দু-একটি আসনের আশায় দল ‘বিলীন’
- আসন সমঝোতা ও ক্ষমতার রাজনীতিতে বড় দলের ছায়ায় থাকাই অনেক দলের প্রধান কৌশল হয়ে উঠেছে
- নিজেদের আলাদা শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ বেশিরভাগ দল
- বড় হওয়ার বদলে বিলীন হওয়ার প্রবণতা বেশিরভাগ দলের

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেশে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সংখ্যা ৬০-এর কাছাকাছি। অনিবন্ধিত দলের সংখ্যাও শতাধিক। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই দেশের রাজনীতি মূলত আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) ও বিএনপিকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে। নির্বাচনও হচ্ছে জোট-মহাজোটের সমীকরণে। এর বাইরে কয়েকটি দল নিজেদের বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টাও করেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বড় কোনো শক্তিতে পরিণত হতে পারেনি। কোনো দল ভেঙেছে। কোনোটি নিষ্ক্রিয় হয়েছে। আবার কোনো কোনো দল একটি-দুটি আসনের আশায় কিংবা টিকে থাকাতে বেছে নিয়েছে বড় দলের সঙ্গে জোটের পথ। কিন্তু তাতে আরও ঝুঁকিতে পড়েছে সেসব দলের তৃণমূলের অস্তিত্ব। ফলে ছোট দলগুলো বড় হতে পারছে না কেন- সে প্রশ্ন এখন বড় হয়ে উঠছে। কিংবা নিজেদের সংগঠন ও জনভিত্তি তৈরির বদলে তারা বড় দলের ওপর নির্ভরশীল কেন তারা?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দেশের আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাসে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি ভূমিকা রয়েছে ছোট দলগুলোর। তবে ২০০১ সালের পর থেকে রাজনীতি অনেকটাই জোটনির্ভর হয়ে পড়ে। এতে ছোট দলগুলোর নিজস্ব শক্তি তৈরির সুযোগ যেমন কমেছে, তেমনি অনেক দলও দীর্ঘমেয়াদি সংগঠন গড়ে তোলার বদলে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে জোটের ওপর।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. আব্দুল আলীম মনে করেন, ছোট দলগুলোর বড় হয়ে উঠতে না পারার পেছনে রয়েছে সুবিধাবাদী রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও সাংগঠনিক দুর্বলতা। তার মতে, দেশের অনেক রাজনৈতিক দল কার্যত ‘এক ব্যক্তির দল’ বা ‘ওয়ান ম্যান পার্টি’ হিসেবে পরিচালিত হয়। এসব দলের প্রধান লক্ষ্য অনেক সময় নিজস্ব সাংগঠনিক শক্তি ও গণভিত্তি তৈরি করা নয়। বরং বড় কোনো দলের সঙ্গে জোট করে রাজনৈতিক সুবিধা আদায় করাই হয়ে ওঠে মূল লক্ষ্য। জোটে থেকে দরকষাকষির মাধ্যমে দু-একটি সংসদীয় আসন নিশ্চিত করাকেই অনেক দল রাজনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখে।
কাগুজে দল, মাঠে নেই সংগঠন
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সংখ্যা ৬০টি। এর মধ্যে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নিবন্ধন ও রাজনৈতিক কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে। বর্তমানে বিএনপির সঙ্গে ১০ থেকে ১২টি সমমনা রাজনৈতিক দল সক্রিয় রয়েছে নির্বাচনী জোটে।
হাসিনার সরকার পতনের পর জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির উত্থান ঘটে। এমনকি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী এককভাবে লাভ করেছে ৬৮টি আসন। তাদের নির্বাচনী জোটেও ১০ থেকে ১১টি দল ও সমমনা অংশীদার রয়েছে। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটে রয়েছে ১২টি দল।
জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ বাদে অন্যান্য ধর্মভিত্তিক দলগুলোর অবস্থাও একই। বিভিন্ন ইস্যুতে মাদ্রাসা বা মসজিদকেন্দ্রিক কর্মসূচি পালন করে। কিন্তু জাতীয় ইস্যুতে তাদের নিয়মিত উপস্থিতি খুব বেশি দেখা যায় না।
