবাকাত, ৮/৪১৫)

উহুদের যুদ্ধেই তার ছেলে আবদুল্লাহ আহত হন। তার বাম বাহুতে গুরুতর আঘাত লেগে প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। উম্মে আম্মারাহ (রা.) ছেলের ক্ষত পরিচর্যা ও ব্যান্ডেজ করে দেন। এরপর তিনি ছেলেকে বলেন, ‘ওঠো, বৎস! শত্রুর সঙ্গে লড়াই করো।’ এই ঈমানদার ও সংগ্রামী পরিবারকে দেখে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের জন্য আন্তরিকভাবে দোয়া করেন, ‘আল্লাহ তোমাদের পরিবারকে বরকত দান করুন, হে আল্লাহ, এই পরিবারকে রহমত করুন এবং হে আল্লাহ, তাদেরকে জান্নাতে আমার সঙ্গী করে দাও।’ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর এই দোয়া শুনে উম্মে আম্মারাহ (রা.) আনন্দাশ্রুতে বলেন, ‘এরপর দুনিয়ায় আমার কী আসে যায়!’ (আল-মাগাজি, ১/২৭৩) 

উহুদের পরও উম্মে আম্মারাহ (রা.) হামরাউল আসাদের অভিযানে অংশ নিতে চেয়েছিলেন। উহুদের ভয়াবহ আঘাত সত্ত্বেও তিনি যুদ্ধের পোশাক পরেছিলেন। কিন্তু তার নতুন ক্ষত থেকে রক্তক্ষরণ অব্যাহত থাকায় তিনি বের হতে পারেননি। জিহাদের আহ্বানে সাড়া দিতে না পারার কষ্টে তিনি অশ্রুসিক্ত হয়ে ফিরে আসেন। তার পরিবার-পরিজন তখন তার সেবা ও রক্তাক্ত ক্ষতের পরিচর্যায় নিয়োজিত হয়। (আল-তাবাকাতুল কুবরা ৮/৪১৩) 

এরপর সময়ের পরিক্রমায় উম্মে আম্মারাহ (রা.) চতুর্থ হিজরিতে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে বনু কুরাইযার অভিযানেও অংশ নেন। এই অভিযানে তার সক্রিয় ভূমিকার প্রমাণ হিসেবে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ বণ্টনের সময় তার জন্যও অংশ নির্ধারণ করা হয়েছিল।

ষষ্ঠ হিজরিতে তিনি আবার রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে খায়বারের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। সে সময় মুসলিম বাহিনীতে বিশজন নারী ছিলেন এবং উম্মে আম্মারাহ (রা.) তাদের নেতৃত্বে ছিলেন। তারা আহতদের চিকিৎসা করতেন, তীর এগিয়ে দিতেন এবং সৈন্যদের জন্য সাওয়িক বা ভাজা শস্যের খাদ্য ও পানীয় সরবরাহ করতেন। যুদ্ধের সময় বিপদের মুখে একটি মুসলিম সমাজ কীভাবে সম্মিলিতভাবে প্রস্তুত থাকতে পারে, উম্মে আম্মারাহ (রা.) ও তার সঙ্গে থাকা নারীরা তার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। (আল-মাগাজি, ২/৬৩৪)

অষ্টম হিজরির হুনাইনের যুদ্ধেও উম্মে আম্মারাহ (রা.) আবার অসাধারণ সাহসের পরিচয় দেন। সেদিন মুসলিমরা বিভিন্ন দিকে ছত্রভঙ্গ হয়ে যাচ্ছিল। তিনি আরও চারজন নারীর সঙ্গে হাতে তরবারি নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাদের মধ্যে উম্মে সুলাইম (রা.) তখন অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন এবং কোমর শক্ত করে বেঁধে রেখেছিলেন। উম্মে আম্মারাহ (রা.) তরবারি বের করে আনসারদের উদ্দেশে চিৎকার করে বলছিলেন, ‘এ কেমন আচরণ? তোমাদের কী হয়েছে যে তোমরা পালিয়ে যাচ্ছ?’

