তিন পর্বের সাক্ষাৎকারের ১ম পর্ব
শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের সঙ্গে এক ‘বিকেল সন্ধ্যা রাত’
- সুর কখনো আমাকে ছাড়েনি; আমার পাপেট তো সুর, কথা, গান, অভিনয়, কবিতা— সব কিছুকেই ধরে রেখেছে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বাংলাদেশের চিত্রশিল্প, পাপেট্রি ও টেলিভিশন-নাট্যজগতের উজ্জ্বল নাম মুস্তাফা মনোয়ার। ১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর যশোর জেলার মাগুরা মহকুমার শ্রীপুর থানার নাকোল গ্রামে মাতুলালয়ে তার জন্ম। পিতা কবি গোলাম মোস্তফা, মাতা জমিলা খাতুন। ছয় ভাই-বোনের মধ্যে তিনি সবার ছোট। ডাকনাম মন্টু। পৈত্রিক নিবাস ঝিনাইদহ জেলার শৈলকূপা উপজেলার মনোহরপুর গ্রামে। পাঁচ বছর বয়সে মাকে হারান। গ্রামের প্রকৃতি, পিতার ফটোগ্রাফি ও সঙ্গীতচর্চা, গ্রামবাংলার পুতুলনাচ— এই সবই তার শিল্পী মনের ভিত রচনা করে।
১৯৫২ সালে নারায়ণগঞ্জ গভর্নমেন্ট স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র থাকাকালে ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় হন। প্রতিবাদী কার্টুন এঁকে দেয়ালে সাঁটানোর অপরাধে এক মাস কারাবাস করেন ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে। ম্যাট্রিকুলেশনের পর কলকাতায় স্কটিশ চার্চ কলেজে বিজ্ঞানে ভর্তি হলেও অঙ্কে দুর্বলতার কারণে সেখান থেকে সরে আসেন। সৈয়দ মুজতবা আলীর সহায়তায় ভর্তি হন কলকাতা চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে। সেখানে রমেন চক্রবর্তীর তত্ত্বাবধানে শিল্পশিক্ষা নেন, পাশাপাশি উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতচর্চাও চালিয়ে যান। ‘হিজ মাস্টার ভয়েস’ প্রতিযোগিতায় যুগ্ম শ্রেষ্ঠ গায়ক নির্বাচিত হন এবং নির্মলেন্দু চৌধুরীর দলে তিন বছর গান করেন। ১৯৫৭ ও ১৯৫৮ সালে গ্রাফিক্স, তেলচিত্র ও জলরঙে তিনটি স্বর্ণপদক অর্জন করেন। সত্যজিৎ রায় তার ছবি দেখে বলেছিলেন, ‘মুস্তাফা মনোয়ারের আঁকা ছবি খুব অল্পতে কথা বলতে পারে।’ ১৯৫৯ সালে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করে তিনি কলেজ শেষ করেন।
১৯৬০ সালে জয়নুল আবেদিনের আহ্বানে ঢাকায় ফিরে চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। এ সময়েই পাপেট্রির প্রতি তার গভীর আগ্রহ জন্মায়। ১৯৬৪ সালে পাকিস্তান টেলিভিশনের ঢাকা কেন্দ্র চালু হলে সেখানে যোগ দেন। ষাটের দশকের শেষে ‘আজব দেশে’ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ‘বাঘা’ ও ‘মেনি’ চরিত্র দিয়ে পাকিস্তানি শাসনের ব্যঙ্গ শুরু করেন। ১৯৬০-৬১ সালে কলিম শরাফীর ডকুমেন্টারিতে প্রথম তার পাপেট চলচ্চিত্রে আসে। ১৯৬৫ সালে মেরী মনোয়ারের সঙ্গে বিয়ে হয়। পুত্র সাদাত, কন্যা নন্দিনী।
