বড় পরিবর্তনে নতুন স্বপ্ন দেখছে এনসিপি
- সাংগঠনিক কাঠামোয় ব্যাপক পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত
- বাড়ছে পলিটিক্যাল কাউন্সিল সদস্যদের দায়িত্ব

কোলাজ : আগামীর সময়
আত্মপ্রকাশের দেড় বছরের মাথায় বড় ধরনের সাংগঠনিক পুনর্গঠনের পথে হাঁটছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। প্রতিষ্ঠাকালীন ১০ সদস্যের শীর্ষ নেতৃত্বের কাঠামো ভেঙে সেটিকে ৬ সদস্যে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। একই সঙ্গে দলটির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম পলিটিক্যাল কাউন্সিলের (পিসি) সদস্যদের দায়িত্বও বাড়ানো হচ্ছে। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যন্ত সংগঠনকে আরও কার্যকর, বিকেন্দ্রীভূত ও গতিশীল করতেই এই পরিবর্তন আনা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন দলটির দায়িত্বশীল নেতারা।
দলীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে, আগামী জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন সাংগঠনিক কাঠামো ঘোষণা করা হতে পারে। এরপর ২০২৭ সালের শুরুতে অনুষ্ঠিত হবে দলটির প্রথম জাতীয় কাউন্সিল। ততদিন পর্যন্ত পুনর্গঠিত আহ্বায়ক কমিটিই দল পরিচালনা করবে।
গত বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি তরুণদের রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এনসিপি। আত্মপ্রকাশের সময় এক বছরের জন্য আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হলেও সেই মেয়াদ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে।
নেতাকর্মীদের মধ্য থেকে নতুন কাউন্সিল আয়োজনের দাবি থাকলেও পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতি, দল গঠনের কার্যক্রম এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ব্যস্ততার কারণে নির্ধারিত সময়ে কাউন্সিল আয়োজন সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছেন নেতারা। এখন সংগঠনকে আরও শক্তিশালী ও গতিশীল করে প্রতিষ্ঠার দুই বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই প্রথম কাউন্সিল আয়োজনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
প্রতিষ্ঠাকালীন সাংগঠনিক কাঠামোয় আহ্বায়ক, সদস্য সচিব, মুখ্য সংগঠক, মুখপাত্র, মুখ্য সমন্বয়ক, মুখ্য সমন্বয়ক উত্তরাঞ্চল, মুখ্য সমন্বয়ক দক্ষিণাঞ্চলসহ মোট ১০টি শীর্ষ পদ ছিল। নতুন কাঠামোয় মুখ্য সংগঠক, মুখপাত্র, মুখ্য সমন্বয়ক এবং উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সমন্বয়কের পদ বিলুপ্ত করা হচ্ছে।
নতুন প্রস্তাবিত কাঠামোয় পুরো কেন্দ্রীয় কমিটি আহ্বায়ক কমিটি হিসেবেই পরিচালিত হবে। এতে থাকবেন একজন আহ্বায়ক, দুইজন সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক, একজন সদস্য সচিব এবং দুইজন সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব।
দলীয় সূত্র বলছে, আহ্বায়ক হিসেবে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম এবং সদস্য সচিব হিসেবে সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বহাল থাকছেন। সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক হচ্ছেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ। অন্যদিকে সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পাচ্ছেন সারজিস আলম ও আসিফ মাহমুদ।
শীর্ষ এই ছয় পদের বাইরে বর্তমান পলিটিক্যাল কাউন্সিলের সদস্যদের যুগ্ম আহ্বায়ক ও যুগ্ম সদস্য সচিব পদে রাখা হতে পারে। এছাড়া কেন্দ্রীয় পর্যায়ে ২৫ থেকে ৩০টি সম্পাদকীয় ও সহ-সম্পাদকীয় পদ সৃষ্টি এবং প্রতিটি অঙ্গ ও সহযোগী উইংয়ে পৃথক উপকমিটি গঠনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
কেবল সাংগঠনিক কাঠামো নয়, দায়িত্ব বণ্টনেও আসছে বড় পরিবর্তন। এবার পলিটিক্যাল কাউন্সিলের সদস্যদের নির্দিষ্ট খাতভিত্তিক দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের গতি বাড়াতে চায় দলটি।
