৭ নভেম্বর : ইতিহাসের তাৎপর্য এবং জাতীয় সংহতির শিক্ষা

বীথিকা বিনতে হোসাইন
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর একটি তাৎপর্যপূর্ণ, ঘটনাবহুল এবং বহুমাত্রিক দিন। এই দিনকে ঘিরে রয়েছে অভ্যুত্থান, পাল্টা অভ্যুত্থান, সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন, রাজনৈতিক ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস এবং সৈনিক-জনতার সম্পৃক্ততার ইতিহাস। বর্তমান সরকার দিনটিকে ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে পালন করছে।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাস, প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ক্ষমতার উত্থান এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রের বিকাশের আলোচনায় ৭ নভেম্বরের গুরুত্ব বিশেষভাবে বিবেচিত হয়। দীর্ঘ ১৬ বছর পর ২০২৬ সালে বিএনপি সরকার দিবসটিকে আবার রাষ্ট্রীয়ভাবে ফিরিয়ে এনেছে। ৭ নভেম্বর সরকারি ছুটি ঘোষণা এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দিবসটি পালনের সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাস ও আদর্শিক অবস্থানের সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে একটি জাতীয় দিবসের গুরুত্ব কেবল কোনো রাজনৈতিক দলের ঐতিহাসিক স্মৃতি কিংবা দলীয় আবেগের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। বরং সেই ইতিহাস থেকে বর্তমান রাষ্ট্র ও সরকারের জন্য কী শিক্ষা রয়েছে, তা অনুধাবন করাই দিবসটি পালনের প্রধান উদ্দেশ্য হওয়া উচিত।
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরকে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে আখ্যায়িত করার পেছনে রয়েছে সৈনিক ও সাধারণ মানুষের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা। রাজনৈতিক ব্যাখ্যায় বলা যায়, সেদিন দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষার প্রশ্নে সৈনিক-জনতার মধ্যে একটি অভূতপূর্ব সংহতি তৈরি হয়েছিল। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও রাষ্ট্রীয় অনিশ্চয়তার মধ্যে জনগণের অংশগ্রহণে ক্ষমতার নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছিল। দিবসটির প্রথম তাৎপর্য হচ্ছে জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন। স্বাধীনতার মাত্র চার বছরের মাথায় বাংলাদেশ এমন এক রাজনৈতিক সংকটে পড়ে, যখন রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা, সামরিক বাহিনীর শৃঙ্খলা এবং রাজনৈতিক কর্তৃত্ব সবকিছুই প্রশ্নের মুখে ছিল। ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহ সেই সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। এ কারণে দিনটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয়।
দ্বিতীয় তাৎপর্য হলো জনগণের অংশগ্রহণ ও রাজনৈতিক সংহতির ধারণা। রাষ্ট্র কেবল সরকার, প্রশাসন কিংবা সামরিক প্রতিষ্ঠানের সমষ্টি নয়; রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার জনগণ। জনগণের আস্থা, অংশগ্রহণ ও ঐক্য ছাড়া কোনো রাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল হতে পারে না। ৭ নভেম্বরের রাজনৈতিক তাৎপর্য বিশ্লেষণে এই বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে।
তৃতীয়ত, দিনটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বহুদলীয় রাজনীতির বিকাশের সঙ্গে সম্পর্কিত। স্বাধীনতার ঘোষক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাসনামলে বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন, সংবাদপত্রের ওপর নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার উদ্যোগ এবং ১৯৭৮ সালে বিএনপি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশের রাজনীতিতে নতুন একটি ধারার সূচনা হয়। তবে এসব পরিবর্তনের মূল্যায়নে তৎকালীন সামরিক শাসনের বাস্তবতা, রাজনৈতিক স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা এবং পরবর্তী ক্ষমতার কাঠামোকেও বিবেচনায় রাখতে হবে। ইতিহাসের কোনো একটি ইতিবাচক অর্জনকে সামনে রেখে তার অন্য দিকগুলো আড়াল করা যুক্তিসংগত নয়।
চতুর্থত, ৭ নভেম্বরের তাৎপর্য জাতীয় ঐক্যের ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের প্রশ্নে জনগণের ঐক্য অপরিহার্য। একটি বিভক্ত সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য জাতীয় স্বার্থকে দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান দিতে হয়। এই শিক্ষা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর ১৭ ফেব্রুয়ারি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করে। দীর্ঘ সময় পর রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে আসা দলটির জন্য ৭ নভেম্বর একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও আদর্শিক উপলক্ষ। কারণ বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্থানের সঙ্গে এই দিনের ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। একই সঙ্গে এটি দলটির ঐতিহাসিক পরিচয় ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের সঙ্গে বর্তমান সরকারের সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠার একটি উদ্যোগ। তবে বিএনপি সরকারের জন্য দিবসটির গুরুত্ব কেবল রাজনৈতিক ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এই দিবসের অন্তর্নিহিত শিক্ষা বর্তমান সরকারের রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি ও কর্মসূচিতে প্রতিফলিত হওয়া প্রয়োজন।