একাত্তরের মার্চে অসহযোগ আন্দোলনের সময় পিটিভি বাংলার অনুষ্ঠান ব্যবস্থাপক হিসেবে ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবসে পতাকা প্রদর্শন বন্ধ রাখেন—রাত ১২টা পেরিয়ে ২৪ মার্চ হওয়ার পর তবেই অনুষ্ঠান শেষ করেন। ওই মাসেই ‘সংগ্রাম সংগ্রাম সংগ্রাম’ গণসংগীত পরিচালনা করেন, যেখানে দশ কণ্ঠকে কয়েকশ কণ্ঠের মতো শোনানো হয়। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে শরণার্থী শিবিরে শিশুদের জন্য পাপেট শো করতে থাকেন। ‘পুতুলওয়ালা’ নামে পরিচিত হন। লিয়ার লেভিনের ক্যামেরায় ধারণকৃত সেই দৃশ্য পরে তারেক মাসুদের ‘মুক্তির গান’-এ জায়গা পায়। একই সময়ে স্বাধীন বাংলা বেতারে ট্রান্সমিশন ম্যানেজার ও প্রযোজকের দায়িত্ব পালন করেন।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে ‘নতুন কুঁড়ি’র রূপকার হন। ১৯৭৩ সালে ‘রক্তকরবী’ ও ‘মুখরা রমণী বশীকরণ’-এর টেলিভিশন রূপ দেন, যা গ্রানাডা টিভির ‘ওয়ার্ল্ড হিস্ট্রি অব টিভি ড্রামা’য় মনোনীত হয়। ‘মনের কথা’ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ‘পারুল’, ‘বাউল’, ‘ষাঁড়’-এর মতো চরিত্র সৃষ্টি করেন। পারুলকে দেখে ইউনিসেফ পরে ‘মীনা’ কার্টুনের ধারণা পায়। দ্বিতীয় সাফ গেমসের মাস্কট ‘মিশুক’ এবং কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের লাল সূর্যের প্রতিরূপ স্থাপনও তার কীর্তি। ১৯৮৯ সালে বিটিভির রজত জয়ন্তীতে এরশাদের নির্দেশ অমান্য করে ম্যুরালে তার গান বসাতে অস্বীকৃতি জানিয়ে প্রতিবাদের আরেক মাইলফলক স্থাপন করেন।
শিল্পকলা একাডেমী, জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউট, এফডিসিসহ বহু প্রতিষ্ঠানের প্রধান ছিলেন। মস্কো, সিউল, তাসখন্দসহ বহু আন্তর্জাতিক আসরে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। ১৯৫৭-৫৮-এর স্বর্ণপদক, ১৯৯০-এ টেনাশিনাস পদক, ২০০৪-এ একুশে পদকসহ অসংখ্য পুরস্কার পান। দীর্ঘ রোগভোগের পর ২০২৬ সালের ২৯ জুন, সকাল সাড়ে ৮টায় স্কয়ার হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বয়স হয়েছিল ৯১।
ঠিক এগারো বছর আগে, ২০১৬ সালের বর্ষায় ধানমন্ডির গ্যালারি চিত্রকে বসে ইন্ডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের পক্ষ থেকে আমি সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলাম। তখন শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার বা শিল্পাঙ্গনের সর্বজনশ্রদ্ধেয় মন্টু ভাইয়ের বয়স ৮০’রও বেশি। ক্লান্ত শরীর, কিন্তু পুতুলের মতোই চনমনে চোখ। সেদিন তিনি ভাল মুডে ছিলেন, আলাপ করেছিলেন প্রাণ খুলে। নিচে ধারণকৃত আলাপের শ্রুতিলিখন বিবৃত হলো। আগামীর সময়ের পাঠকদের জন্য রইল সাক্ষাৎকারটির তিন পর্বের প্রথম পর্ব।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: স্যার, ইন্ডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের পক্ষ থেকে আপনার কাছে আসতে পেরে আমি সত্যিই আপ্লুত। ছোটবেলায় ‘মনের কথা’ অনুষ্ঠানের ‘পারুল’-কে দেখে আমরা কে-ই-না মুগ্ধ হয়েছি। আপনার জন্ম ১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর, যশোরের শ্রীপুরে নানা বাড়িতে। পৈতৃক নিবাস ঝিনাইদহ জেলার শৈলকূপা উপজেলার মনোহরপুর গ্রামে। আপনার দাদা নানার গ্রামটিই কি আপনার শিল্পী-মনের প্রথম ক্যানভাস ছিল?
