সরকারের অংশ হতে চাইবেন শরিক নেতারা
- মান ভাঙাতে তারেক রহমানের ডিনার আজ

বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি: সংগৃহীত
রাজপথের দীর্ঘ আন্দোলনের পর সরকার গঠনের পাঁচ মাস কেটে গেছে। এ সময় জুড়ে বিএনপির যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলোর মধ্যে ছিল অপেক্ষা, প্রত্যাশা, আবার কোথাও কোথাও জমেছে ক্ষোভও। জাতীয় সরকারে নিজেদের প্রতিফলন দেখতে চেয়েও অনেকেই মনে করছেন, তাদের অবদান যথাযথভাবে মূল্যায়িত হয়নি। এমন বাস্তবতায় অবশেষে শরিকদের সঙ্গে একই টেবিলে বসতে যাচ্ছেন বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আজ সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় তাদের সম্মানে বিশেষ নৈশভোজের আয়োজন করেছেন সরকারপ্রধান। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু সৌজন্য সাক্ষাৎ নয়; বরং মিত্রদের অভিমান দূর করে জোটের ভেতরের আস্থা পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক উদ্যোগ।
ডিনারে অংশ নিতে পারেন এমন কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নৈশভোজ শেষে অনুষ্ঠিত বৈঠকে শরিক দলগুলোর নেতারা নিজেদের ‘যথাযথ’ মূল্যায়নের দাবি তুলবেন। তাদের বক্তব্য হবে— যেভাবে রাজপথের আন্দোলনে তারা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ভূমিকা রেখেছেন, সেভাবেই সরকার পরিচালনায়ও তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলায় ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী জাতীয় ঐক্য’ ধরে রাখার প্রয়োজনীয়তা এবং বিএনপির ঘোষিত ‘রেইনবো নেশন’— ‘জাতীয় সরকার’ গঠনের অঙ্গীকারের বিষয়টিও সামনে আনবেন তারা। একই সঙ্গে শরিকদের প্রতি সরকারের বর্তমান মনোভাব বোঝার চেষ্টা করবেন, যাতে সেই অনুযায়ী নিজেদের পরবর্তী রাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণ করা যায়। তবে পাঁচ মাস পর হলেও প্রধানমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন অনেক শরিক নেতা।
জানা গেছে, যুগপৎ আন্দোলনের শরিক তিনটি দল নির্বাচনের আগে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যে যোগ দেওয়ায় তারা এই ডিনারের আমন্ত্রণ পায়নি। দলগুলো হলো— অলি আহমদের নেতৃত্বাধীন এলডিপি, মোস্তাফিজুর রহমান ইরানের বাংলাদেশ লেবার পার্টি এবং তাসমিয়া প্রধান ও রাশেদ প্রধানের জাগপা। বাকি দলগুলোর প্রতিটি থেকে পাঁচজন করে প্রতিনিধি ডিনারে অংশ নেবেন। এ ছাড়া নির্বাচনের আগে বিএনপিতে যোগ দিয়ে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করা নেতারাও আমন্ত্রণ পেয়েছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাতটি দলের সাতজন নেতা বিএনপির প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন।
তবে আমন্ত্রণ পেলেও বৈঠকে অংশ নিচ্ছে না আ স ম আব্দুর রবের জেএসডি। দলটি এরই মধ্যে বিএনপিকে চিঠি দিয়ে তাদের সিদ্ধান্ত জানিয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, রাষ্ট্র সংস্কার, জুলাই সনদ ও গণভোটের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার আগে বিএনপির সঙ্গে পৃথক রাজনৈতিক বৈঠকে অংশ নিলে দলের বর্তমান অবস্থান ও জনগণের কাছে দেওয়া অঙ্গীকার নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হতে পারে।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি তাদের ১১টি শরিক দলকে ১৬টি আসন ছেড়ে দিয়েছিল। নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর শরিকদের মধ্য থেকে দুই নেতাকে প্রতিমন্ত্রী করে ‘জাতীয় সরকার’ গঠন করা হলেও অধিকাংশ শরিক দল এটিকে প্রকৃত অর্থে জাতীয় সরকার হিসেবে দেখছে না। তাদের প্রত্যাশা, ওই দুই প্রতিমন্ত্রীর বাইরে আরও কয়েকজনকে টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী হিসেবে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে। পাশাপাশি উচ্চকক্ষ, বিভিন্ন করপোরেশন এবং সরকারি সংস্থায়ও শরিকদের যোগ্যতা অনুযায়ী দায়িত্ব দেওয়ার দাবি রয়েছে তাদের।
জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের মুখপাত্র ও বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক পার্টির চেয়ারম্যান এস এম শাহাদাত বলেছেন, বিএনপি বারবার আশ্বস্ত করেছিল যে, শরিকদের নিয়েই নির্বাচন ও সরকার গঠন করা হবে। মনোনয়ন দেওয়ার সময়ও বলা হয়েছিল, সবাইকে প্রার্থী করা সম্ভব না হলেও জাতীয় সরকারে তাদের স্থান হবে। তিনি বলেছেন, ‘এত দিন পরে হলেও তাদের বোধোদয় হয়েছে। আমাদের প্রত্যাশা, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দ্রুত শরিকদের যথাযথ মূল্যায়ন করবেন।’
১২-দলীয় জোটের প্রধান ও জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার বলেছেন, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের সব শক্তিকে একত্র করে তাদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। সামনে দেশের জন্য আরও নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তাই বিএনপির সপক্ষের এবং আধিপত্যবাদবিরোধী দেশপ্রেমিক শক্তির ঐক্য অটুট রাখা জরুরি।
অন্যদিকে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেছেন, বৈঠকে তিনি সরকারপ্রধানকে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে গত পাঁচ মাসে নেওয়া ইতিবাচক পদক্ষেপের জন্য ধন্যবাদ জানাবেন। তবে একই সঙ্গে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সরকারের দুর্বলতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, হত্যা, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব এবং সুশাসনের সংকটের বিষয়গুলোও প্রধানমন্ত্রীর নজরে আনবেন।
তিনি আরও বলেছেন, ‘এই বৈঠকের মাধ্যমে যুগপৎ শরিকদের সঙ্গে সম্পর্কের যাত্রা এখানেই শেষ হচ্ছে, নাকি এর ভবিষ্যৎ আছে— সেটি বোঝার চেষ্টা করব। যদি ভবিষ্যৎ থাকে, তাহলে তার ধরন কী হবে, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। বিএনপি পাঁচ মাস ধরে একলা চলার যে কৌশল নিয়েছে, সেটি অব্যাহত রাখবে, নাকি ‘রেইনবো নেশন’, ‘রেইনবো গভর্নমেন্ট’— সবাইকে নিয়ে সরকার পরিচালনার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সেই পথেই এগোবে— বৈঠক থেকে তারই স্পষ্ট বার্তা পাওয়ার আশা করছি।’




