জীববৈচিত্র সংরক্ষণ: আধুনিক পরিবেশবিজ্ঞান ও নবীজির শিক্ষা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
পৃথিবীর প্রাণ, প্রকৃতি ও পরিবেশের ভারসাম্য টিকে আছে অসংখ্য জীবের পারস্পরিক নির্ভরশীলতার ওপর। উদ্ভিদ, প্রাণী, অণুজীব, মাটি, পানি ও বায়ু মিলে গড়ে উঠেছে একটি জটিল বাস্তুতন্ত্র। আধুনিক পরিবেশবিজ্ঞান দেখিয়েছে, এই ব্যবস্থার কোনো একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের ক্ষতি শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবন ও সভ্যতার ওপরও প্রভাব ফেলে। তাই বন উজাড়, আবাসস্থল ধ্বংস, অতিরিক্ত শিকার, দূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন ও অনিয়ন্ত্রিত সম্পদ আহরণ শুধু প্রকৃতির সমস্যা নয়, মানব অস্তিত্বেরও সংকট। ইসলামের দৃষ্টিতেও পৃথিবীর প্রাণ ও সম্পদের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ মানুষের নৈতিক দায়িত্বের অংশ।
পবিত্র কোরআন মানুষকে পৃথিবীতে দায়িত্বশীল সত্তা হিসেবে বিবেচনা করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘তিনি তোমাদের পৃথিবীতে প্রতিনিধি করেছেন’। (সুরা আনআম, আয়াত : ১৬৫) একই সঙ্গে সতর্ক করা হয়েছে, ‘তোমরা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করো না’। (সুরা বাকারা, আয়াত : ৬০) আরও বলা হয়েছে, ‘স্থলে ও সমুদ্রে মানুষের কৃতকর্মের কারণে বিপর্যয় প্রকাশ পেয়েছে’। (সুরা রূম, আয়াত : ৪১)
আজকের পরিবেশবিজ্ঞানের ভাষায় বন ধ্বংস, পানি ও বায়ুদূষণ, প্রজাতির বিলুপ্তি কিংবা আবাসস্থল বিনষ্ট করার অর্থ হলো বৃহত্তর পরিবেশগত ভারসাম্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করা। এসব আয়াতও সেই দায়িত্ববোধের একটি নৈতিক ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছে দেড় শহস্রাধিক বছর আগেই।
মহানবী (সা.)-এর জীবন ও শিক্ষায় প্রাণী ও উদ্ভিদের প্রতি সহমর্মিতার বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে। তিনি প্রাণীর ওপর অপ্রয়োজনীয় নির্যাতন নিষেধ করেছেন। একবার একটি উট তাঁকে দেখে কাঁদতে থাকলে তিনি তার মালিককে সতর্ক করে বলেন, ‘এই প্রাণী সম্পর্কে কি তুমি আল্লাহকে ভয় করো না? সে আমার কাছে অভিযোগ করেছে যে, তুমি তাকে ক্ষুধার্ত রাখো এবং অতিরিক্ত পরিশ্রম করাও।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ২৫৪৯)। এতে প্রাণীর কল্যাণকে শুধু সম্পত্তির বিষয় না দেখে দায়িত্ব ও জবাবদিহির বিষয় হিসেবে দেখা হয়েছে।
গাছপালা সংরক্ষণেও ইসলামের শিক্ষার তাৎপর্য রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনার আশপাশে নির্দিষ্ট এলাকাকে সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন, যেখানে শিকার ও গাছ কাটার ওপর বিধিনিষেধ ছিল। (বুখারি, হাদিস : ১৮৭৩) আধুনিক সংরক্ষণবিজ্ঞানের ‘প্রটেকটেড এরিয়া’ বা সংরক্ষিত এলাকার ধারণার সঙ্গে এর একটি নৈতিক সাদৃশ্য লক্ষ করা যায়। অর্থাৎ মানুষের প্রয়োজন থাকলেও সব প্রাকৃতিক সম্পদ অবাধে ব্যবহারযোগ্য নয়; কিছু সম্পদ ও কিছু অঞ্চল ভবিষ্যৎ পরিবেশগত ভারসাম্যের জন্য সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।
প্রাণীর প্রতি দয়ার গুরুত্ব বোঝাতে নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘প্রত্যেক জীবন্ত প্রাণীর সেবায় সওয়াব রয়েছে।’ (বুখারি, হাদিস : ২৩৬৩) অন্যদিকে একটি বিড়ালকে আটকে রেখে অনাহারে মৃত্যুর কারণে এক নারীর শাস্তির কথা তিনি উল্লেখ করেছেন (বুখারি, হাদিস : ৩৩১৮)। এসব বর্ণনা প্রাণীর প্রতি দায়িত্বকে ইসলামী নৈতিকতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।
জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অপচয় নিয়ন্ত্রণ। পবিত্র কোরআন ঘোষণা করেছে, ‘তোমরা খাও ও পান করো, কিন্তু অপচয় করো না; নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না’ (সুরা আরাফ, আয়াত : ৩১)। আধুনিক পরিবেশবিজ্ঞানও দেখাচ্ছে, অতিরিক্ত ভোগ ও সম্পদের অপচয় প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর চাপ বাড়ায় এবং পরিবেশগত সংকটকে তীব্র করে। ফলে সংযমী জীবনযাপন শুধু ব্যক্তিগত নৈতিকতা নয়, পরিবেশ সংরক্ষণেরও একটি কার্যকর নীতি।
জীববৈচিত্র্য রক্ষার অর্থ কেবল বিলুপ্তপ্রায় প্রাণীকে বাঁচানো নয়; বরং বন, নদী, জলাভূমি, কৃষিজমি ও সামুদ্রিক পরিবেশসহ সমগ্র বাস্তুতন্ত্রকে সুরক্ষা দেওয়া। নবীজির শিক্ষা মানুষের মধ্যে এমন এক দায়িত্ববোধ তৈরি করে, যেখানে প্রকৃতি ভোগের বস্তু নয়, বরং আল্লাহর সৃষ্টি এবং মানুষের কাছে অর্পিত আমানত। আধুনিক পরিবেশবিজ্ঞান আমাদের বলে কোন ব্যবস্থায় জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা যায়, আর ইসলামের নৈতিক শিক্ষা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় কেন সেই দায়িত্ব পালন করা জরুরি। এই দুই দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয়েই গড়ে উঠতে পারে এমন এক পরিবেশ-নৈতিকতা, যেখানে মানুষের উন্নয়ন ও প্রকৃতির অস্তিত্ব পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী না হয়ে সহাবস্থানের পথ খুঁজে নেয়।
তাই জীববৈচিত্র্য রক্ষা কেবল পরিবেশবিদদের দায়িত্ব নয়; এটি মানুষের নৈতিক, সামাজিক এবং ধর্মীয় দায়িত্ব। যে বন আমাদের অক্সিজেন দেয়, যে নদী অসংখ্য প্রাণের আশ্রয়, যে পাখি ও পতঙ্গ পরাগায়নের মাধ্যমে খাদ্যশৃঙ্খল সচল রাখে, যে ক্ষুদ্র জীব মাটির উর্বরতা ধরে রাখে—প্রতিটি সৃষ্টিই পৃথিবীর ভারসাম্যের বৃহত্তর ব্যবস্থার অংশ। কোনো একটি প্রজাতির বিলুপ্তিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা মনে করার সুযোগ নেই; প্রকৃতির একটি কড়ি ছিঁড়ে গেলে তার অভিঘাত শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবনেও এসে পড়ে। আধুনিক পরিবেশবিজ্ঞান এই আন্তঃনির্ভরতার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়েছে, আর নবীজি (সা.)-এর শিক্ষা আমাদের দিয়েছে এর নৈতিক ভিত্তি।
প্রকৃতির ওপর মানুষের মালিকানার ধারণার পরিবর্তে দায়িত্বশীল আমানতদারির চেতনা প্রতিষ্ঠাই আজ সবচেয়ে জরুরি। উন্নয়ন যদি নদীকে মেরে ফেলে, অগ্রগতি যদি বন উজাড় করে, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি যদি প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস করে, তবে সেই উন্নয়নের স্থায়িত্ব নিয়েই প্রশ্ন থেকে যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন আমাদের শেখায়, শক্তির অধিকারী হওয়া মানে দুর্বলকে নিপীড়ন করার অধিকার পাওয়া নয়; বরং যার ওপর ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, তার প্রতি দায়িত্বশীল হওয়া। মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্কেও এই নীতিই প্রযোজ্য।
আজ জলবায়ু পরিবর্তন, বন উজাড়, প্রজাতি বিলুপ্তি ও দূষণের যুগে নবীজির পরিবেশনৈতিক শিক্ষা নতুন তাৎপর্য নিয়ে আমাদের সামনে ফিরে এসেছে। একটি গাছ রোপণ, একটি প্রাণীকে অকারণে কষ্ট না দেওয়া, পানির অপচয় রোধ, অপ্রয়োজনীয় ভোগ কমানো কিংবা একটি জলাভূমি রক্ষার উদ্যোগ হয়তো ব্যক্তির কাছে ক্ষুদ্র কাজ; কিন্তু এমন লাখো ছোট দায়িত্বশীল আচরণই গড়ে তুলতে পারে একটি টেকসই সভ্যতা। পৃথিবী আমাদের উত্তরাধিকার হিসেবে শুধু ভোগ করার জন্য দেওয়া হয়নি; পরবর্তী প্রজন্মের কাছে নিরাপদভাবে পৌঁছে দেওয়ার জন্যও আমাদের হাতে অর্পিত হয়েছে। তাই জীববৈচিত্র্য রক্ষা প্রকৃতপক্ষে ভবিষ্যৎ মানবতার প্রতি আমাদের অঙ্গীকার এবং সৃষ্টির প্রতি আমাদের আমানতদারির পরীক্ষা।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক



