চুক্তি হলো, ১৫ বছরের জন্য এনসিটি পেল ডিপি ওয়ার্ল্ড

সংগৃহীত ছবি
দীর্ঘদিনের আলোচনা, বিরোধিতা ও নানা জটিলতা পেরিয়ে অবশেষে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব আন্তর্জাতিক অপারেটরের হাতে দেওয়ার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে এনসিটি ও ওভারফ্লো কনটেইনার ইয়ার্ড পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে ১৫ বছরের চুক্তি করেছে বাংলাদেশ।
আজ বৃহস্পতিবার বিকাল ৩টা ৪০ মিনিটে চুক্তিটি সই হয়। এতে বাংলাদেশের পক্ষে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান এবং ডিপি ওয়ার্ল্ডের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সুলতান আহমেদ বিন সুলায়েম স্বাক্ষর করেন।
চুক্তি সম্পাদনের পুরো প্রক্রিয়ায় লেনদেন-সংক্রান্ত পরামর্শক হিসেবে কাজ করেছে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি)।
এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব দীর্ঘদিন স্থানীয় প্রতিষ্ঠান সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেডের হাতে ছিল। ২০২৫ সালের ৬ জুলাই তাদের সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়। এর পরদিন টার্মিনালের পরিচালনার দায়িত্ব নেয় বাংলাদেশ নৌবাহিনী পরিচালিত প্রতিষ্ঠান চিটাগং ড্রাই ডক।
এনসিটির জন্য আন্তর্জাতিক অপারেটর নিয়োগের উদ্যোগ অবশ্য নতুন নয়। ২০১৯ সালে এ প্রক্রিয়া শুরু হয়। পরে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) আওতায় আন্তর্জাতিক বেসরকারি অপারেটর নিয়োগের বিষয়ে ২০২৩ সালের মার্চে অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি নীতিগত অনুমোদন দেয়।
এরপর অন্তর্বর্তী সরকার প্রক্রিয়াটি আবার সক্রিয় করে এবং ডিপি ওয়ার্ল্ডকে অপারেটর হিসেবে বেছে নেয়। তবে এ সিদ্ধান্ত নিয়ে বিরোধিতা দেখা দেয়। চলতি বছরের শুরুতে শ্রমিকদের ধর্মঘটের কারণে প্রক্রিয়াটি কার্যত থমকে যায়। পরে বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।
প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ২০০৭ সালে নির্মিত এনসিটিতে রয়েছে পাঁচটি জেটি। চট্টগ্রাম বন্দরের মোট ১৮টি কুইসাইড গ্যান্ট্রি ক্রেনের মধ্যে ১৪টিই রয়েছে এই টার্মিনালে। বন্দরের মোট কনটেইনার ওঠা-নামার ৪০ শতাংশের বেশি এনসিটির মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।
এ কারণে টার্মিনালটির পরিচালনায় আন্তর্জাতিক অপারেটর নিয়োগকে বন্দরের সক্ষমতা ও সেবার মান বাড়ানোর গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখছে সরকার। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ডিপি ওয়ার্ল্ড দায়িত্ব নেওয়ার পর জাহাজের টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম এবং বন্দরে কনটেইনার অবস্থানের সময় বা ডুয়েল টাইম কমবে। এতে আমদানি-রপ্তানিকারকদের লজিস্টিকস ব্যয়ও কমতে পারে।
বিশেষ করে তৈরি পোশাক, কৃষিপণ্য, প্রক্রিয়াজাত পণ্য এবং লাইট ইঞ্জিনিয়ারিংসহ রপ্তানিমুখী বিভিন্ন খাত এ সুবিধা পাবে বলে মনে করছে সরকার।
তবে এনসিটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে দীর্ঘমেয়াদি ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তি রয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা কমিটি এ প্রক্রিয়া বাতিলের দাবিতে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছে।
ইজারা বাতিল চেয়ে বিক্ষোভ
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং টার্মিনাল ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে ইজারা দেওয়ার চুক্তি বাতিলের দাবিতে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিক্ষোভ করেছেন সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধবিরোধী জোটের নেতাকর্মীরা।
এদিন দুপুর আড়াইটার দিকে ইনভেস্ট বাংলাদেশ কার্যালয়ের সামনে তারা জড়ো হন। এ সময় পুলিশ বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলেও তা উপেক্ষা করে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেছিলেন আন্দোলনকারীরা। একপর্যায়ে লাঠিচার্জ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে পুলিশ।
‘চট্টগ্রাম বন্দর সবচেয়ে লাভজনক প্রতিষ্ঠান। প্রতিবছর ১ হাজার কোটি টাকার ওপরে লাভ করে থাকে। সেই বন্দর ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে ইজারা দেওয়ার জন্য আজকে চুক্তিবদ্ধ হবে। এটি মেনে নেওয়া যায় না’—বলছিলেন বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ।
তিনি বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা ড. ইউনুস বললেন, চট্টগ্রাম বন্দর হলো আমাদের হৃৎপিণ্ড। বাংলাদেশের হৃৎপিণ্ড যদি চট্টগ্রাম বন্দর হয়, তাহলে সেই বন্দর কেন ওই সংযুক্ত আরব আমিরাত বা অন্য কোনো দেশের কোম্পানির কাছে ইজারা দেওয়া হবে পরিচালনা করার জন্য।
বজলুর রশিদ আরও বলেন, কারণ এটা তো লাভজনক বন্দর। ... তাহলে কেন দিচ্ছে, কী উদ্দেশ্যে দিচ্ছে?
‘যারা বিদেশিদের কাছে চট্টগ্রামের বন্দর তুলে দিচ্ছে, তারা বন্দর অপরাধী’
ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে আগের সরকারের উদ্যোগের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘শেখ হাসিনা যেই ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি করতে চেয়েছিল, অনেক দূর অগ্রসর হয়েছিল কিন্তু পারে নাই।’ সেই ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে কনটেইনার টার্মিনাল চুক্তির জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও গণঅভ্যুত্থানের পরে সেই চুক্তি এগিয়ে নিতে চেয়েছে।
বজলুর রশিদ বলেন, ১৯৭১ সালে যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল, মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল, রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনী গঠন করেছিল, তারা যুদ্ধাপরাধী। গণহত্যা যারা করেছিল, তারা যুদ্ধাপরাধী। আজকে যারা চট্টগ্রামের বন্দর বিদেশিদের কাছে ইজারা দিচ্ছে, বিক্রি করছে দেশের সম্পদ, তারা হলো বন্দর অপরাধী। তাদের বিচার দেশের মানুষ একদিন এই বাংলাদেশে করবে।



