জামায়াত জোটে ভাঙন
- বেরিয়ে গেল খেলাফত মজলিস

খেলাফত মজলিসের লোগো
জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় রাজনৈতিক জোটে দৃশ্যমান হয়েছে ভাঙন। জোটের অন্যতম শরিক খেলাফত মজলিস আনুষ্ঠানিকভাবে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেওয়ায় নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত মিলছে ইসলামপন্থি রাজনীতিতে। একই সময়ে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের উদ্যোগে কওমি ঘরানার দলগুলোকে এক ছাতার নিচে আনার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় রাজনৈতিক অঙ্গনে তৈরি হয়েছে নতুন আলোচনা। এমনকি এই ব্লকের আরও কয়েকটি কওমি ঘরানার দলও সঙ্গ ত্যাগ করতে পারে বলে জানিয়েছে একাধিক সূত্র।
গত ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ‘ওয়ান বক্স পলিসি’, অর্থাৎ ইসলামপন্থি দলগুলোর ভোট এক জায়গায় আনার লক্ষ্য নিয়ে আসন সমঝোতার ভিত্তিতে একটি রাজনৈতিক মোর্চা গঠন করে জামায়াত, ইসলামী আন্দোলনসহ কয়েকটি ধর্মভিত্তিক দল। নির্বাচন ঘনিয়ে এলে জুলাই সনদ ও রাষ্ট্রীয় সংস্কার বাস্তবায়নের দাবিতে রাজনৈতিক কর্মসূচিও পালন করে এই মোর্চা। তবে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর তারা আন্দোলন থেকে সরে এসে মনোযোগ দেয় নির্বাচনী প্রস্তুতিতে।
পরে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি ও লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) এই জোটে যুক্ত হলে সদস্য সংখ্যা দাঁড়ায় ১২টিতে। তবে আসন বণ্টন ও রাজনৈতিক সমঝোতা নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে শেষ পর্যন্ত ইসলামী আন্দোলন জোট থেকে বেরিয়ে যায় এবং হাতপাখা প্রতীক নিয়ে এককভাবে অংশ নেয় নির্বাচনে। এরপর জামায়াতের নেতৃত্বে বাকি দলগুলো নিয়ে চূড়ান্ত হয় ১১ দলীয় জোট। কিন্তু নির্বাচনকালেই জোটের ভেতরে নেতৃত্ব, রাজনৈতিক কৌশল এবং ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নিয়ে নানা অস্বস্তির ইঙ্গিত পাওয়া যায়। নির্বাচন শেষ হওয়ার পর ধীরে ধীরে প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে সেই অস্বস্তি।
সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি আসে গতকাল শনিবার। রাজধানীর কাকরাইলে ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ (আইডিইবি) মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার তৃতীয় সাধারণ অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে নেওয়া হয় ১১ দলীয় জোটের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত।
বৈঠক শেষে দলের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক প্রকৌশলী আবদুল হাফিজ খসরুর স্বাক্ষর করা সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ১১ দলীয় ঐক্য ছিল নির্বাচনকেন্দ্রিক সমঝোতা। নির্বাচন শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই ঐক্যের কার্যকারিতাও শেষ। ফলে এখন থেকে জোটের কোনো সভা, সমাবেশ বা কর্মসূচিতে অংশ নেবে না খেলাফত মজলিস। তবে দেশ, জাতি ও ইসলামের বৃহত্তর স্বার্থে ভবিষ্যতে নতুন কোনো রাজনৈতিক ঐক্যের প্রয়োজন হলে তা বিবেচনা করা হবে।
যদিও গতকালের সিদ্ধান্তটি আনুষ্ঠানিক, বাস্তবে খেলাফত মজলিসের দূরত্ব তৈরি হয়েছিল আরও আগে। গত ১৩ জুন চট্টগ্রামে ১১ দলীয় জোটের বিভাগীয় সমাবেশের পর দলটি স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, ভবিষ্যতে কোনো কর্মসূচির ব্যানার, পোস্টার কিংবা প্রচারণায় খেলাফত মজলিস বা তাদের নেতাদের নাম ব্যবহার করা যাবে না। পরে রংপুরের একটি সমাবেশে তাদের নাম ব্যবহার করা হলে আপত্তির মুখে তা প্রত্যাহার করা হয়। তখন থেকেই রাজনৈতিক মহলে ধারণা তৈরি হয়, আর এই জোটে থাকছে না খেলাফত মজলিস।
