স্বেচ্ছায় হেরে হাজার কোটি হাতছাড়া সরকারের!

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
অধিকাংশ কর মামলায় হেরে যায় সরকার। অথচ এগুলোর আইনি ভিত্তি খুবই জোরালো। এরপরও কেন এমন হয়, প্রশ্ন নানা মহলের। উদ্বিগ্ন অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিসও। রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তার এ দপ্তরটির মতে— রাজস্ব কর্মকর্তাদের স্বেচ্ছাচারিতা, মামলা করার প্রক্রিয়ায় ত্রুটি এবং আইনের ভুল ব্যাখ্যা দেওয়ার কারণেই মূলত ঘটছে এমনটি। এ ছাড়া আছে সময়সীমা লঙ্ঘন, নোটিস জারিতে অনিয়ম এবং নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা। এতে মামলার আদেশ চলে যাচ্ছে কর ফাঁকিবাজদের পক্ষে। এভাবেই বছরে হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হাতছাড়া হচ্ছে সরকারের। অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসের তৈরি করা ‘রাজস্ব মামলা ও আদায় কমিটি’ শিরোনামের এক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে পাওয়া গেছে এসব তথ্য।
এসব সমস্যা সমাধানে ‘ফিসকাল লিটিগেশন কো-অর্ডিনেশন সেল’ গঠন, কেন্দ্রীয় আইনি তথ্যভাণ্ডার তৈরি এবং এনবিআর ও অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ের মধ্যে ত্রৈমাসিক যৌথ পর্যালোচনা সভা করাসহ ৯ দফা সুপারিশ করেছে অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিস।
এদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০২৩-২৪ ও ২০২২-২৩ অর্থবছরে হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে ৫৪০টি মূল্য সংযোজন কর-সংক্রান্ত মামলা নিষ্পত্তি হয়। সেখানে সরকারের পক্ষ থেকে ৩ হাজার ৩৪৭ কোটি টাকা দাবি করা হলেও রাজস্ব আদায় হয়েছে মাত্র ৫৫ কোটি ২৪ লাখ।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান আগামীর সময়কে বলেছেন, রাজস্ব ফাঁকির ঘটনায় প্রাথমিক দায়িত্ব রাজস্ব কর্মকর্তাদের। তবে পুরো দায় শুধু তাদের ওপর চাপিয়ে দিলে সমস্যার সমাধান হবে না। নানা দুর্বলতার সুযোগে অসাধু করদাতারা হাজার হাজার কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছেন, যা রাষ্ট্রের জন্য বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ড. ইফতেখারুজ্জামান আরও বললেন, রাজস্ব-সংক্রান্ত বিরোধ ও মামলা নিষ্পত্তির পুরো প্রক্রিয়া সবসময় রাজস্ব কর্মকর্তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। এক্ষেত্রে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়সহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রতিষ্ঠানও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে বিচার ও নিষ্পত্তি প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত সব পক্ষের জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এ ছাড়া রাষ্ট্রের রাজস্ব আদায়ের স্বার্থে বিষয়টি নিয়ে একটি নিরপেক্ষ ও গভীর বিশ্লেষণ প্রয়োজন। একই সঙ্গে আইন ও প্রক্রিয়ার দুর্বলতা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সংস্কার করা হলে রাজস্ব ফাঁকি রোধ এবং আদায়ব্যবস্থা আরও কার্যকর করা সম্ভব— যোগ করেন তিনি।
জ্যেষ্ঠ ভ্যাট আইন বিশেষজ্ঞ বিন্দু সাহার মতে, রাজস্ব-সংক্রান্ত মামলা করার ক্ষেত্রে এনবিআরের কর্মকর্তাদের কিছুটা অদক্ষতা রয়েছে। মামলা করার সময় আইনের সঠিক ধারা প্রয়োগ হয় না। আবার অনেক সময় সঠিক হিসাবও নিরূপণ করা হয় না। ফলে উচ্চ আদালতে এসব মামলা টেকে না।
যত পর্যবেক্ষণ: অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিস বলছে, রাজস্ব কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতা মূলত আইনি ক্ষমতার অভাবে নয়; বরং সে ক্ষমতা প্রয়োগে আইনি নীতি না মানার কারণে ঘটছে। ভ্যাট প্রশাসন প্রসঙ্গে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, আইন অনুযায়ী নির্ধারিত সময়সীমা পার হওয়ার পরও অনেক ক্ষেত্রে ভ্যাট দাবি করা হচ্ছে। বর্তমানে ভ্যাট আইনের ধারা ৭৩(৩) অনুযায়ী, সাধারণত পাঁচ বছর এবং রপ্তানিমুখী শিল্পে তিন বছরের মধ্যে দাবি উত্থাপন করতে হয়। কিন্তু সময়সীমা অতিক্রম করে জারি করা এসব দাবি আদালতে টিকছে না।
এ ছাড়া নির্দিষ্ট লেনদেন যাচাই ছাড়াই আনুপাতিক হারে ইনপুট ট্যাক্স রিবেট বাতিলের প্রবণতাকেও আইনবহির্ভূত বলা হয়েছে প্রতিবেদনে। পাশাপাশি ধারা ৫৫ অনুযায়ী, কর নির্ধারণ এবং ধারা ৩৭ অনুযায়ী জরিমানার নোটিস একসঙ্গে জারি করাকেও বেআইনি হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়, আগে কর নির্ধারণ সম্পন্ন করতে হবে, পরে জরিমানার প্রক্রিয়া নেওয়া যাবে।
