দলীয় শৃঙ্খলায় কঠোর হচ্ছে জামায়াত
- অনুদান-ত্রাণ বণ্টনে বিতর্ক
- ইমেজ রক্ষায় ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি
- চিঠিতে এমপিদের কড়া সতর্কবার্তা কেন্দ্রের
- স্থানীয় নেতাদের বিরুদ্ধেও নিচ্ছে ব্যবস্থা

সরকারি অনুদান ও ত্রাণ বিতরণে স্বজনপ্রীতি, আত্মীয়দের সুবিধা পাইয়ে দেওয়া এবং স্থানীয় পর্যায়ে অনিয়মের একের পর এক অভিযোগে অস্বস্তিতে পড়েছে জামায়াতে ইসলামী। জাতীয় নির্বাচনের পর মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই দলটির একাধিক সংসদ সদস্য (এমপি) ও স্থানীয় বেশ কয়েকজন নেতাকে ঘিরে বিতর্ক তৈরি হওয়ায় বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। এরই মধ্যে দলের সব এমপিকে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে লিখিত নির্দেশনা। একই সঙ্গে বিভিন্ন অভিযোগে দলীয় পর্যায়ে বহিষ্কার এবং ঘটেছে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার ঘটনাও।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৬৮টি সাধারণ ও ৯টি সংরক্ষিত নারী আসনে জয় পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে জামায়াত। নির্বাচনের আগে ইনসাফ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিভিত্তিক রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিশ্রুতি দেওয়ায় দলটির নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রতি সাধারণ মানুষের ছিল বিস্তর প্রত্যাশা। কিন্তু সংসদের চার মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই কয়েকজন এমপির কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় নেতৃত্বের মধ্যে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ।
জামায়াতের একাধিক দায়িত্বশীল নেতা আগামীর সময়কে জানালেন, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্ন হিসেবে দেখলেও এগুলো যেন ধারাবাহিক রূপ না নেয়, সে বিষয়ে কেন্দ্র এখন রয়েছে কঠোর অবস্থানে। সম্প্রতি হওয়া একাধিক অভ্যন্তরীণ বৈঠকে সংসদ সদস্যদের স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে— সরকারি অনুদান, ঐচ্ছিক তহবিল, ত্রাণ কিংবা অন্য কোনো রাষ্ট্রীয় সুবিধা বণ্টনের ক্ষেত্রে এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না, যা দলকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
এরই ধারাবাহিকতায় দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের স্বাক্ষরে সব এমপির কাছে পাঠানো হয়েছে নির্দেশনামূলক চিঠি। যাতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সরকারি অনুদান ও আর্থিক সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন, শ্বশুরবাড়ির লোকজন, ব্যক্তিগত সহকারী (পিএ), ব্যক্তিগত সচিব (পিএস) কিংবা তাদের স্বজনদের জন্য সুপারিশ বা বরাদ্দ না দেওয়ার।
চিঠিতে বলা হয়, ‘সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অনুদান পাওয়ার যোগ্য বা প্রকৃত অর্থে অভাবগ্রস্ত হলেও সংসদ সদস্য হিসেবে আপনার সুপারিশ বা উদ্যোগে তাদের জন্য সরকারি অনুদান প্রদান না করার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা হচ্ছে। তবে, যদি এমন কোনো ব্যক্তি প্রকৃত অর্থেই অসহায়, অভাবগ্রস্ত এবং সহযোগিতা পাওয়ার উপযুক্ত হন, তাহলে বিষয়টি সংগঠনের মাধ্যমে উপস্থাপন করতে পারবেন। সংগঠন প্রয়োজনে সাধ্যমতো যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে, ইনশাআল্লাহ।’ দলীয় সূত্রের দাবি, ভবিষ্যতে কোনো বিতর্কের সুযোগ যাতে সৃষ্টি না হয়, সে কারণেই এই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে নড়াইল-২ আসনের এমপি আতাউর রহমানকে (বাচ্চু) ঘিরে। তার ঐচ্ছিক তহবিলের অনুদানের তালিকায় মেয়ের নামে দুই দফায় ১০ হাজার টাকা করে বরাদ্দ দেখানো হয়। একই তালিকায় তার নিজ ইউনিয়ন ও শ্বশুরবাড়ির এলাকার মানুষের সংখ্যাও বেশি ছিল বলে অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা শুরু হয়। পরে এমপি বাচ্চু দাবি করেন, তার করা আগাম স্বাক্ষর ব্যবহার করে ব্যক্তিগত সহকারী প্রস্তুত করেছিলেন তালিকা। এ ঘটনার পর তিনি দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেন ব্যক্তিগত সহকারীকে। তবে দলও ঘটনাটিকে গুরুত্ব দিয়ে তাকে সতর্কবার্তা পাঠিয়েছে।