তাই, গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হবে বিএনপি সরকারের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। ৭ নভেম্বরের রাজনৈতিক ইতিহাসে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত। বর্তমান সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা : সংসদকে কার্যকর করা, বিরোধী দলের মতপ্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বজায় রাখা এবং নির্বাচন কমিশনসহ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখা। যদিও বর্তমান সরকার এসকল বিষয়ে খুবই আন্তরিক।
নির্বাচনে বিজয় অর্জন গণতন্ত্রের সূচনা; গণতন্ত্রের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে ক্ষমতার জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর। এছাড়া, জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা বিএনপি সরকারের জন্য একটি বড় পরীক্ষা। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে। ২০২৬ সালের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে একটি নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠিত হলেও রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভাজন পুরোপুরি দূর হয়নি। বিরোধী দল, ভিন্নমতাবলম্বী নাগরিক, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশাকে গুরুত্ব দিতে হবে। ৭ নভেম্বরের সংহতির চেতনাকে ধারণ করতে হলে সরকারকে দল-মত-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিকের সরকার হিসেবে কাজ করতে হবে।
এর পাশাপাশি, আইনের শাসন ও মানবাধিকারের নিশ্চয়তা দিতে হবে। অতীতের রাজনৈতিক নিপীড়ন, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও ক্ষমতার অপব্যবহারের পুনরাবৃত্তি রোধ করা এই সরকারের নৈতিক দায়িত্ব। রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কাউকে হয়রানি করা যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি অপরাধের অভিযোগ থাকলে যথাযথ তদন্ত ও স্বচ্ছ বিচার নিশ্চিত করাও জরুরি। প্রতিশোধের রাজনীতি নয়, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাই হওয়া উচিত নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভিত্তি। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে সরকার সেই লক্ষ্যে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে।
একইভাবে, অর্থনৈতিক মুক্তি ও সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক স্বাধীনতা তখনই অর্থবহ হয়, যখন মানুষ অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, ন্যায্য আয় এবং মৌলিক সেবা পায়। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দুর্নীতি প্রতিরোধ, ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকারে রয়েছে। জাতীয় সংহতির ভিত্তি শুধু রাজনৈতিক স্লোগান নয়; এর ভিত্তি হচ্ছে মানুষের ন্যায্য অধিকার ও অর্থনৈতিক সুযোগ নিশ্চিত করা।
একটি জাতীয় দিবস পালনের ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিকতা, আলোচনা সভা, স্মৃতিচারণ, শোভাযাত্রা ও সরকারি ছুটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও এগুলোই শেষ কথা নয়। দিবসটির ঐতিহাসিক আদর্শ রাষ্ট্রীয় নীতি ও জনকল্যাণমূলক কর্মসূচিতে প্রতিফলিত হওয়াই সবচেয়ে জরুরি। এখানে বিএনপির জন্য একটি বিশেষ রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকার পর দলটির নেতা-কর্মীদের মধ্যে যে প্রত্যাশা ও রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। সরকারে থাকা মানে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও সুযোগ-সুবিধার ওপর দলীয় অধিকার প্রতিষ্ঠা নয়; বরং জনগণের কাছে আরও বেশি দায়বদ্ধ হওয়া। স্থানীয় পর্যায়ে চাঁদাবাজি, দখলদারত্ব, দুর্নীতি কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগের বিরুদ্ধে সরকারকে দৃশ্যমান ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায় জাতীয় সংহতি ও গণতন্ত্রের আদর্শ বাস্তবায়নের দাবি জনমনে বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবে। তবে আশার কথা যে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান সরকার সব ধরনের অন্যায়ের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে ৭ নভেম্বর একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই দিন আমাদের রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামরিক-বেসামরিক সম্পর্ক, জাতীয় সংহতি, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব এবং গণতন্ত্রের জটিল বাস্তবতা সম্পর্কে ভাবতে শেখায়। ইতিহাসের সব মতপার্থক্য সত্ত্বেও একটি বিষয়ে দ্বিমতের অবকাশ নেই যে, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা, জাতীয় ঐক্য, আইনের শাসন ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার ওপর। বিএনপি সরকারের জন্য ৭ নভেম্বর তাই একই সঙ্গে ঐতিহাসিক গৌরব, রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এবং রাষ্ট্র পরিচালনার কঠিন দায়িত্বের স্মারক। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নাম ও রাজনৈতিক ঐতিহ্য ধারণ করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় কেবল তার স্মৃতিচারণ নয়; বরং একটি স্বাধীন, সার্বভৌম, বহুদলীয়, গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বাস্তব সাফল্য অর্জন। ৭ নভেম্বরের জাতীয় বিপ্লব ও সংহতির চেতনাও তখনই অর্থবহ হবে, যখন দেশের প্রতিটি নাগরিক রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে রাষ্ট্রের সমান অধিকারী হিসেবে মর্যাদা পাবেন।
সর্বোপরি, বিএনপি সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় সুযোগ হলো ৭ নভেম্বরকে দলীয় ইতিহাসের স্মারক থেকে জাতীয় ঐক্য ও গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের প্রেরণায় রূপান্তর করা। ইতিহাসের প্রতি যথার্থ সম্মান প্রদর্শনের এটাই হবে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় সাফল্য।
লেখক : সংসদ সদস্য, সংরক্ষিত মহিলা আসন-২৪