কাস্টমস প্রশাসনে অসামঞ্জস্যপূর্ণ শুল্ক সুবিধা এবং একই ধরনের পণ্যে ভিন্ন সময়ে ভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়াকে ‘স্বেচ্ছাচারিতা’ হিসেবে মন্তব্য করা হয়েছে প্রতিবেদনে। সেখানে বলা হয়, সাময়িক মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ১২০ কর্মদিবসের মধ্যে চূড়ান্ত মূল্যায়ন না হলে সেটিই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে। এরপর ব্যাংক গ্যারান্টি থেকে অর্থ আদায়ের সুযোগ থাকে না।
জব্দ করা পণ্যের ক্ষেত্রে দুই মাসের মধ্যে শোকজ নোটিস না দিলে পণ্য ফেরত দিতে হবে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি বন্ডেড ওয়্যারহাউজ লাইসেন্স বাতিল বা স্থগিতের আগে অবশ্যই শোকজ নোটিস ও নির্দিষ্ট সময়সীমা দিতে হবে— এমন পরামর্শ দিয়েছে অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিস।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, আমদানিনীতি আদেশে অন্তর্ভুক্ত নয়— এমন কোনো বিধিনিষেধ অন্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে কাস্টমসে কার্যকর করা যাবে না। এ ছাড়া এসআরওর মাধ্যমে আইনের বাইরে গিয়ে ব্র্যান্ড, মডেল বা উৎপত্তি দেশের ভিত্তিতে মূল্য নির্ধারণের সমালোচনাও করা হয়েছে।
আয়কর প্রশাসনের ক্ষেত্রে সম্পদ জব্দে অনিয়ম, নোটিস প্রেরণে দুর্বলতা এবং শুনানির নিয়ম না মানার বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে। এ প্রসঙ্গে অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসের মন্তব্য, আয়কর আইনের ধারা ২২৩ অনুযায়ী সম্পদ জব্দের আগে সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকতে হবে। পরে কারণ খোঁজার জন্য সম্পদ জব্দ করা সম্পূর্ণ বেআইনি। একই ধারা অনুযায়ী, কর সংশোধনের আগে নির্দিষ্ট অভিযোগ উল্লেখ করে শোকজ নোটিস ও শুনানির সুযোগ দেওয়া বাধ্যতামূলক।
অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় বলছে, রেজিস্টার্ড ডাকের মাধ্যমে নোটিস পাঠানোর প্রমাণ সংরক্ষণ না করায় আদালতে রাষ্ট্রের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ছে। পুনর্মূল্যায়ন নোটিসের ক্ষেত্রেও শুধু তারিখ উল্লেখ করাই যথেষ্ট নয়, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা প্রকৃতপক্ষে পাঠানো হয়েছে— এমন প্রমাণ রাখতে হবে।
প্রতিবেদনে রাজস্ব প্রশাসনের সামগ্রিক দুর্বলতার মধ্যে আইনি ব্যাখ্যার ঘাটতি, রেকর্ড সংরক্ষণে অবহেলা, মাঠ কার্যালয় ও আইনি শাখার মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং মামলার প্রস্তুতির অপ্রতুলতার বিষয়গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে।
এনবিআরের সদস্য (ভ্যাট অডিট) সৈয়দ মুসফিকুর রহমান আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘উচ্চ আদালতে করা রাজস্ব-সংক্রান্ত মামলায় পদ্ধতিগত দুর্বলতার বিষয়ে কিছু পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিস। আমরা সেগুলো মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাছে এর মধ্যে পাঠিয়ে দিয়েছি। ভবিষ্যতে মামলা করতে এসব নির্দেশনা অনুসরণ করা হবে।’
৯ দফা সুপারিশ: উল্লিখিত সমস্যার সমাধানে যে ৯ দফা সুপারিশ করেছে অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিস সেগুলো হচ্ছে— ‘ফিসকাল লিটিগেশন কো-অর্ডিনেশন সেল’ গঠন, উচ্চমূল্যের নোটিসে বাধ্যতামূলক আইনি যাচাই, অভিন্ন স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) চালু, রাজস্ব কর্মকর্তাদের নিয়মিত আইনি প্রশিক্ষণ এবং সময়সীমা পর্যবেক্ষণে ডিজিটাল সিস্টেম চালু করা। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় আইনি তথ্যভাণ্ডার তৈরি, নোটিসের অভিন্ন টেমপ্লেট প্রণয়ন, আপিল-সংক্রান্ত নথি অন্তত ১৪ দিন আগে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে পাঠানো এবং এনবিআর ও অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ের মধ্যে ত্রৈমাসিক যৌথ পর্যালোচনা সভা করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।
প্রক্রিয়াগত শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা গেলে অপ্রয়োজনীয় মামলা কমবে এবং সরকারের রাজস্ব আদায়ও সুরক্ষিত হবে— এমন মন্তব্য করা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে।