মুস্তাফা মনোয়ার : (মৃদু হেসে) কেমন করে বলবো শিমুল! মনোহরপুর গ্রাম তো আমার শেকড়। আমার নাড়ি পোঁতা ওখানে। আমাদের বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে গেছে কালী নদী। একপাশে একটা বড় বটগাছ। তিন দিক খোলা, শুধু ফসলের মাঠ। যতদূর চোখ যায় সবুজ ধানক্ষেত। যখন হাওয়া বইত, ধানের ক্ষেতে ঢেউ খেলত। পরে ‘এমন ধানের ওপর ঢেউ খেলে যায় বাতাস কাহার দেশে’ গানটা শুনে মনে হতো, এই ছবি তো আমারই দেখা। বড় পুকুর, বিলে বিলে হরিয়াল, পানকৌড়ি, বক দেখতাম— সেই বক নিয়েই তো পরে পাপেটে ‘ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দেরে’ করেছি। এ গ্রামের আকাশ-মাটি-জল-হাওয়াই আমার প্রথম রঙতুলিকে নির্দেশনা দিয়েছে।
শিমুল : আপনার বাবা তো স্বনামধন্য কবি গোলাম মোস্তফা। শুধু কবিতাই লিখতেন না, ভালো গানও গাইতেন শুনেছি। তার প্রভাব নিশ্চয়ই আপনার অনেক গভীরে ছিল?
মুস্তাফা মনোয়ার : বাবা যে শুধু কবিতা লিখতেন আর গান গাইতেন তা না, উনি ফটোগ্রাফিও করতেন। আমি স্কুলে থাকতে বাবার ক্যামেরা হাতে নিয়েই ফটোগ্রাফির নেশায় পড়ে যাই। কলকাতায় থাকাকালীন সময়ে গ্রামোফোন বাজাতাম, তখন আমার অক্ষরজ্ঞান হয়নি, কিন্তু পছন্দের গান রেকর্ড থেকে বের করে দিতে পারতাম। বাবা এটা দেখে এতটাই গর্বিত হয়েছিলেন যে কাজী নজরুল ইসলামকে ডেকে দেখিয়েছিলেন। বাবাই তো শিল্পের রসটা আমাকে শিখিয়েছেন। আর আমাদের ছয় ভাইবোনের মধ্যে আমি ছিলাম সবার ছোট। মেজ ভাই (মুস্তাফা আজিজ) ছবি আঁকতেন— তাঁকে দেখেই আমার হাতে তুলি ওঠে, যতটুকু মনে করতে পারি।
শিমুল : আপনার মা জমিলা খাতুন মারা যান যখন আপনার বয়স মাত্র পাঁচ। এরপর গ্রামের স্নেহ, আর গামছা নিয়ে পালিয়ে মাছ ধরতে যাওয়ার গল্প তো জানা আছে। কিন্তু ভাষা আন্দোলনের সময় আপনি নারায়ণগঞ্জ গভর্নমেন্ট স্কুলের ছাত্র। জেল খেটেছিলেন শুনেছি ছবি আঁকার জন্য। সেই অদম্য কিংবদন্তীপ্রায় সাহস কি বাবা-মায়ের কাছ থেকেই পেয়েছিলেন?