সংশ্লিষ্টদের মতে, জোট ছাড়ার পেছনে শুধু নির্বাচন-পরবর্তী বাস্তবতা নয়, কাজ করছে ইসলামপন্থি রাজনীতির ভেতরে নতুন করে শক্তির ভারসাম্য তৈরির চেষ্টাও। কওমি ঘরানার রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বড় ধরনের বিভাজন তৈরি করে সংসদ নির্বাচন। একটি অংশ জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটে যোগ দেয়, আরেকটি অংশ বিএনপির রাজনৈতিক বলয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে এবং ইসলামী আন্দোলন নির্বাচন করে এককভাবে। ফলে দীর্ঘদিনের আদর্শিক সখ্য থাকলেও বাস্তব রাজনীতিতে কওমি ধারার দলগুলো তিনটি পৃথক বলয়ে বিভক্ত হয়ে পড়ে। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন বলয়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রকাশ্য বক্তব্য, পাল্টা বক্তব্য এবং কাদা ছোড়াছুড়ির ঘটনাও ঘটে।
এ বিভক্তির অবসান ঘটানোর উদ্যোগ নিয়েছে হেফাজতে ইসলাম। সম্প্রতি চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির বাবুনগর মাদ্রাসায় হেফাজতের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর আহ্বানে কওমি ঘরানার সাতটি ইসলামী দলের শীর্ষ নেতাদের বৈঠক হয়। বৈঠকে অংশ নেন জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, ইসলামী ঐক্যজোট, খেলাফত আন্দোলন, খেলাফত মজলিস এবং ইসলামী আন্দোলনের প্রতিনিধিরা।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বৈঠকে আগামী ৩ আগস্টের মধ্যে প্রতিটি দলকে লিখিতভাবে তাদের রাজনৈতিক অবস্থান জানাতে বলা হয়েছে। এরপর একটি অভিন্ন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম বা নতুন জোট গঠনের বিষয়ে নেওয়া হবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। স্থানীয় সরকার নির্বাচন থেকে শুরু করে ভবিষ্যতের জাতীয় নির্বাচন পর্যন্ত সমন্বিতভাবে অংশ নেওয়ার বিষয়ও আলোচনায়।
হেফাজত-সংশ্লিষ্ট নেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন এ উদ্যোগের উদ্দেশ্য হলো— কওমি ঘরানার দলগুলোকে জামায়াত, বিএনপি কিংবা অন্য কোনো রাজনৈতিক বলয়ের বাইরে এনে একটি স্বতন্ত্র ইসলামী রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে একত্র করা। সে কারণে নতুন জোটে যুক্ত হতে চাইলে বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান পুনর্বিবেচনার বিষয়টি সামনে এসেছে।
রাজনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, খেলাফত মজলিস চলে যাওয়ার পর নিজেদের অবস্থান নিয়ে আলোচনা করছে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটে থাকা আরও অন্তত দুটি কওমি ঘরানার দল। হেফাজতের উদ্যোগ বাস্তবায়নের দিকে এগোলে তারাও বর্তমান জোট ছেড়ে যোগ দিতে পারে নতুন প্ল্যাটফর্মে। যদিও এ বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। তবে বিভিন্ন দলের শীর্ষ পর্যায়ে এ নিয়ে আলোচনা চলছে বলে একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র নিশ্চিত করেছে।
আগামী ৩ আগস্টের পর হেফাজতের উদ্যোগ কোন দিকে যায় এবং সেই সিদ্ধান্তের প্রভাবে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটে আরও ভাঙন দেখা দেয় কি না, সেদিকেই এখন রাজনৈতিক মহলের নজর। ইসলামপন্থি রাজনীতিতে নতুন মেরূকরণের সূচনা হতে পারে বলে মনে করছেন অনেকেই।
তবে জামায়াত নেতাদের একটি অংশ মনে করছেন, তাদের নেতৃত্বাধীন জোট থেকে কওমি ঘরানার দলগুলোকে বের করে আনার একটি পরিকল্পিত চেষ্টা চলছে। এর পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য।
এ বিষয়ে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদের ভাষ্য, খেলাফত মজলিস ছাড়া আমাদের জোটে যারা আছেন তারা কেউ আমাদের জোট ছাড়ার কথা বলেননি। আমার মনে হয় তারা জোটেই থাকবেন। জোটের ভেতরে কোনো সমস্যা বা দূরত্ব হলে সেটি আমরা আলোচনা করেই নিরসন করব। কোনো একটি পক্ষ আমাদের ঐক্যের ভাঙনে কাজ করছে বলে আমরা মনে করি।
‘আমরা এখনো ঐক্যে আছি। জাতীয় সংসদ এবং সংসদের বাইরে আমরা একসঙ্গে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছি। খেলাফত মজলিস ছাড়া অন্য কোনো দল ঐক্য ছাড়ছে কি না, তা আমাদের জানা নেই’— স্পস্ট করলেন এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব।




