কেন প্রতি ঈদে ফিরে আসে শোকের মিছিল?

ছবি: এআই
ঈদ মানেই ঘরে ফেরার আনন্দ। শহরের ব্যস্ততা পেছনে ফেলে গ্রামের বাড়ির পথে ছুটে চলে মানুষ। যেন মনের মধ্যে এক অদম্য উন্মাদনা। পথ যতই দীর্ঘ হোক, চোখে শুধু স্বজনদের মুখ দেখার স্বপ্ন। কিন্তু এই আনন্দের দিনগুলোতে প্রতিবারই যেন এক বিষাদগ্রস্ত আবহ যোগ হয়। বাংলাদেশের মহাসড়কগুলোতে ঈদ মানেই দুর্ঘটনার কালো অধ্যায়, যেন যন্ত্রণার এক মর্মন্তুদ রোজনামচা।
গতকাল রাতে কুমিল্লার রেলক্রসিংয়ে সেই হৃদয়বিদারক দৃশ্য। বাসের সঙ্গে ট্রেনের সংঘর্ষে থেমে গেছে অন্তত ১২ জনের জীবনের সব স্বপ্ন। আহত আরও ১০ জন। হবিগঞ্জের মাধবপুরে পিকআপ ভ্যান আর বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে চারজন হারিয়েছেন সবকিছু। ফেনীর রামপুরে ত্রিমুখী সংঘর্ষে ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় তিনজনের। এসব খবরে এবারের ঈদটাও যেন মিশে গেছে শোকের মিছিলে। কিন্তু কেন? কেন প্রতিবার ঈদ এলেই প্রাণহানির মিছিল বেড়ে যায়?
গবেষকরা বারবার বলছেন, চালকের বেপরোয়া গতি। ঈদের সময় শহর ছেড়ে অনেকে গ্রামে চলে যান। রাস্তা ফাঁকা পেয়ে যেন দায়িত্বজ্ঞান উড়ে যায়। ডান পায়ের ওপর ত্বরিত চাপটাই তখন ডেকে আনে বিপর্যয়। আবার অনেক সময় দেখা যায়, মূল চালক ছুটিতে, অদক্ষ সহকারী স্টিয়ারিংয়ে। ফিটনেসহীন যান, যান্ত্রিক ত্রুটি এসব তো আছেই। কিন্তু তার চেয়েও বড় ব্যাপার হলো, চালকের ক্লান্তি আর অমনোযোগিতা। ঘুমের ঘোরে কিংবা একাগ্রতা হারিয়ে ফেলার ফলাফল কত ভয়াবহ হতে পারে, তার উদাহরণ আমাদের সামনেই।
প্রশ্ন হলো, এসব দুর্ঘটনার জন্য কি কাউকে দায়ী করা হয়? শাস্তি পায় কেউ? সড়কে প্রতিদিন প্রাণ ঝরে যাচ্ছে, কিন্তু বেশিরভাগ দুর্ঘটনাতেই মামলাই হয় না। যদি মামলাও হয়, তার বিচার শেষ পর্যন্ত হয় না। অনেকটা নিয়তির মতোই লেগে থাকে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিচারহীনতার যে সংস্কৃতি এ দেশে পাকাপোক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তা সবচেয়ে বেশি পরিবহন খাতে। এই দায়মুক্তির বেড়াজালই দুর্ঘটনাকে মহামারির মতো অপ্রতিরোধ্য করে তুলেছে।
এই বাস্তবতা আমাদের প্রত্যেককেই ভাবায়। শুধু প্রশিক্ষণ আর জরিমানার কড়াকড়ি দিয়েই কি এই দুর্ঘটনা ঠেকানো সম্ভব? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চালকদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ প্রয়োজন, দ্রুতগতির জন্য জরিমানা বাড়াতে হবে, মামলার দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু এর পাশাপাশি আরও গভীরে যেতে হবে। ঈদে প্রত্যেকের মনেই এক অস্থিরতা কাজ করে। বাড়ি ফেরার সেই তাড়াহুড়ো, সময়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতা- এ যেন এক মানসিক স্প্রিন্ট। এই তাড়াহুড়োই কি একটু থামানো যায় না?
আরও বড় কথা, বাসমালিকদেরও ভূমিকা আছে। তারা বেশি আয়ের আশায় চালকদের অতিরিক্ত ট্রিপ দিতে প্ররোচিত করেন। ক্লান্ত চালক তখন মেশিন নিয়ে সড়কে নামেন। একটু বোঝাপড়া, একটু মানবিকতা- মালিকরা যদি চালককে চাপমুক্ত রাখতে পারেন, তাহলে দুর্ঘটনার শঙ্কা কমে যায়। চালক যেন শান্তিতে গাড়ি চালাতে পারেন, সে পরিবেশ তৈরি করতে হয় সবাইকে।
ঈদের প্রকৃত আনন্দ থাকে ঘরে ফেরার পথে নয়, ফিরে গিয়ে স্বজনদের সঙ্গে কাটানো সময়টাতে। আমরা কি পারি না এবার থেকে পথকে নিরাপদ করে তোলার অঙ্গীকার নিতে? একজন চালকের সামান্য সচেতনতা, বাসমালিকের একটু দায়িত্ববোধ, আর আইনের কঠোর প্রয়োগ- এই তিনের মিলনেই তৈরি হতে পারে নিরাপদ সড়কের স্বপ্ন। নইলে ঈদের প্রতিটি আনন্দমুখর দিনেই শোকের সেই মিছিল ফিরে আসবেই, আর প্রতিবারই আমাদের অপরাধবোধের দেয়ালে যুক্ত হবে নতুন এক প্রিয়জনের নাম।