মুস্তাফা মনোয়ার : মা-বাবা তো ছিলেনই। তবে ১৯৫২ সালে আমি যখন নারায়ণগঞ্জ হাইস্কুলের ক্লাস নাইনের ছাত্র, ঢাকায় গোলাগুলির খবর শুনে বুকের ভেতর আসলেই আগুন জ্বলে উঠল। বাংলা ভাষা কেড়ে নিতে চায়— এটা সইবো কী করে? আমি কার্টুন আঁকা শুরু করলাম, বন্ধুদের নিয়ে নারায়ণগঞ্জের দেয়ালে দেয়ালে সাঁটিয়ে দিলাম। পাকিস্তানি সরকারের পুলিশ আমাকে আর আমার দুলাভাই লুৎফর রহমানকে ধরে ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে পাঠাল। মাসখানেক জেল খেটেছি। কিশোর বয়সে জেল— এখন ভাবলে নিজেই অবাক হই, কিন্তু সেটাই তো আমাকে শিখিয়েছে, শিল্প কখনো ভীরু হয় না, কাপুরুষ হয় না। জেল থেকে বেরিয়ে বরং আরও বেশি করে রং জড়িয়ে ধরেছি, ছবি আঁকায় মনোযোগী হয়েছি।
শিমুল : তখন তো দেশভাগের ক্ষতও টাটকা। ১৯৪৭ সালের কোনো স্মৃতি মনে পড়ে স্যার?
মুস্তাফা মনোয়ার : খুব মনে পড়ে। আমার বয়স তখন ১২। আমার প্রায় সবই মনে আছে। আমরা বরিশাল শহরে ছিলাম তখন, বাবা ওখানে চাকরি করতেন। দেখলাম হিন্দুরা হঠাৎ একে একে বাড়ি ছেড়ে পালাচ্ছে। যে পটুয়ারা আমার শিল্পের প্রথম শিক্ষক, তাঁরাও চলে গেল ওপারে। তখনই টের পেয়েছিলাম, রাজনীতি নামে যা আছে ওটা সংস্কৃতির গলা টিপে ধরে। তুমি বলতে পারো কাব্য করে, সেই ক্ষত নিয়েই পরে মুক্তিযুদ্ধে আমি জড়িয়ে পড়েছি, যুদ্ধ ত অস্ত্র হাতে করতে পারিনি, পুতুলনাট্য দেখাতে পুতুল হাতে শিবিরে শিবিরে ঘুরেছি।
শিমুল : ম্যাট্রিক পাস করে আপনি কলকাতায় গিয়ে স্কটিশ চার্চ কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হলেন। কিন্তু সেখানে মন টিকলো না। সৈয়দ মুজতবা আলী নাকি আপনার সেই বিড়ম্বনা থেকে উদ্ধার করেছিলেন? শুনেছি সত্যজিৎ রায়ও নাকি আপনার ছবি দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন।
মুস্তাফা মনোয়ার : (হেসে) বিজ্ঞানে আমি একেবারে গোবেচারা। পড়াশোনায় মনোযোগ কোনদিনই ছিল না। অঙ্কে তো আমি খুবই কাঁচা ছিলাম। পরীক্ষায় অঙ্কে ১০০ তে ৪ পাবার পর স্যার যখন বললেন, ‘মুস্তাফা, তুমি চার পেয়েছ’, আমি হাসছি দেখে উনি তো রাগে অস্থির! কিন্তু কী করব, অঙ্ক মাথায় ঢুকত না। ভাগ্যিস সৈয়দ মুজতবা আলী আমাদের পাশের ফ্ল্যাটে থাকতেন। উনি মাঝে মাঝে আমার ছবি দেখতেন আর খুব প্রশংসা করতেন। একদিন বললেন, ‘এত ভালো গুণ, সায়েন্স পড়ে নষ্ট হবে।’ তারপর আমার বড় ভাবিকে নিয়ে আমাকে কলকাতা আর্ট কলেজে রমেন চক্রবর্তী স্যারের কাছে ভর্তি করিয়ে দিলেন। কলেজে পড়ার সময়ই কলকাতায় শিল্পী হিসেবে আমার একটু পরিচিতি হতে থাকে। তখন সত্যজিৎ রায় বলেছিলেন, ‘মুস্তাফা মনোয়ারের আঁকা ছবি খুব অল্পতে কথা বলতে পারে।’ এই কথাটা শুনে আমি ভীষণ উৎসাহ পেয়েছিলাম। সৈয়দ মুজতবা আলী প্রতিভা চিনেছিলেন, আর সত্যজিতের ওই মন্তব্যটা তো জীবনের পাথেয় হয়ে আছে।
শিমুল : কলকাতার সেই দিনগুলোতে আপনি উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতও শিখছিলেন শুনেছি ওস্তাদ ফাইয়াজ খাঁর শীষ্য সন্তোষ রায়ের কাছে, এমনকি ‘হিজ মাস্টার ভয়েস’ প্রতিযোগিতায় বশীর আহমেদ আর সুবীর সেনের সঙ্গে যুগ্মভাবে সেরা গায়ক নির্বাচিত হয়েছিলেন। শিল্পী নির্মলেন্দু চৌধুরীর দলে তিন বছর ছিলেন। তাহলে কণ্ঠশিল্পী না হয়ে চিত্রশিল্পী হলেন কেন?