এর আগে রংপুরের পীরগঞ্জ-৬ আসনের সংসদ সদস্য মো. নুরুল আমীনের বিরুদ্ধে টিআর, কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্পে আত্মীয়স্বজনকে সভাপতি করার অভিযোগ ওঠে। খুলনা-৬ আসনের এমপি আবুল কালামের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিলের অর্থ বিতরণে অনিয়ম এবং ঘনিষ্ঠদের সুবিধা দেওয়ার অভিযোগও সামনে আসে। এসব অভিযোগ নিয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ শুরু করে।
শুধু সংসদ সদস্য নয়, স্থানীয় পর্যায়েও কঠোরতা দেখিয়েছে জামায়াত। ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর উপজেলা জামায়াতের আমির মাওলানা তাজুল ইসলামকে সরকারি বরাদ্দের একটি বাইসাইকেল বিতরণে অনিয়মের অভিযোগে করা হয়েছে সাময়িক বহিষ্কার। এ ছাড়া মুন্সীগঞ্জে নৈতিক স্খলন, দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ এবং সাংগঠনিক আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে দুই রুকনের সদস্য পদ বাতিল করেছে দলটি। এ ছাড়া রাজধানীর ধানমন্ডিতে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় চার নেতাকর্মীকে করা হয়েছে বহিষ্কার।
দলীয় নেতারা বলছেন, অতীতের রাজনৈতিক ইতিহাসে নিজেদের স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠার যে চেষ্টা জামায়াত করে এসেছে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই ভাবমূর্তির জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সে কারণেই অভিযোগ সামনে আসার পর তা অস্বীকার না করে দ্রুত সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে কেন্দ্রীয়ভাবে নজরদারি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি।
দলের দায়িত্বশীল একাধিক নেতা বলছেন, জামায়াতের রাজনৈতিক অবস্থান ও নৈতিক দাবির কারণে তাদের জনপ্রতিনিধিদের ক্ষেত্রে জনসাধারণের প্রত্যাশা অন্য দলগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। ফলে তুলনামূলক ছোট অভিযোগও বড় রাজনৈতিক আলোচনার জন্ম দিচ্ছে।
কেন্দ্রীয় এক নেতা বললেন, ‘জামায়াতে ইসলামীর ইতিহাস স্বজনপ্রীতি বা ব্যক্তিস্বার্থকে প্রশ্রয় দেওয়ার নয়। আমরা ইনসাফ প্রতিষ্ঠার কথা বলি। কিন্তু সাম্প্রতিক কিছু ঘটনায় দলের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জামায়াতের আমিরসহ শীর্ষ নেতৃত্ব এসব বিষয়কে মোটেও হালকাভাবে নিচ্ছেন না। ভবিষ্যতে এমন অভিযোগ এলে আরও কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।’
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়েরও স্বীকার করেছেন, এমপিদের কাছে মানুষের প্রত্যাশা বেশি থাকায় ছোট ভুলও বড় বিতর্কে পরিণত হচ্ছে। তাই ভবিষ্যতে কোনো ধরনের অনিয়ম বা বিতর্ক এড়াতে সবাইকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
দলের নায়েবে আমির ও রাজশাহী-১ আসনের সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমানের ভাষ্য, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বড় ধরনের আর্থিক দুর্নীতির চিত্র না হলেও রাজনৈতিকভাবে দলের জন্য অস্বস্তিকর। তাই জনগণের আস্থা ও সংগঠনের নৈতিক অবস্থান অক্ষুণ্ন রাখতে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের আরও সতর্কতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।






