আখতার হোসেন
‘সাইবার সুরক্ষা আইনের সংশোধনী ডিজিটাল ফ্যাসিবাদের পথ খুলবে’

সংসদ সদস্য আখতার হোসেন। ছবি: আগামীর সময়
সাইবার সুরক্ষা আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনী নতুন করে ডিজিটাল ফ্যাসিবাদের পথ খুলে দিতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব ও রংপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আখতার হোসেন। তিনি বলেছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপপ্রয়োগে সাংবাদিক, লেখক ও সাধারণ মানুষকে হয়রানি করা হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতার পরও নতুন করে আইনের অস্পষ্ট বিধানের মাধ্যমে নাগরিকদের বাকস্বাধীনতা সংকুচিত করার উদ্যোগ উদ্বেগজনক।
আজ শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী মিলনায়তনে ‘সাইবার সুরক্ষা আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনী-বাকস্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকারের ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেছেন। এনসিপির সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটি এ সভার আয়োজন করে।
আখতার হোসেন বললেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপপ্রয়োগের মাধ্যমে অসংখ্য মানুষকে গ্রেপ্তার ও হয়রানি করা হয়েছে। সাংবাদিক, লেখক ও সাধারণ মানুষও এর শিকার হয়েছেন। লেখক মুশতাক আহমেদের কারাগারে মৃত্যুর ঘটনাও ওই আইনের অপপ্রয়োগের ভয়াবহতা সামনে এনেছিল। এসব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে অন্তর্বর্তী সরকার সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ প্রণয়ন করেছিল, যাতে অনলাইন অপরাধ মোকাবিলার পাশাপাশি নাগরিকদের অযাচিত গ্রেপ্তার ও হয়রানি থেকে সুরক্ষা দেওয়া যায়।
তরুণ এ রাজনীতিবিদ বললেন, বর্তমান সরকার প্রস্তাবিত সংশোধনীর মাধ্যমে অপরাধের সংজ্ঞা অস্পষ্ট ও ব্যাপক করার উদ্যোগ নিয়েছে। এর ফলে সরকারের সমালোচনা কিংবা অনলাইনে মতপ্রকাশের কারণে নাগরিকদের আইনি হয়রানির শিকার হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। সরকার-সমর্থকদের গালিগালাজ, গুজব ছড়ানো ও মানহানিকর বক্তব্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া না হলেও বিরোধী দলের নেতাকর্মী কিংবা সাধারণ মানুষ সরকারের সমালোচনা করলে আইনের আওতায় পড়তে পারেন।
এনসিপির সদস্য সচিব বললেন, গুজব, অপতথ্য ও মানহানির মতো অভিযোগের সংজ্ঞা স্পষ্ট না হলে এসব বিধান নাগরিকদের মধ্যে ভীতি তৈরির হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। এতে মানুষ হয়রানির আশঙ্কায় নিজের মতপ্রকাশ থেকে বিরত থাকবেন। অথচ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকারের সমালোচনা করা এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে কথা বলার অধিকার নাগরিকদের থাকতে হবে।
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের প্রসঙ্গ তুলে আখতার হোসেন বললেন, প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে চাকরিচ্যুত, গ্রেপ্তার ও বিচারের আওতায় আনতে হবে। বিভিন্ন জেলা থেকে পরীক্ষা দিতে আসা ক্ষতিগ্রস্ত চাকরিপ্রার্থীদের ক্ষতিপূরণের বিষয়টিও বিবেচনা করতে হবে। তার মতে, রাষ্ট্রের বিভিন্ন অনিয়ম ও ব্যর্থতা নিয়ে নাগরিকরা যাতে নির্ভয়ে কথা বলতে পারেন, তা নিশ্চিত করা জরুরি। সাইবার সুরক্ষা আইনের সংশোধনী যেন এসব বিষয়ে কথা বলা মানুষের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত না হয়, সে বিষয়ে সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে।
আলোচনা সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন শিক্ষাবিদ এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও গুমসংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারির সাবেক সদস্য ড. নাবিলা ইদ্রিস। তিনি বললেন, অনলাইনে উসকানি, সহিংসতায় আহ্বান, নারী ও শিশুর প্রতি হয়রানি এবং অপতথ্য ছড়ানোর মতো অপরাধ প্রতিরোধ করা জরুরি। তবে এসব অপরাধ মোকাবিলার যুক্তিতে নতুন বিধান যুক্ত করার আগে সেগুলোর প্রয়োজনীয়তা ও যৌক্তিকতা স্পষ্ট করতে হবে। গুজবের সংজ্ঞা অস্পষ্ট থাকলে তা বাকস্বাধীনতার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। আইনের অপব্যবহার ঠেকাতে স্বাধীন তদন্ত, স্বচ্ছ যাচাই প্রক্রিয়া ও বিচারিক তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।
আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান ভূঁইয়া মঞ্জু বলেছেন, আইনের অস্পষ্ট বিধান সাধারণ মানুষকে হয়রানির সুযোগ তৈরি করতে পারে। অতীতে ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় প্রণীত আইন ও গঠিত বাহিনী পরবর্তী সময়ে বিএনপির বিরুদ্ধেও ব্যবহৃত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি সরকারকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য সারোয়ার তুষার বলেছেন, প্রস্তাবিত সংশোধনীতে মানহানি, অপমান ও গুজবের মতো বিষয়গুলোর সংজ্ঞা স্পষ্ট নয়।
ডেইলি ওয়াদার ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ফয়সাল মাহমুদ বললেন, প্রস্তাবিত সংশোধনীর কিছু বিধান সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকতার ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। সরকারি নিশ্চিতকরণ ছাড়া সংবাদ প্রকাশ করলে মামলা বা হয়রানির আশঙ্কা তৈরি হলে সংবাদমাধ্যমে স্ব-আরোপিত সেন্সরশিপ বাড়তে পারে।



