ঐক্যে জোর তারেক রহমানের
শরিকদের মধ্যে মতভিন্নতা আছে, বিভেদ নেই

রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে নৈশভোজে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি: সংগৃহীত
ফ্যাসিস্ট সরকার পতনের যুগপৎ আন্দোলনের শরিক রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতভিন্নতা থাকতে পারে, তবে কোনো বিভেদ নেই বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, দেশের মানুষের আস্থা ধরে রাখতে সব শরিককে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে এবং ৩১ দফা ও জুলাই সনদের আলোকে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে।
সোমবার সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলোর নেতাদের সম্মানে আয়োজিত নৈশভোজের আগে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। পরে শরিক নেতাদের সঙ্গে একই টেবিলে নৈশভোজে অংশ নেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা একসঙ্গে আছি, আমরা একসঙ্গে ছিলাম। ইনশাআল্লাহ আমরা ভবিষ্যতেও একসঙ্গে থাকব। আমাদের মধ্যে মতের ভিন্নতা থাকতে পারে, কিন্তু ভুল বোঝাবুঝির কোনো কারণ আছে বলে আমি মনে করি না। ৩১ দফার মাধ্যমে আমরা একটি জায়গায় একত্রিত হয়েছি। আমাদের উদ্দেশ্য এবং লক্ষ্য এক।’
তিনি আরও বলেন, ‘যেহেতু আমাদের উদ্দেশ্য এবং লক্ষ্য এক, সেহেতু একটি দফা কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, সে বিষয়ে আপনার একটি মত থাকতে পারে, আমার একটি মত থাকতে পারে। এখানেই হয়তো কিছুটা ভিন্নতা থাকতে পারে। কিন্তু আমাদের মধ্যে কোনো বিভেদ নেই। আমাদের মধ্যে যেহেতু বিভেদ নেই, তাই ৩১ দফা এবং জুলাই সনদের আলোকে আমরা ইনশাআল্লাহ দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাব।’
অতীতের আন্দোলনের প্রসঙ্গ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আজকে অনেকেই দাবি করে। কারও নাম আমি উল্লেখ করতে চাই না। যাদেরকে একটি শব্দ, ‘গুপ্ত’, ব্যবহার করলেই সাধারণ মানুষও চিনে। ওই সময়ে আমরা তাদের অনেক খুঁজেছি, কিন্তু পাইনি। আপনারা কি রাজপথে তাদের কাউকে পেয়েছিলেন? আমরা তাদের রাজপথে দেখিনি। বিভিন্ন সময়ে দেখেছি, যারা দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছে, তাদের সঙ্গে বিভিন্নভাবে তাদের দেখা গেছে। শেষের দিকে কিছু জায়গায় তাদের দেখা গেলেও ১৭ বছর আমরা তাদের কোথাও দেখিনি। কাজেই দেশের মানুষ আমাদের ওপরই আস্থা রেখেছে যে, এরাই দেশকে নিয়ে যেতে পারবে। এটি আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।’
দেশের মানুষের প্রত্যাশার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘দেশের মানুষের আস্থা ধরে রাখার জন্য আমাদের যেকোনো মূল্যে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। জনগণ প্রত্যাশা নিয়ে আমাদের দায়িত্ব দিয়েছে। আসুন, আগে আমরা সেই দায়িত্ব পালন করি। তারপর নিজেদের নিয়ে ভাবি।’
বক্তব্যের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘অনেকদিন পরে আপনাদের সঙ্গে আজ দেখা হলো। আমরা একসঙ্গে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছি, অত্যাচারিত হয়েছি, নির্যাতিত হয়েছি। আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহর রহমতে বাংলাদেশের মানুষের রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে আমরা সফল হয়েছি। মানুষের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার যে দাবি নিয়ে আমরা জনগণের কাছে গিয়েছিলাম, সেই অধিকার প্রতিষ্ঠা করে আমরা বিজয় অর্জন করেছি। বাংলাদেশের মানুষ তাদের রায় দিয়ে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব আমাদের দিয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘অনেকগুলো রাজনৈতিক দল একসঙ্গে বসে আমরা ৩১ দফা জনগণের সামনে উপস্থাপন করেছিলাম। তখন রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে যারা আজ বড় বড় কথা বলেন, তাদের অনেককেই তখন সংস্কারের ‘স’ উচ্চারণ করতে দেখিনি। অথচ আজ এই প্যান্ডেলের নিচে যারা বসে আছি, তারাই স্বৈরাচারের চোখ রাঙানিকে উপেক্ষা করে রাষ্ট্র সংস্কারের দফাগুলো দিয়েছিলাম।’
তার ভাষ্য, ‘আমি মনে করি, নির্বাচনে জনগণ ৩১ দফার পক্ষেই রায় দিয়েছে। এখন এই ৩১ দফা শুধু আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর নয়, বাংলাদেশের জনগণের ৩১ দফায় পরিণত হয়েছে। ১২ তারিখের নির্বাচনে আমরা একসঙ্গে কাজ করেছি এবং সফল হয়েছি।’
নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতির প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আপনারা নিশ্চয়ই দেখেছেন, ৫ আগস্ট স্বৈরাচার বিতাড়িত হওয়ার পর একটি গুপ্তবাহিনী ধীরে ধীরে আত্মপ্রকাশ করেছিল। আমি বিস্তারিত বলব না। নির্বাচনের আগে এবং ১২ তারিখের নির্বাচনে তারা কীভাবে স্বৈরাচারী কায়দায় ডিজিটাল উপায়ে কাজ করেছে এবং জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছে, তা আপনাদের জানা আছে। তবে ইতিহাস সাক্ষী, বাংলাদেশের মানুষ যখনই স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের সুযোগ পেয়েছে, তখনই দেশের পক্ষে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ১২ তারিখের নির্বাচনেও তারা সেটিই করেছে।’
সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের এক উপদেষ্টার সঙ্গে আলাপের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, ‘কয়েকদিন আগে আমার সঙ্গে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের একজন উপদেষ্টার সাক্ষাৎ হয়েছিল। তিনি বলছিলেন, ১৮ মাস দেশ পরিচালনার সময় তারা কতটা অসহায়ের মতো ছিলেন। তার ভাষ্য, সরকারের ৬০ শতাংশেরও বেশি জায়গায় সেই গুপ্তবাহিনীর প্রভাব ছিল।’
তিনি আরও বলেন, ‘নির্বাচনের পর আমরা দেখেছি, এই গুপ্তবাহিনী দিশেহারা হয়ে নানা ধরনের বক্তব্য দিচ্ছে। পত্রপত্রিকা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা তা দেখছি। ওই উপদেষ্টার বক্তব্য ছিল, ১৮ মাস তারা পুরো ব্যবস্থাকে নিজেদের পক্ষে ব্যবহার করেছে। কিন্তু ১২ তারিখে জনগণ রায় দেওয়ার পর থেকেই তারা দিশেহারা হয়ে গেছে।’
ফ্যাসিস্ট সরকারের ১৬ থেকে ১৭ বছরে দেশের অর্থনীতি, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ, শিক্ষা, যোগাযোগ এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার সেই সংকট মোকাবিলায় কাজ করছে।
শরিক নেতাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আমরা এতদিন একসঙ্গে ছিলাম। কেন আমরা সরে যাব? আমরা একসঙ্গেই থাকব। চলতে গেলে এদিক-ওদিক হতেই পারে। দুই কোটি মানুষের এই দেশে সমস্যা থাকবেই। ঢাকা শহর পরিষ্কার করতেও কত সমস্যা। যেদিকে তাকাবেন, ময়লা। কেউ একজন বলেছেন, এটা কি বিদায়ী নৈশভোজ? বিদায়ী নৈশভোজ কেন হবে? বিদায়ী নৈশভোজ যদি দিতেই হয়, তাহলে গুপ্তদের বা স্বৈরাচারকে দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু আমরা যারা ছিলাম, আমরা ইনশাআল্লাহ একসঙ্গেই থাকব।’
অনেকদিন একসঙ্গে বসার সুযোগ না হওয়ায় এই আয়োজন করা হয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি জানি, মুরব্বিরা যে কথাগুলো বলেছেন, সেগুলোর সঙ্গে আমি দ্বিমত করব না। তাদের মনে কষ্ট আছে, সেটিও আমি জানি। স্বাভাবিকভাবেই বয়সে তারা আমার বড়। ছোট ভাই হিসেবে আমি তাদের সব কথা মেনে নিই। আমি দুঃখ প্রকাশ করছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি শুধু এতটুকুই অনুরোধ করব, আমাদের সবাইকে একটু ধৈর্য ধরতে হবে। মান্না ভাইও বলেছেন, জনগণের প্রত্যাশা অনেক। আসুন, আমরা সবাই মিলে আগে জনগণের প্রত্যাশার জায়গাটিকে গুরুত্ব দিই।’
সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে যমুনায় পৌঁছে প্রধানমন্ত্রী শরিক নেতাদের টেবিলে টেবিলে গিয়ে কুশল বিনিময় করেন এবং তাদের খোঁজখবর নেন। পরে সবাইকে নিয়ে অংশ নেন নৈশভোজে।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে শুরু হয় অনুষ্ঠান।
প্রধানমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বক্তব্য দেন জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক এবং জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মুফতি মহিউদ্দিন ইকরাম।
অনুষ্ঠানে ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহ উদ্দিন আহমদ, সেলিমা রহমান, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, দলের সহসভাপতি বরকত উল্লাহ বুলু, মোহাম্মদ শাহজাহান, আবদুল আউয়াল মিন্টুসহ শরিক দলগুলোর শীর্ষ নেতারা।
নৈশভোজে একই টেবিলে নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না, গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক, জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির আন্দালিব রহমান পার্থ, বিএনপির মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, গণফোরামের সুব্রত চৌধুরী এবং ভাসানী জনশক্তি পার্টির শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলুর সঙ্গে খাবার খেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।




