কী আছে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তিতে?

ইনভেস্ট বাংলাদেশ ভবনে আজ এনসিটি নিয়ে চুক্তিপত্রে সই করেন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল মো. মনিরুজ্জামান (ডানে) এবং ডিপি ওয়ার্ল্ডের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান এসা কাজিম।
চট্টগ্রাম বন্দরের শ্রমিক সংগঠন এবং বাম দলগুলোর বিরোধিতার মধ্যেই নিউ মুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল পরিচালনার ভার বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দিল সরকার।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই সরকারের মালিকানাধীন আন্তর্জাতিক টার্মিনাল অপারেটর ডিপি ওয়ার্ল্ড পেয়েছে এই কাজের ভার।
আজ বৃহস্পতিবার ঢাকার আগারগাঁওয়ে কোম্পানিটির সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের মধ্যে ‘অপারেশনাল কনসেশন’ চুক্তি সইয়ের অনুষ্ঠান আয়োজন হয়। চুক্তিপত্রে সই করেন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল মো. মনিরুজ্জামান এবং ডিপি ওয়ার্ল্ডের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান এসা কাজিম।
নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম এবং প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসানের উপস্থিতিতে যখন এই চুক্তি সই হচ্ছিল, তখন ইনভেস্ট বাংলাদেশ ভবনের বাইরে বিক্ষোভ করছিল বাম রাজনৈতিক দলগুলো। তবে পুলিশ লাঠিপেটা করে তাদের সরিয়ে দেয়। অন্যদিকে চুক্তি সইয়ের সঙ্গে সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর অচল করে দেওয়ার হুমকি দিয়ে রেখেছে বন্দরের শ্রমিক সংগঠনগুলো।
চট্টগ্রাম বন্দরে বর্তমানে চারটি কনটেইনার হ্যান্ডলিং স্থাপনা চালু রয়েছে, তার একটি নিউ মুরিং টার্মিনাল বা এনসিটি।
২০০৭ সালে চালু হওয়া এনসিটি দিয়ে বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের মোট কনটেইনারের প্রায় ৪৪ শতাংশ ওঠা-নামা হয়। এটি এখন নৌবাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন চিটাগং ড্রাই ডক লিমিটেড পরিচালনা করছে। নতুন চুক্তি সইয়ের পর এর ব্যবস্থাপনা চলে গেল ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে।
চুক্তিতে কী আছে
চুক্তি সইয়ের পর ইনভেস্ট বাংলাদেশের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, এটি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) আওতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ।
বলা হয়েছে, এনসিটির জমি, অবকাঠামো, মালিকানা এবং নিয়ন্ত্রণ চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ তথা সরকারের কাছে থাকবে। ডিপি ওয়ার্ল্ড ১৫ বছর মেয়াদে টার্মিনাল পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করবে।
চুক্তির প্রধান দিকগুলো তুলে ধরে ইনভেস্ট বাংলাদেশ জানিয়েছে, এনসিটির মালিকানা বিদেশিদের হাতে যাচ্ছে না, তা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছেই থাকবে।
চুক্তির আওতায় শুরুতে প্রায় ৬০০ কোটি টাকার অগ্রিম ফি দেবে ডিপি ওয়ার্ল্ড। এরপর ১০ বছরে আধুনিকায়ন, যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তিতে ১ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করবে তারা। পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ পাবে রাজস্ব আয়ের ভাগ।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, চুক্তি অনুযায়ী কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলে বিদেশি কোম্পানিকে আর্থিক জরিমানা করতে পারবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। তাছাড়া বন্দর কর্তৃপক্ষ তদারকিও থাকবে।
বন্দরের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড, ইমিগ্রেশন, কাস্টমসসহ সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় সংস্থার নিরাপত্তা প্রটোকল আগের মতোই থাকবে বলে জানানো হয়েছে।
