স্থানীয় সরকার নির্বাচন বর্জনের চিন্তা নেই জামায়াতের, তবে...
- ‘অসম মাঠ’ হলে কঠোর অবস্থান
- ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ প্রার্থী প্রায় চূড়ান্ত
- কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলের পদধারী নেতাদের সুযোগ না দেওয়ার দাবি
- নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন থেকে এখনই সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে চায় না বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। বরং নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পথ খোলা রেখেই সবার জন্য সমান ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছে দলটি। তবে তাদের দাবিগুলো সরকার ও নির্বাচন কমিশন আমলে না নিলে কঠোর কর্মসূচিতে যাওয়ার প্রস্তুতিও রয়েছে। শেষ পর্যন্ত কোনো সমাধান না হলে নির্বাচন বর্জনের বিষয়টি বিবেচনায় আসতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন দলটির নেতারা।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ বলেছেন, তারা নির্বাচন বর্জন করতে চান না; বরং একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান চান। আগামীর সময়কে তিনি বলেছেন, ‘আমরা বর্জন করতে চাই না। তবে সরকার বাধ্য করলে আমরাও বাধ্য হব। আমরা সমাধান চাই।’
জামায়াতের এই নেতা আরও বলছেন, নির্বাচন থেকে পালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা তাদের নেই। কিন্তু নির্বাচনী মাঠে যদি কোনো প্রার্থী বা দলের জন্য বৈষম্যমূলক পরিস্থিতি তৈরি করা হয় কিংবা সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত না করা হয়, তাহলে সেটি মেনে নেওয়া হবে না। সরকার ও নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে আলোচনা এবং সমাধানের পথ খোলা রেখেই তারা এগোতে চান।
৯ দফা দাবি নিয়ে ইসির সঙ্গে বৈঠক: স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও সর্বজনগ্রাহ্য করতে নির্বাচন কমিশনের কাছে ৯ দফা দাবি জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। গত ১ সেপ্টেম্বর দলটির কেন্দ্রীয় সচিবালয় ও নির্বাচন পরিচালনাসংক্রান্ত প্রতিনিধিদল আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে কমিশনের সঙ্গে বৈঠক করে এসব দাবি তুলে ধরে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত দাবিগুলোর একটি হলো এমপিওভুক্ত স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষকদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা রাজনীতির পাশাপাশি জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিয়ে আসছেন। এমনকি সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তারা প্রার্থী হয়েছেন। ফলে শুধু স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ক্ষেত্রে তাদের প্রার্থী হওয়ার সুযোগ বন্ধ করা হলে তা বৈষম্যমূলক হবে।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবি জানিয়েছে জামায়াত। দাবি মানা না হলে আইনি চ্যালেঞ্জের কথাও জানিয়েছে দলটি। তাদের যুক্তি, সরকারি চাকরিজীবীদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যে বিধিনিষেধ রয়েছে, বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের ক্ষেত্রে একই বিধি প্রয়োগের সুযোগ নেই। তাই নতুন করে এমন বিধিনিষেধ আরোপকে নাগরিক অধিকার ও সাংবিধানিক সমঅধিকারের প্রশ্ন হিসেবে দেখছে তারা।
তবে বিষয়টি নিয়ে নির্বাচন কমিশনও ভাবছে। কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেছেন, এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা নির্বাচনে প্রার্থী হলে তাদের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে— এ বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। যদিও এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
নিষিদ্ধ দলের পদধারীদের নিয়েও আপত্তি: নির্বাচনী মাঠে নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের নেতাদের অংশগ্রহণ নিয়েও অবস্থান জানিয়েছে জামায়াত। যেসব দলের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সরকার নিষিদ্ধ করেছে, সেসব দলের পদধারী নেতাদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ না দেওয়ার দাবি করেছে দলটি। তবে এসব দলের সাধারণ সমর্থকদের নির্বাচনে অংশগ্রহণে কোনো বাধা দেওয়ার পক্ষে নয় জামায়াত।
একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে দলটি। ইসির অতিরিক্ত সচিব শামসুল আলমের নিয়োগের বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে গোলাম পরওয়ার দাবি করেছেন, তিনি বিএনপির নির্বাচনবিষয়ক একটি সাব-কমিটির সক্রিয় সদস্য ছিলেন। এমন রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থাকা একজন কর্মকর্তা কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকলে নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে বলে মনে করছে জামায়াত। এ কারণে তার নিয়োগ বাতিলের দাবি জানিয়েছে তারা।
প্রশাসক নিয়োগেও আপত্তি: স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রশাসক নিয়োগের বিষয়েও আপত্তি রয়েছে জামায়াতের। দলটির অভিযোগ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন ও উন্নয়ন কর্তৃপক্ষগুলোতে দলীয় ব্যক্তিদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগের ফলে নির্বাচনের আগে সরকারি অর্থ, এডিপি বরাদ্দ ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করে রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তাই এসব প্রশাসককে আসন্ন নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণার পাশাপাশি তফসিল ঘোষণার পর পদত্যাগ করলেও যাতে একই নির্বাচনে তারা প্রার্থী হতে না পারেন, সেই দাবি জানিয়েছে দলটি।
এ ছাড়া মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ব্যক্তিদের নির্বাচনী প্রচারণায় অংশগ্রহণ ঠেকাতে কঠোর আচরণবিধি প্রণয়নের দাবিও রয়েছে জামায়াতের। দলটির নেতাদের মতে, ক্ষমতাবানদের প্রভাবমুক্ত সমান নির্বাচনী মাঠ নিশ্চিত না হলে স্থানীয় সরকার নির্বাচন গ্রহণযোগ্যতা হারাবে।
স্থানীয় নির্বাচনে জোট নয়, একক প্রার্থী জামায়াতের: জাতীয় নির্বাচনের মতো স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জোটের সমীকরণে যেতে চায় না জামায়াতে ইসলামী। দলটির নেতারা বলছেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গঠিত ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য ছিল জাতীয় নির্বাচন ও বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সেই সমঝোতার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
তাই ইউনিয়ন থেকে উপজেলা, জেলা এবং সিটি করপোরেশন— সব পর্যায়েই নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি ও স্থানীয় নেতাকর্মীদের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে এককভাবে প্রার্থী দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জামায়াত।
দলটির দায়িত্বশীল নেতাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে বিভিন্ন স্তরে প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ অনেকটাই এগিয়ে গেছে। এরই মধ্যে ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ প্রার্থী প্রায় চূড়ান্ত করা হয়েছে। আনুষ্ঠানিকভাবে নাম ঘোষণা না হলেও সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজ নিজ এলাকায় সাংগঠনিক কার্যক্রম, নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং নির্বাচনী প্রস্তুতি শুরু করেছেন। তফসিল ঘোষণার পর পর্যায়ক্রমে এসব প্রার্থীর নাম আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছেন দলটির নেতারা।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, জাতীয় নির্বাচনের জন্য গঠিত ১১ দলীয় ঐক্য শুধু জাতীয় নির্বাচনকেন্দ্রিক। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলগুলোর নিজস্বভাবে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে ওই ঐক্যের কোনো বাধ্যবাধকতা বা সমঝোতার শর্ত নেই।
আর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ জানিয়েছেন, ১৩টি সিটি করপোরেশনেই জামায়াতের একক প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়েছে। আপাতত জোটের কোনো সিদ্ধান্ত নেই। তবে স্থানীয় পর্যায়ে কোনো সমঝোতার সুযোগ তৈরি হলে সেটি হতে পারে।
সব মিলিয়ে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে একদিকে প্রার্থী প্রস্তুত করছে জামায়াত, অন্যদিকে নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে নির্বাচন কমিশন ও সরকারের ওপর চাপও বাড়াচ্ছে। আপাতত নির্বাচনের মাঠ ছাড়ার ঘোষণা না দিলেও ৯ দফা দাবি পূরণ না হলে আন্দোলনের পথে যাওয়ার বার্তা স্পষ্ট করেছে তারা। আর সে পথেও সমাধান না এলে শেষ বিকল্প হিসেবে নির্বাচন বর্জনের বিষয়টিও সামনে আসতে পারে।



