বিএনপি সরকারের ১০০ দিন
সাফল্যের চেয়ে ব্যর্থতার পাল্লা ভারী বলছে বিরোধী দল

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম ১০০ দিন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। সরকার এই সময়কে রাষ্ট্র সংস্কার, প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সূচনা হিসেবে তুলে ধরলেও বিরোধী দলগুলো বলছে, বাস্তবে প্রত্যাশা পূরণে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। তাদের দাবি, দৃশ্যমান সাফল্যের চেয়ে ব্যর্থতার চিত্রই বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে এই সময়ে।
বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর যে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত ও রাষ্ট্র সংস্কারের প্রতিশ্রুতি সামনে এসেছিল, তার বাস্তবায়নে কার্যকর কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। বিশেষ করে “জুলাই সনদ” ও গণভোটের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট রোডম্যাপ না থাকায় রাজনৈতিক মহলে হতাশা তৈরি হয়েছে।
তাদের মতে, সরকার পরিবর্তনের পর মানুষ যে ধরনের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কার প্রত্যাশা করেছিল, বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। বরং পুরোনো কাঠামো বহাল রেখেই নতুন সরকারের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ বিরোধী নেতাদের।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও সরকারের বড় ব্যর্থতার জায়গা হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় চুরি, ছিনতাই, দখল, রাজনৈতিক সহিংসতা, হত্যা ও ধর্ষণের ঘটনা বাড়ছে বলে দাবি করেছে বিরোধী দলগুলো। তারা বলছে, জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার এখন পর্যন্ত কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি।
অন্যদিকে বাজার পরিস্থিতি নিয়েও অসন্তোষ বাড়ছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমানোর প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবে বাজারে স্বস্তি ফেরেনি বলে অভিযোগ সাধারণ মানুষের। চাল, ডাল, তেল, সবজি ও মাংসসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম এখনো উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। বিরোধী দলগুলোর ভাষ্য, বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের সমন্বয়হীনতা ও দুর্বল নজরদারির কারণেই পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি।
সরকারের ১০০ দিনের মূল্যায়ন নিয়ে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ আগামীর সময়কে বললেন, 'সরকারের সাফল্যের পাল্লার চেয়ে ব্যর্থতার পাল্লাই বেশি ভারী। একটি সরকারের মেয়াদ পাঁচ বছর হলেও মাত্র ১০০ দিনের মধ্যেই যদি এমন মূল্যায়ন সামনে আসে, তাহলে সেটি মূলত সরকারের ব্যর্থতার প্রতিফলন। জনগণের প্রত্যাশা ও আকাঙ্ক্ষার বড় কোনো জায়গাতেই সরকার সফল হতে পারেনি।'
তিনি আরও বললেন, 'সরকার শুরু থেকেই জুলাই সনদের প্রশ্নে জনগণের সঙ্গে এক ধরনের প্রতারণা করেছে। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, ব্যাংক দখলের চেষ্টাসহ নানা ঘটনা ইতোমধ্যে জনমনে উদ্বেগ তৈরি করেছে। সব মিলিয়ে সরকার শেষ পর্যন্ত পুরোনো রাজনৈতিক ধারাতেই হাঁটছে বলে আমরা মনে করছি।'
ব্যাংকিং খাতের সমালোচনা করে তিনি জানালেন, ব্যাংকিং খাতে মারাত্মকভাবে প্রাতিষ্ঠানিক দলীয়করণ হচ্ছে। আওয়ামী লীগের সময় যেভাবে ব্যাংক খাত দখল ও নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ ছিল, বর্তমান সরকারও একই পথে হাঁটছে বলে মনে হচ্ছে।
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষারের মূল্যায়ন, 'সরকার জনগণের কাছে যে প্রতিশ্রুতিগুলো দিয়েছিল, সেগুলোর প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্র থেকেই পিছিয়ে এসেছে। বাস্তব পরিবর্তনের বদলে আমরা এক ধরনের প্রচারণানির্ভর রাজনীতি দেখতে পাচ্ছি। প্রধানমন্ত্রীর পারফরম্যান্সভিত্তিক রাজনৈতিক উপস্থাপন থাকলেও বাংলাদেশের মানুষ যে গুণগত পরিবর্তন চেয়েছিল, তা নিশ্চিত করার জন্য এটি যথেষ্ট নয়।'