রাজনৈতিক দল হিসেবে গত বছর নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নিবন্ধন পেয়েছে বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টি (বিআরপি)। হাইকোর্টের আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশন দলটিকে নিবন্ধন প্রদান করে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মাত্র ১৪ জন প্রার্থী দেয় দলটি। সব প্রার্থী তাদের জামানত হারিয়েছেন। নিবন্ধন পাওয়ার পর রাজনীতির মাঠে তেমন কোনো সক্রিয়তা নেই দলটির। কালেভদ্রে কিছু ইস্যুতে ঢাকায় মানববন্ধন করলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিবৃতিতে সীমাবদ্ধ দলের কার্যক্রম।
দলটির কার্যক্রমের বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টির চেয়ারম্যান মো. আবু হানিফ হৃদয় মোবাইল ফোনে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। অফিসে এসে কথা বলতে বলে কল কেটে দেন।
একই সময় আদলতের আদেশে নিবন্ধন পেয়েছে সমঅধিকার পার্টি (বিএসপি)। একই অবস্থা এই দলটিরও। গত নির্বাচনে প্রার্থী দিয়েছে মাত্র একজন। এ ছাড়া দলটির দৃশ্যমান কোনো কর্মকাণ্ডও নেই। দলটির চেয়ারম্যান সুশান্ত চন্দ্র বর্মণ বলেছেন, ‘আমরা নতুন দল, হাঁটি হাঁটি পা পা করে চলছি। দল গোছানোর কাজ চলছে। তা ছাড়া দেশের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে বড় কোনো কর্মসূচি পালন করা সম্ভব হচ্ছে না।’
একই অবস্থা ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি), বাংলাদেশ মুসলিম লীগ, বাংলাদেশ তরীকত ফেডারেশন, গণফ্রন্ট, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-বাংলাদেশ ন্যাপ, জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন-এনডিএম, বিকল্প ধারা বাংলাদেশ, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির। দলগুলোর গত কয়েক বছরের কার্যক্রম পর্যালোচনা করে পাওয়া গেছে এমনই চিত্র।
এসব দলের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেছেন, আমরা আইনের মধ্যে থেকে যতটুকু অবজার্ভ করা যায়, করছি। আইনে যতটুকু ক্ষমতা দেওয়া আছে, অতটুকু করি। এর বাইরে তো আর আমরা যাব না।
জোটের ছায়ায় পরিচয় সংকট
দীর্ঘ সময় ধরে ১৪ দলীয় জোটের অংশ হয়ে কাজ করছে গণতন্ত্রী পার্টি। দলটি ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী দিতে পেরেছে মাত্র একজন। নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট অনুযায়ী দলটির ঠিকানা— পুরানা পল্টন (ইশরাত টাওয়ার, দশমতলা) গিয়ে দেখা গেছে, সেখানে কার্যালয়ের কোনো অস্তিত্ব নেই। ভবনের নিরাপত্তাকর্মী সাইদুল জানিয়েছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দলের কাউকে ভবনে আসতে দেখা যায়নি। ভবনে তাদের কোনো অফিস নেই।
দলের খোঁজ নিতে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও কাউকে পাওয়া যায়নি। এমনকি ইসির ওয়েবসাইটে দেওয়া নম্বরটিও বন্ধ পাওয়া গেছে।
এদিকে একই অবস্থা জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদের। ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও আওয়ামী লীগ, বিএনপির সঙ্গে সমঝোতার রাজনীতি, বিভাজন, আদর্শগত মতপার্থক্যের কারণে একাধিকবার ভাঙন হয় দলটিতে। ক্ষমতার রাজনীতিতে জোটের অংশীদার হওয়া দলটির জন্য রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি করলেও, একই সঙ্গে দলের অবস্থাও নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দলের সভাপতি হাসানুল হক ইনু কারাগারে, সাধারণ সম্পাদক রয়েছেন আত্মগোপনে।
