জিয়ার হাতে জাগদল থেকে যেভাবে বিএনপির প্রতিষ্ঠা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
১৯৭৮ সালের ২ সেপ্টেম্বর। দেশের প্রায় সব সংবাদপত্রের প্রধান শিরোনামজুড়ে ছিল একই খবর—জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত হয়েছে নতুন রাজনৈতিক দল।
এর ঠিক আগের দিন, ১ সেপ্টেম্বর ঢাকার রমনা রেস্তোরাঁয় এক সংবাদ সম্মেলনে নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের ঘোষণা দেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। দলের নাম দেওয়া হয় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।
এর মধ্যে দিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন একটি অধ্যায়ের সূচনা হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই দলটি দেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ একটি রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থান তৈরি করে।
তখন জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি, ফলে সেদিন দলটির যাত্রা শুরু হয়েছিল ক্ষমতাসীন হয়েই। এরপর নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে স্থায়ী আসন করে নিয়েছে বিএনপি, পেরিয়েছে ৪৮ বছর।
এর শুরুটা অবশ্য বিএনপি দিয়ে নয়, এর আগে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল (জাগদল) নামে একটি দল দিয়ে রাজনীতির জটিল পথে পা রাখেন সেনা কর্মকর্তা জিয়া। তবে তখন তিনি ছিলেন নেপথ্যে। জাগদলের নেতৃত্বে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক ফ্রন্টও গঠিত হয়েছিল।
তবে বিএনপি গঠনের ঠিক আগে জাগদল বিলুপ্ত হয়। শাহ আজিজুর রহমান নেতৃত্বাধীন মুসলিম লীগসহ আরও কয়েকটি দলও বিলীন হয়েছিল বিএনপিতে।
ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে রাজনীতিতে
মুক্তিযুদ্ধের সমরনায়ক জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক যাত্রার পথটি তৈরি হয় ১৯৭৫ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে। ১৯৭৫ সালের আগস্টে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর খন্দকার মোশতাক আহমেদ ক্ষমতায় বসে সামরিক আইন জারি করেন, সেনাপ্রধান করা হয় জিয়াকে।
এরপর নভেম্বরে সেনাবাহিনীতে অভ্যুত্থান-পাল্টা অভ্যুত্থানের মধ্যে জিয়া চলে আসেন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রে। বিচারপতি আবু সাদত মো. সায়েম রাষ্ট্রপতি হলেও ক্ষমতার নাটাই জিয়ার হাতেই ছিল।
তখন পর্যন্ত জিয়ার কোনো রাজনৈতিক অভিলাষ দেখা যায়নি। ১৯৭৫ সালের ১১ নভেম্বর এক বেতার ভাষণে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি রাজনীতিবিদ নই। আমি একজন সৈনিক।’
তখন জিয়া সেনাপ্রধানের পাশাপাশি উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করছিলেন। ১৯৭৬ সালের ১৯ নভেম্বর তিনি প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব নেন। বিচারপতি সায়েমের পদত্যাগের পর ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি হন জিয়া। সামরিক শাসক জিয়া এরপর রাজনীতিতে থিতু হওয়ার পথে এগোতে থাকেন। এই প্রক্রিয়ায়ই গঠিত হয়েছিল জাগদল।
যেভাবে জাগদলের সূচনা
লেখক-গবেষক মহিউদ্দিন আহমেদ ২০১৫ সালে প্রথম আলোয় প্রকাশিত এক কলামে লিখেছিলেন, ‘জিয়া এগোচ্ছিলেন ধাপে ধাপে। ১৯৭৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি তিনি ‘জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল’ (জাগদল) তৈরি করেন। তিনি নিজে দলটির দায়িত্বে না থেকে উপরাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাত্তারকে (আব্দুস সাত্তার) এর চেয়ারম্যান নিযুক্ত করেন।’
এরপর ১৯৭৮ সালের ১ মে বৃহত্তর রাজনৈতিক বলয় তৈরি করার প্রয়াসে গঠিত হয় জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট। এবার জিয়া নিজেই হন ফ্রন্টের চেয়ারম্যান। এই ফ্রন্টের প্রার্থী হয়েই ১৯৭৮ সালের ৩ জুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়ী হন তিনি।
তার প্রায় তিন মাস পর বিএনপি প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়ে সংবাদ সম্মেলনে আসেন জিয়া। সেই খবরটি দৈনিক ইত্তেফাকে শিরোনাম হয়েছিল এভাবে- ‘প্রেসিডেন্ট জিয়ার নেতৃত্বে নয়া রাজনৈতিক দল’।