তিনি দেখলেন, হাওয়াজিনের এক মুশরিক যোদ্ধা একটি উটের ওপর পতাকা নিয়ে মুসলিমদের পশ্চাদ্ধাবন করতে চাইছে। তিনি তার সামনে গিয়ে উটটির পায়ে আঘাত করেন। উটটি পড়ে গেলে তিনি তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে আঘাত করতে থাকেন এবং শেষ পর্যন্ত তাকে পরাস্ত করেন। এ সময় রাসুলুল্লাহ (সা.) হাতে খোলা তরবারি নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন এবং ‘হে সূরা আল-বাকারার অনুসারীরা!’ বলে সাহাবিদের আহ্বান করছিলেন। (আল-মাগাজি, ৩/৯০২)

ইয়ামামার ময়দানে

১২ হিজরিতে আবু বকর সিদ্দিক (রা.) যখন মুরতাদদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দেন, তখন উম্মে আম্মারাহ (রা.)-এর হৃদয়ে আবার জেগে ওঠে জিহাদের আকাঙ্ক্ষা। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে অতীতের সেই দিনগুলোর কথা তার মনে পড়ে যায় এবং তার অন্তর আবারও সংগ্রামের জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে। তিনি যুদ্ধে অংশগ্রহণের দৃঢ় সংকল্প করেন। হাতে খোলা তরবারি নিয়ে তিনি আল্লাহর শত্রুদের বিরুদ্ধে আক্রমণ করেন। সেই যুদ্ধে তিনি এগারোটি আঘাত পান এবং মুসাইলিমাকে আক্রমণ করার সময় তার হাত কেটে যায়। ইয়ামামার যুদ্ধ ছিল তার জীবনের শেষ যুদ্ধ। এর মধ্য দিয়ে তিনি নিজের জীবন, সম্পদ ও সন্তান দিয়ে দ্বীনের সেবা করার দীর্ঘ জীবনের শেষ অধ্যায় রচনা করেন। (আস-সিরাতুল হালাবিয়্যাহ, ২/২৩০)

মহান প্রভুর সান্নিধ্যে

বছরগুলো পেরিয়ে যেতে থাকে। উম্মে আম্মারাহ (রা.) তখন তার ঘরের অন্তরালে থেকে ইবাদত, সিজদা ও দুনিয়াবিমুখতার জীবন যাপন করতে থাকেন। তিনি অতীতের সেই দিনগুলোর কথা স্মরণ করতেন, যে দিনগুলো ছিল জিহাদ ও আত্মত্যাগে পরিপূর্ণ। এভাবেই তিনি আল্লাহর ইবাদতে অবিচল থাকেন, যতক্ষণ না তার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে নিশ্চিত আহ্বান আসে। আনুমানিক ১৩ হিজরিতে সেই প্রশান্ত আত্মা তার প্রতিপালকের কাছে ফিরে যায়। তার গোসলের সময় তার শরীরে থাকা ক্ষতগুলো একে একে গণনা করা হয় এবং দেখা যায়, তার শরীরে তেরোটি যুদ্ধের ক্ষত ছিল। তার পবিত্র দেহ জান্নাতুল বাকি‘তে পূর্ববর্তী সত্যনিষ্ঠ, শহীদ ও নেককারদের পাশে সমাহিত হয়। দুনিয়ায় উম্মে আম্মারাহ (রা.)-এর মর্যাদা যেমন তার সংগ্রাম ও আত্মত্যাগে উঁচু হয়েছিল, তেমনি তার জন্য পরকালের আরও উচ্চ মর্যাদার আশা করা হয়। তিনি এমন একটি জীবন অতিবাহিত করেছিলেন, যে জীবনে তার ঈমানদার ও ধৈর্যশীল পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আল্লাহর পথে সংগ্রাম করেছিলেন। (আল-মাগাজি, ১/২৭০)

উম্মে আম্মারাহ (রা.), আপনার প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট হোন। আপনি আপনার সময়, শ্রম, সামর্থ্য ও আত্মত্যাগের শ্রেষ্ঠ অংশ এই বরকতময় দাওয়াতের জন্য উৎসর্গ করেছিলেন। আপনি সব যুগের ও সব স্থানের মুসলিম নারীদের জন্য রেখে গেছেন অসংখ্য মহান শিক্ষা, একজন মুসলিম নারী কীভাবে নিজের দায়িত্ব উপলব্ধি করবে এবং সেই দায়িত্ব পালনে কীভাবে নিজেকে উৎসর্গ করবে। আমাদের সমকালীন প্রজন্মের কতই না প্রয়োজন সাহাবিয়াদের মতো আলোকোজ্জ্বল নক্ষত্রদের জীবন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা। তারা তাদের জীবনের মাধ্যমে প্রমাণ করে গেছেন, যে ব্যক্তি নিজের দায়িত্বকে যথাযথভাবে উপলব্ধি করে এবং আল্লাহর সঙ্গে করা অঙ্গীকারে সত্য থাকে, সে দ্বীনের জন্য অনেক কিছু উৎসর্গ করতে পারে। আমরা আশা করি, তাদের জীবনকাহিনি আমাদের জীবনের পথেও আলো জ্বালাবে এবং একদিন মুসলিম উম্মাহকে তার হারানো গৌরবের পথে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রেরণা জোগাবে।