বিদেশি কোম্পানির হাতে পরিচালনার ভার গেলেও স্থানীয় কর্মসংস্থান অব্যাহত থাকবে বলে দাবি করা হয় বিজ্ঞপ্তিতে। আরো বলা হয়, আধুনিক প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দেশের বন্দর ও লজিস্টিক খাতের দক্ষতা আরও বাড়বে।
কী প্রয়োজন ছিল
বৈশ্বিক বন্দর দক্ষতার সূচক ২০২৫ অনুযায়ী বিশ্বের ৪০০টি কনটেইনার বন্দরের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের অবস্থান ৩৬৪তম। পিছিয়ে থাকার এই কারণ হিসেবে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে দীর্ঘসূত্রতাকে চিহ্নিত করা হচ্ছে।
ইনভেস্টমেন্ট বাংলাদেশের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় ৯২ শতাংশের ভার বহনকারী চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়ন ও প্রয়োজনীয় দক্ষতার অভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রতিদিন প্রায় ১০ কোটি টাকা বা বছরে ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হয়।
বিশ্ব ব্যাংকের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, কনটেইনার অবস্থানকাল মাত্র এক দিন কমানো গেলে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রায় ৭.৪ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
বর্তমানে বন্দরের সবচেয়ে ব্যস্ত এনসিটিতে কনটেইনার অবস্থানকাল নয় দিনের বেশি। জাহাজের বন্দর-অবস্থানকালও আড়াই দিনের বেশি।
এই ক্ষেত্রগুলোতে উন্নতি বিদেশি কোম্পানির হাত ধরেই ঘটবে বলে আশাবাদী বন্দর কর্তৃপক্ষ।
চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, সরকারের লক্ষ্য বিদ্যমান গুরুত্বপূর্ণ সম্পদের সক্ষমতা দ্রুত বৃদ্ধি করা যাতে আধুনিক যন্ত্রপাতি, ডিজিটাল ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক মানের ব্যবস্থাপনা এবং বৈশ্বিক লজিস্টিক সংযোগের মাধ্যমে এনসিটিকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করা যায়।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মনিরুজ্জামান বলেন, ‘এই চুক্তি টার্মিনালের পরিচালন দক্ষতা বাড়াবে, লজিস্টিকসের প্রতিবন্ধকতা কমাবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সংযোগ আরও জোরদার করবে।’
ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য দেশের বাণিজ্যকে বৈশ্বিক গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে নেওয়া। নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডকে যুক্ত করা সেই লক্ষ্যে একটি বড় পদক্ষেপ।’
ডিপি ওয়ার্ল্ডের মতো বড় প্রতিষ্ঠান যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে বন্দরের কাজ আরো উন্নত ও গতিশীল হবে বলে তিনি আশাবাদী।
কেন ডিপি ওয়ার্ল্ড
আর এজন্য ডিপি ওয়ার্ল্ডকে বেছে নেওয়ার পক্ষে যুক্তি দেখানো হচ্ছে কোম্পানিটির বৈশ্বিক অভিজ্ঞতাকে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ডিপি ওয়ার্ল্ড বিশ্বের অন্যতম বন্দর ও লজিস্টিকস অপারেটর।
৪০টির বেশি দেশে ৮০টির বেশি সামুদ্রিক ও অভ্যন্তরীণ টার্মিনাল পরিচালনা করে তারা, যার মধ্যে রয়েছে ভারত, পাকিস্তান, সৌদি আরব, মিশর, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র।
বলা হচ্ছে, বিশ্বের মোট কনটেইনার চলাচলের প্রায় ১০ শতাংশ হয় প্রতিষ্ঠানটির নেটওয়ার্কের মাধ্যমে।
চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে ডিপি ওয়ার্ল্ডের নির্বাহী চেয়ারম্যান এসা কাজিম বলেন, ‘নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনালকে ডিপি ওয়ার্ল্ডের বৈশ্বিক বন্দর, লজিস্টিকস অবকাঠামো ও সরবরাহব্যবস্থার সেবা নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করা হবে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সংযোগ আরও সহজ ও নিরবচ্ছিন্ন হবে।
‘আমাদের অভিজ্ঞতা, প্রযুক্তি এবং সরবরাহব্যবস্থার প্রতিটি ধাপে লজিস্টিকস সেবা দেওয়ার সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে আমরা বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং বাংলাদেশের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নতুন সুযোগ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে চাই।’