মুস্তাফা মনোয়ার : গান আমার আত্মার ভেতর ছিল। কলকাতায় নাটকের দলের সঙ্গে কাজও করেছি। ওস্তাদ সন্তোষ রায়ের কাছে গান শিখতে শুরু করেছিলাম, নির্মলেন্দু চৌধুরীর দলে বছর তিনেকের মতো ছিলাম। পরে মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতায় ওয়াহিদুল হক ও সন্জীদা খাতুনের উদ্যোগে যে সাংস্কৃতিক দল গড়ে উঠেছিল, তাতে যোগ দিয়ে দেশাত্মবোধক গান গেয়েছি কিছু। কিন্তু পাপেট্রি আর চিত্রকলা আমাকে এমনভাবে টানল যে গান গাওয়ার সময় পেলাম না। তবে সুর কখনো আমাকে ছাড়েনি; আমার পাপেট তো সুর, কথা, গান, অভিনয়, কবিতা— সব কিছুকেই ধরে রেখেছে। ১৯৫৯ সালে কিন্তু কলকাতা চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয় থেকে ফাইন আর্টসে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে আমি বেরোলাম। তার পরের বছর আবেদিন স্যারের কথায় (শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন)সাড়া দিয়ে ঢাকায় চলে আসি পূর্ব পাকিস্তান চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতে।
শিমুল : কিন্তু আপনি তো নিজেকে কেবল চারুকলার গণ্ডিতে, চারুশিল্পী হিসেবেই আটকে রাখেননি। ১৯৬৫ সালে ডিআইটি ভবনে পাকিস্তান টেলিভিশনের ঢাকা কেন্দ্র চালু হওয়ার পর চারুকলার চাকরি ছেড়ে সেখানে যোগ দিলেন। এই সিদ্ধান্তটা কেন নিলেন?
মুস্তাফা মনোয়ার : দেখো শিমুল, আমার আগ্রহের জায়গা ছিল টেলিভিশন। চারুকলা ছেড়ে পিটিভিতে যোগ দেওয়ার কারণ ছিল ওই বৈরী সময়ে বাংলার সংস্কৃতিকে সামনে তুলে ধরা। টেলিভিশন ছিল নতুন মাধ্যম, সেখানে গিয়ে কিছু করার স্বপ্ন ছিল। যোগ দিয়েই সিনিয়র কস্টিউম ডিজাইনার হিসেবে কাজ শুরু করি, পরে স্টেশন প্রডিউসার, তারপর ডিজিএম, জিএম— বহু দায়িত্ব পালন করেছি। শিল্পকলা একাডেমীর মহাপরিচালক, জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক, এফডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক— এসবও করেছি। কিন্তু টেলিভিশনই ছিল আমার মূল আঙিনা। সবজায়গায় হয়তো সফল হইনি, কিন্তু আমি চেষ্টাটুকু করেছি।
(চলবে, প্রথম পর্ব সমাপ্ত, দ্বিতীয় পর্ব আসছে)