এ পরিকল্পনা অনুযায়ী নাহিদ ইসলাম ও আখতার হোসেন দলের রাজনৈতিক বিষয় দেখবেন। নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী সমন্বয় করবেন জোট রাজনীতি। সারজিস আলম ও আসিফ মাহমুদ সাংগঠনিক কার্যক্রমের দায়িত্বে থাকবেন। হাসনাত আব্দুল্লাহ ও আরিফুল ইসলাম আদীব কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করবেন। সংসদ সদস্য ড. আতিক মুজাহিদ সমন্বয় করবেন পেশাজীবী সংগঠনগুলো, আরেক সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল আমিন দেখবেন সাংগঠনিক শৃঙ্খলা, আলী আহসান জুনায়েদ ছাত্রসংগঠনের কার্যক্রম, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নুসরাত তাবাসসুম জুলাই-সংশ্লিষ্ট বিষয় এবং সালেহ উদ্দিন সিফাত পরিচালনা করবেন দাপ্তরিক কার্যক্রম।
সাংগঠনিক বিস্তার বাড়াতে দেশের ৬৪ জেলাকে নতুনভাবে সাংগঠনিক অঞ্চলে ভাগ করার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। প্রশাসনিক বিভাগের পাশাপাশি বৃহত্তর ফরিদপুর, বৃহত্তর কুমিল্লা, বৃহত্তর বগুড়া কিংবা বৃহত্তর ময়মনসিংহের মতো ঐতিহাসিক অঞ্চলগুলোকে আলাদা সাংগঠনিক বিভাগ হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে। প্রতিটি বিভাগের দায়িত্বে থাকবেন একজন জ্যেষ্ঠ নেতা। তিনি সংশ্লিষ্ট এলাকার জেলা, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের কমিটি গঠন ও পুনর্গঠনের কাজ তদারকি করবেন।
এরই মধ্যে দলটির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম পলিটিক্যাল কাউন্সিলেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। নতুন করে যুক্ত হয়েছেন যুগ্ম আহ্বায়ক ও সংসদ সদস্য নুসরাত তাবাসসুম, যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার, যুগ্ম আহ্বায়ক আলী আহসান জুনায়েদ, যুগ্ম সদস্য সচিব আকরাম হুসাইন, যুগ্ম সদস্য সচিব সালেহ উদ্দিন সিফাত এবং যুগ্ম মুখ্য সংগঠক ও সংসদ সদস্য ডা. মাহমুদা মিতু। নতুন সদস্য যুক্ত হওয়ার পর পলিটিক্যাল কাউন্সিলের সদস্যসংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮ জনে।
দলীয় নেতারা মনে করছেন, সাংগঠনিক পুনর্গঠনের এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে দলকে আরও সুসংগঠিত করার কৌশল। গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ৬টিতে জয় পায় এনসিপি। পরে নারী সংরক্ষিত দুটি আসন পাওয়ায় বর্তমানে জাতীয় সংসদে দলটির প্রতিনিধির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮ জনে। এই সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে এবং আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনসহ স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ভালো ফল অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে তৃণমূল সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করতে চায় দলটি। কেন্দ্র থেকে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত সাংগঠনিক কাঠামোকে কার্যকর ও সক্রিয় করাই এখন এনসিপির অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার।
দলটির একাধিক নীতিনির্ধারকের ভাষ্য, আত্মপ্রকাশের পর এনসিপি এখন দ্বিতীয় ধাপের সাংগঠনিক যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছে। প্রতিষ্ঠার সময় যে রাজনৈতিক দর্শন ও পরিবর্তনের বার্তা নিয়ে দলটি যাত্রা শুরু করেছিল, নতুন কাঠামোর মাধ্যমে সেটিকে আরও সুসংহত করার পাশাপাশি তৃণমূল পর্যন্ত শক্তিশালী সাংগঠনিক ভিত্তি গড়ে তোলাই হবে আগামী দিনের প্রধান লক্ষ্য।
এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব বলেছেন, প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে যে সাংগঠনিক কাঠামো ছিল, বর্তমান বাস্তবতায় সেখানে পরিবর্তনের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। অনেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, নতুন সদস্যরাও দলে যুক্ত হয়েছেন। সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে দায়িত্ব পুনর্বিন্যাসের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এতে সংগঠন আরও গতিশীল হবে এবং দল পরিচালনায় সমন্বয় বাড়বে।
দলের যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বলেছেন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে সাংগঠনিক গতিশীলতা বাড়ানোর লক্ষ্যেই দল পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে নতুন কাঠামো চূড়ান্ত হবে। আগামী বছরের শুরুতে প্রথম জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হবে। ততদিন পর্যন্ত পুনর্গঠিত কমিটিই দায়িত্ব পালন করবে।