নতুন দল গঠনের ব্যাখ্যা সামনে এনে সংবাদ শিরোনাম করেছিল- ‘ঐতিহাসিক প্রয়োজনেই জাতীয়তাবাদী দল গঠিত হয়েছে: জিয়া।’
সংবাদ সম্মেলনে জিয়ার বক্তব্য উদ্ধৃত করে ইত্তেফাকের প্রতিবেদনে লেখা হয়েছিল, ‘বাস্তবিক পক্ষে জাতীয় প্রয়োজনের জন্যই নতুন দল করা হইতেছে। এই দল জাতিকে সৃদৃঢ় করিবে এবং দেশ ও জাতিকে আগাইয়া নিয়া যাইবে।’ডান, বাম, মধ্য- সব ধরনের রাজনীতিকরাই স্থান পেয়েছিলেন বিএনপিতে। আপনার দল ডানপন্থী, না বামপন্থী- সংবাদ সম্মেলনে এই প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছিলেন জিয়া। তার উত্তর ছিল- ‘যারা বাম বা ডান, তারা তাদের ব্যাখ্যা দেবেন। আমার কথা, আমি নতুন দলের কাছে কাজ চাই, দেশের উন্নতি চাই।’
বিএনপিতে বিলুপ্তি জাগদলের
জাতীয়তাবাদী ফ্রন্টে যেসব রাজনৈতিক দল রয়েছে, তার সবই বিএনপিতে চলে আসছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছিলেন জিয়া। জাতীয়তাবাদী ফ্রন্টে জাগদল ছাড়াও ছিল মশিউর রহমান যাদু মিয়া নেতৃত্বাধীন ভাসানী ন্যাপ, শাহ আজিজুর রহমান নেতৃত্বাধীন মুসলিম লীগ, ইউনাইটেড পিপলস পার্টি, লেবার পার্টি।
তার আগের দিন ১ সেপ্টেম্বর দৈনিক সংবাদের প্রথম পাতায় দুটি খবর পাওয়া যায়। একটি জাগদল বিলুপ্তি, আরেকটি শাহ আজিজ নেতৃত্বাধীন মুসলিম লীগের নতুন দল বিএনপিতে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত।
জাগদলের আহ্বায়ক আব্দুস সাত্তারের বিবৃতিতে বলা হয়, গত ২৮ আগস্ট (১৯৭৮ সালের) দলের বর্ধিত সভায় সব অঙ্গ সংগঠন বিলুপ্তির সিদ্ধান্ত হয়েছে। একই দিন ‘শাহ আজিজের মুসলিম লীগ নয়া দলে যাচ্ছে’- এই শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘শ্রম ও শিল্প কল্যাণমন্ত্রী শাহ আজিজুর রহমান বলেছেন, আমার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ মুসলিম লীগকে রাষ্ট্রপতি মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের প্রস্তাবিত নয়া দলের সঙ্গে একীভূত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
জিয়াউর রহমানের সেই সংবাদ সম্মেলনে মশিউর রহমানসহ তার সরকারের মন্ত্রীদের প্রায় সবাই উপস্থিত ছিলেন। তবে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী কাজী জাফর আহমদের অনুপস্থিতির সবার চোখে লাগার কথা লিখেছিল সংবাদ।
জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপির আনুষ্ঠানিক যাত্রা
সংবাদ সম্মেলনে জিয়া বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে নিজের নাম জানালেও অন্য কোনো সদস্যের নাম প্রকাশ করেননি। তিনি বলেছিলেন, কয়েকদিনের মধ্যে তা জানানো হবে।
নতুন দলের ঘোষণার নিয়ে বাংলাদেশ অবজার্ভার যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল, তার শিরোনামে নামের সংক্ষিপ্ত রূপ লেখা হয়েছিল- ‘বিজেডি (বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল)’।
তবে এই দল পরে বিএনপি নামেই পরিচিতি পায়। বিএনপি ওয়েবসাইটে লেখা আছে, এ দলের নাম হবে ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল’। ইংরেজিতে এ সংগঠনকে Bangladesh Nationalist Party (BNP) এবং সংক্ষেপে এ দলটিকে ‘জাতীয়তাবাদী দল’এবং ‘বিএনপি’ বলে অভিহিত করা হবে।’
জিয়ার পর খালেদা জিয়া, এখন তারেক
ক্ষমতাসীন হিসেবে বিএনপির যাত্রা শুরুর কয়েক বছর পর ১৯৮১ সালে চট্টগ্রামে এক ব্যর্থ অভ্যুত্থানে জিয়া নিহত হওয়ার পর বিচারপতি আব্দুস সাত্তার রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন। বিএনপি চেয়ারম্যানের দায়িত্বও নিয়েছিলেন তিনি।
কিন্তু তার পরের বছর তৎকালীন সেনাপ্রধান এইচ এম এরশাদ অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন বিচারপতি সাত্তার। বিএনপিও হারায় ক্ষমতা। পরে জিয়াউর রহমানের স্ত্রী খালেদা জিয়া ধরেন বিএনপির হাল।
খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ১৯৯১ সালে নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় ফেরে বিএনপি। ২০০১ সালে আবার সরকার গঠন করে দলটি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলে থাকেন, ক্ষমতাসীন দল হিসেবে যাত্রা শুরু করা বিএনপির গণভিত্তি গড়ে তুলতে বড় ভূমিকা ছিল ‘আপসহীন নেত্রী’ খালেদা জিয়ার।
বাবার হাতে প্রতিষ্ঠিত এবং মায়ের হাতে সংগঠিত বিএনপিকে এখন পথ দেখাচ্ছেন তারেক রহমান। তার হাত ধরে ২০ বছর পর এখন আবার ক্ষমতায় বিএনপি।