২০২১ সালে আত্মপ্রকাশের পর গণঅধিকার পরিষদ নতুন রাজনৈতিক শক্তির সম্ভাবনা তৈরি করলেও অল্প সময়েই নেতৃত্বের দ্বন্দ্বে ভাঙনের মুখে পড়ে। নুরুল হক নুর ও রেজা কিবরিয়ার বিরোধে ২০২৩ সালে দল কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত হয়। এরপর বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে যুক্ত হওয়া এবং ২০২৬ সালের নির্বাচনে বিএনপির সঙ্গে আসন সমঝোতা দলটির রাজনীতিতে নতুন প্রশ্ন তৈরি করে। নুরুল হক নুর বিএনপির সমর্থনে পটুয়াখালী-৩ আসনে জয়ী হন আর দলের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খাঁন গণঅধিকার ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দিয়ে ধানের শীষে নির্বাচন করেন।
সংসদ সদস্য হয়ে নুরুল হক নুর বিএনপি সরকারের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পান। অন্যদিকে রাশেদ খাঁনকে প্রধানমন্ত্রীর সহকারী (রাজনৈতিক) পদে সচিব পদমর্যাদায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
তবে এ নিয়ে দলের মধ্যে শুরু হয়েছে টানাপড়েনও। দলের কেউ কেউ মনে করছেন, বিএনপির সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতা তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক সুবিধা দিলেও এতে গণঅধিকার পরিষদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক অবস্থান ও পরিচয় প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে দলের একাধিক নেতাকর্মী বলেছেন, যে বিকল্প রাজনীতির প্রত্যয় নিয়ে দলটির যাত্রা শুরু হয়েছিল, বড় দলের ছায়ায় গিয়ে সেই প্রত্যয় কতটা অক্ষুণ্ন থাকবে, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। তাদের মতে, জোটের রাজনীতিতে যেতে হলে নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি, নীতিগত অবস্থান ও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক লক্ষ্য স্পষ্ট করা জরুরি। না হলে গণঅধিকার পরিষদও ধীরে ধীরে আরেকটি নির্ভরশীল রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
গণঅধিকার পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হাসান আল মামুন বলেছেন, নির্বাচনের আগে দলকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী ও বিস্তৃত করার প্রয়োজন থেকেই বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়েছে দল। এতদিন সাধারণ মানুষের অনুদানের ওপর নির্ভর করে দল পরিচালনা করা হলেও একটি রাজনৈতিক দলকে এগিয়ে নিতে সাংগঠনিক ও আর্থিক সক্ষমতা প্রয়োজন। তিনি বললেন, বিএনপির সঙ্গে জোটে যাওয়ার পেছনে দলের নিজস্ব রাজনৈতিক স্বাতন্ত্র্য বিসর্জন দেওয়ার কোনো উদ্দেশ্য নেই। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় ছোট দলগুলোর বিকাশের জন্য বড় দলের সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়ার নজির রয়েছে। ভবিষ্যতে জোট থাকবে কি না, তা রাজনৈতিক পরিস্থিতিই নির্ধারণ করবে। তবে গণঅধিকার পরিষদের নিজস্ব রাজনৈতিক কার্যক্রম ও সক্রিয়তা অব্যাহত থাকবে।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. আব্দুল আলীম বলেছেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ছোট দলগুলোর আদর্শিক বিকাশ না হওয়া, সাংগঠনিকভাবে বড় হতে না পারার পেছনে মূলত সুবিধাবাদী রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও কাঠামোগত দুর্বলতা দায়ী। তার ভাষ্য, অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতার আলোকে নির্বাচন কমিশনের অধীনে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট আইন থাকা প্রয়োজন। কোনো দল নির্বাচনে ন্যূনতম একটি আসন অর্জন করতে না পারলে কিংবা নির্দিষ্ট শতাংশ ভোট না পেলে নির্দিষ্ট সময় পর— যেমন প্রতি পাঁচ বছর অন্তর তাদের নিবন্ধন পর্যালোচনার আওতায় আনার বিধান করা যেতে পারে। প্রয়োজন হলে নিবন্ধন বাতিলের ব্যবস্থাও থাকা উচিত।
রাজনৈতিক দলগুলোর নিবন্ধন পর্যালোচনার বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেছেন, ভবিষ্যতে যদি এ ধরনের সুনির্দিষ্টভাবে আইনকানুন হয়, তাহলে আমরা করব। আইন তো পাস করবেন সংসদ সদস্যরা।