সারোয়ার তুষারের ভাষ্য, 'সবচেয়ে বেশি প্রত্যাশিত ছিল রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। কিন্তু সরকার সেই জায়গাগুলোতেই পিছিয়ে গেছে। মানবাধিকার পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। সরকারের সমালোচনা করায় বিভিন্ন জায়গায় গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটছে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও ভুল নীতির কারণে দেশ ব্যাকফুটে চলে গেছে।'
জুলাই সনদ ও গণভোট প্রসঙ্গে এনসিপির এই নেতা বলেছেন, 'বিএনপি বাস্তবে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করবে না, তারা শুধু লোকদেখানো অবস্থান নিচ্ছে। অথচ গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করাটাই ছিল তাদের সামনে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। সেটি না করে তারা ভিন্ন পথে হাঁটছে। এটি জনগণের সঙ্গে বড় ধরনের প্রতারণা।'
'সরকার শুরু থেকেই এমন অবস্থান নিয়েছে, যার কারণে বিরোধী দলগুলো বাধ্য হয়ে সমালোচনার পথে যেতে হয়েছে। বিরোধী দলগুলো প্রথম দিন থেকেই সরকারের বিরোধিতা করতে চায়নি। কিন্তু জুলাই সনদ ও গণভোটের প্রশ্নে সরকারের অবস্থান মূলত গণরায়কে অস্বীকার করার শামিল।' আরও বললেন তিনি।
সরকারের ১০০ দিনে উল্লেখ করার মতো ইতিবাচক খুব বেশি কিছু নেই বলে মনে করছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব ও ঢাকা মহানগর উত্তর সভাপতি অধ্যক্ষ হাফেজ মাওলানা শেখ ফজলে বারী মাসউদ। তাঁর মতে, বরং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও মানুষের নিরাপত্তাহীনতাই বেশি চোখে পড়ছে।
তিনি বললেন, 'রামিশা ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডসহ একের পর এক ঘটনায় বিচার না হওয়ায় মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি হচ্ছে। আগের পরিস্থিতির সঙ্গে খুব বেশি পার্থক্য মানুষ অনুভব করছে না। এতে আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে, সরকারও হয়তো পুরোনো ধারাতেই হাঁটছে।'
অনেক প্রত্যাশার পর এই সরকার এসেছে। যদি এই সরকারও ব্যর্থ হয়, তাহলে সেটা দেশের জন্য অত্যন্ত দুঃখজনক হবে। কিছু ইতিবাচক উদ্যোগের কথা শোনা গেলেও জনগণ এখনো তার বাস্তব সুফল পাচ্ছে না। দ্রব্যমূল্যও এখনো সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আসেনি।' আরও জানালেন তিনি।
জাগপার মুখপাত্র রাশেদ প্রধান আগামীর সময়কে বলেছেন, 'সরকারের ১০০ দিন পূর্ণ হওয়া মানে তাদের ‘হানিমুন পিরিয়ড’ শেষ। এই সময়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ব্যক্তিগত কিছু অর্জন থাকলেও সরকারের সামগ্রিক ব্যর্থতার তালিকা করতে গেলে দীর্ঘ সময় লাগবে।'
তার ভাষ্য, 'দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, লুটপাট ও ধর্ষণের মতো ঘটনাগুলো জনগণের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা-পরবর্তী গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে বিএনপি সরকারের কাছে মানুষের যে প্রত্যাশা ছিল, তা পূরণ হয়নি।'
'লোকদেখানো কার্ডের বোঝার আড়ালে ভবিষ্যতে নীরব দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। এ নিয়ে দেশ, জাতি ও সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক কাজ করছে।' বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, যে প্রত্যাশা ও আবেগের মধ্য দিয়ে সরকার ক্ষমতায় এসেছে, তার তুলনায় জনগণের প্রত্যাশার চাপও অনেক বেশি। ফলে প্রথম ১০০ দিনের মূল্যায়নে সমালোচনার মাত্রা স্বাভাবিকভাবেই বেশি দেখা যাচ্ছে। এখন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে প্রতিশ্রুত সংস্কার ও জনআকাঙ্ক্ষার আলোকে বাস্তব অগ্রগতি দৃশ্যমান করা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. আকরাম হোসেন বলেছেন, 'সরকার যে রাজনৈতিক বাস্তবতা ও জনগণের প্রত্যাশার মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে, সেখানে সাধারণ মানুষ খুব দ্রুত দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখতে চেয়েছিল। কিন্তু ১০০ দিনের মূল্যায়নে দেখা যাচ্ছে, প্রতিশ্রুত অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এখনো সুস্পষ্ট অগ্রগতি নেই। বিশেষ করে রাষ্ট্র সংস্কার, বাজার নিয়ন্ত্রণ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। তবে সরকার চাইলে এখনো কার্যকর উদ্যোগের মাধ্যমে পরিস্থিতির উন্নতি করার সুযোগ রয়েছে।'