লেখক: আলেম ও সাংবাদিক

[email protected]

 

মুসলিম ইতিহাসমুসলিম নারীউম্মে আম্মারা (রা.)
    আগামীর সময় ইপেপার
    শেয়ার করুন:
    Advertisement
    বিদ্যুৎ-সারের দাবিতে বাসদের সমাবেশে বিএনপির হামলার অভিযোগ

    বিদ্যুৎ-সারের দাবিতে বাসদের সমাবেশে বিএনপির হামলার অভিযোগ

    ২৮ আগস্ট ২০২৬, ২০:০৩

    চাঁপাইনবাবগঞ্জে নদীতে ডুবে পাঁচ শিশুর মৃত্যু

    চাঁপাইনবাবগঞ্জে নদীতে ডুবে পাঁচ শিশুর মৃত্যু

    ২৮ আগস্ট ২০২৬, ১৫:৪৩

    বই খুলে পরীক্ষা দিচ্ছেন শিক্ষার্থীরা, ভিডিও করায় সাংবাদিকদের মারধর

    বই খুলে পরীক্ষা দিচ্ছেন শিক্ষার্থীরা, ভিডিও করায় সাংবাদিকদের মারধর

    ২৮ আগস্ট ২০২৬, ১৭:৪০

    উন্নয়নের গল্প নয়, চার কোটি বেকারের কর্মসংস্থান চায় যুব ইউনিয়ন

    উন্নয়নের গল্প নয়, চার কোটি বেকারের কর্মসংস্থান চায় যুব ইউনিয়ন

    ২৮ আগস্ট ২০২৬, ১৯:০৮

    চাকরির বদলে রুশ সেনাবাহিনীর কাছে বিক্রি, যেভাবে ফিরলেন রাজন

    চাকরির বদলে রুশ সেনাবাহিনীর কাছে বিক্রি, যেভাবে ফিরলেন রাজন

    ২৮ আগস্ট ২০২৬, ২১:৪৭

    খাল খননে হরিলুট, শ্রমিকদের মজুরি না দিয়েই কোষাগারে টাকা ফেরত ইউএনওর

    খাল খননে হরিলুট, শ্রমিকদের মজুরি না দিয়েই কোষাগারে টাকা ফেরত ইউএনওর

    ২৮ আগস্ট ২০২৬, ২২:১৭

    নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ঝটিকা মিছিল, পরে গ্রেপ্তার ১৪

    নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ঝটিকা মিছিল, পরে গ্রেপ্তার ১৪

    ২৮ আগস্ট ২০২৬, ১৯:৫৩

    আগামী বছর মিয়ানমারের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ শুরু করবে রাশিয়া

    আগামী বছর মিয়ানমারের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ শুরু করবে রাশিয়া

    ২৮ আগস্ট ২০২৬, ১৭:৩৯

    জীবনের জুটি গড়ে মাঠে ভাঙেন রুবেল

    জীবনের জুটি গড়ে মাঠে ভাঙেন রুবেল

    ২৯ আগস্ট ২০২৬, ০৪:৫৪

    ভেনিসে পর্দা উঠছে বিশ্ব চলচ্চিত্রের, থাকছে বাংলাদেশের সিনেমাও

    ভেনিসে পর্দা উঠছে বিশ্ব চলচ্চিত্রের, থাকছে বাংলাদেশের সিনেমাও

    ২৮ আগস্ট ২০২৬, ১৮:৩৬

    বন্দুক হাতে পার্কে ঘোরার ভিডিও ভাইরাল, সেই দুই তরুণ গ্রেপ্তার

    বন্দুক হাতে পার্কে ঘোরার ভিডিও ভাইরাল, সেই দুই তরুণ গ্রেপ্তার

    ২৯ আগস্ট ২০২৬, ০৫:৪১

    বনজীবীদের মনে ভয়, কাঁধে ঋণ

    বনজীবীদের মনে ভয়, কাঁধে ঋণ

    ২৯ আগস্ট ২০২৬, ০৫:৫৩

    ‘শারজাহ মডেলে’ সাজতে পারে চট্টগ্রাম বিমানবন্দর

    ‘শারজাহ মডেলে’ সাজতে পারে চট্টগ্রাম বিমানবন্দর

    ২৯ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৩৫

    সংকট মেটাতে ‘সার কার্ড’

    সংকট মেটাতে ‘সার কার্ড’

    ২৯ আগস্ট ২০২৬, ০৮:১৮

    জনকল্যাণে বাবা-ছেলের দৃষ্টান্ত

    জনকল্যাণে বাবা-ছেলের দৃষ্টান্ত

    ২৯ আগস্ট ২০২৬, ০৪:০৮

    advertiseadvertise