দ্বিতীয়সারির নেতৃত্ব প্রস্তুত ছিল বলেই আন্দোলন থামেনি

জাতীয় ছাত্রশক্তির সভাপতি জাহিদ আহসান।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রস্তুতি, বিকল্প নেতৃত্ব গড়ে তোলা, সৃজনশীল কর্মসূচির কৌশল, নারী ও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ এবং আন্দোলন-পরবর্তী প্রত্যাশা ও বাস্তবতাসহ নানা বিষয় নিয়ে আগামীর সময়ের সঙ্গে কথা বলেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ছাত্রসংগঠন জাতীয় ছাত্রশক্তির সভাপতি জাহিদ আহসান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আমজাদ হোসেন হৃদয়।
আগামীর সময় : রাজপথের সংগ্রামে যুক্ত হওয়ার সবচেয়ে বড় প্রেরণা কী ছিল?
জাহিদ আহসান : ছোটবেলা থেকেই বিরোধী রাজনৈতিক মতের মানুষের ওপর এবং তাদের পরিবারের ওপর নির্যাতন দেখেছি। এসব ঘটনা অন্যায়ের বিরুদ্ধে, বিশেষত আওয়ামী রেজিমের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে শিখিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে গেস্টরুম সংস্কৃতির নির্যাতনের মুখোমুখি হই। একজন সিনিয়র ঠিক করে দেবে আমি হলে থাকতে পারব কি না, আমার মাকে তুলে গালি দেবেন, স্ট্যাম্প নিয়ে মারতে আসবেন, টুপি-দাড়ি দেখলে শিবির বলবেন—এটা মেনে নিতে পারিনি। তবে সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্ট ছিল আবরার ফাহাদের হত্যাকাণ্ড। ওই ঘটনার পরই সিদ্ধান্ত নিই, শুধু আন্দোলন নয়, সংগঠিত রাজনৈতিক লড়াই করব এবং শেখ হাসিনার পতন না হওয়া পর্যন্ত থামব না।
আগামীর সময় : ইন্টারনেট বন্ধ ও সমন্বয়কদের গুমের পরও আন্দোলন থামেনি কেন
জাহিদ আহসান : জাহিদ আহসান: সবচেয়ে বড় কারণ ছিল দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের ফলে দ্বিতীয় সারির নেতৃত্ব তৈরি হয়েছিল। প্রথম সারির সমন্বয়কদের কেউ গ্রেপ্তার বা গুম হলে কারা দায়িত্ব নেবে, সেটাও আগে থেকেই ঠিক করা ছিল।যখন নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদসহ প্রথম সারির নেতাদের তুলে নেওয়া হলো, তখন দ্বিতীয় সারির নেতৃত্ব সামনে আসে। মাসুদ, রিফাত, কাদেরসহ যারা দায়িত্ব নিয়েছিল, তারা হঠাৎ করে আসেনি। তারা আগে থেকেই ছাত্ররাজনীতি করেছে, আন্দোলনের অভিজ্ঞতা ছিল। তারা জানত কীভাবে একটি আন্দোলন চালিয়ে নিতে হয়, কীভাবে জনগণকে বার্তা দিতে হয়। এই প্রস্তুতির কারণেই নেতৃত্বে কোনো শূন্যতা তৈরি হয়নি।
সবসময় বলি, এটি শুধু ছাত্রদের আন্দোলন নয়; এটি ছাত্রদের নেতৃত্বে গণঅভ্যুত্থান। নেতৃত্ব ছাত্ররা দিয়েছে, কিন্তু এতে বাংলাদেশের প্রায় সব শ্রেণিপেশার মানুষ অংশ নিয়েছেন। শ্রমিক, শিক্ষক, অভিভাবক, সাংস্কৃতিককর্মী—এমনকি পথশিশুরাও এই আন্দোলনের অংশ ছিল
একই সঙ্গে ছাত্রশিবির, ছাত্রদলসহ অন্যান্য সংগঠনের কর্মীরাও সারা দেশে আন্দোলন চালিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। কোথাও কোথাও নির্ধারিত নেতৃত্ব ছাড়াই মানুষ সংগঠিত হয়ে সন্তান হত্যার প্রতিবাদে লড়াই চালিয়ে গেছে। সংক্ষুব্ধ ছাত্র-জনগণের মধ্য থেকেই ময়দানে নেতা নির্ধারিত হয়েছে। মানুষের লড়াইটাই একসময় মুখ্য হয়ে ওঠে। সবাই-ই নেতা হয়ে ওঠেন, সবাই একে অপরকে রাস্তায় নেমে আসার আহ্বান জানান।
আগামীর সময় : সৃজনশীল কর্মসূচিগুলো কতটা কার্যকর ছিল?
জাহিদ আহসান : আন্দোলনের অন্যতম বড় শক্তি ছিল কর্মসূচির ভাষা ও কৌশলের নতুনত্ব। দীর্ঘদিন ধরে হরতাল মানুষের কাছে অনেকটা একঘেয়ে কর্মসূচিতে পরিণত হয়েছিল। একই কর্মসূচিকে নেতারা নতুন ভাষা দিয়ে ‘ব্লকেড’ হিসেবে সামনে আনেন। ফলে শিক্ষার্থী ও তরুণরা এটিকে নিজেদের আন্দোলনের কর্মসূচি হিসেবে গ্রহণ করে। পরে শহীদদের স্মরণে ‘রিমেম্বারিং আওয়ার হিরোজ’ কর্মসূচির মাধ্যমে মসজিদ, মন্দির, গির্জা ও প্যাগোডায় দোয়া ও প্রার্থনার আয়োজন করা হয়। এতে সাধারণ মানুষ আবেগের জায়গা থেকে আন্দোলনের সঙ্গে আরও বেশি যুক্ত হয়। আবার সরকার যখন জাতীয় শোক পালনের ঘোষণা দেয়, তখন কালোর বদলে লালকে প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে সামনে আনা হয়। কর্মসূচির ভাষা ও কৌশলের এই পরিবর্তনই আন্দোলনকে আরও বিস্তৃত করেছে।
আগামীর সময় : ছাত্রলীগকে হল ছাড়া করা কতটা টার্নিং পয়েন্ট ছিল?
জাহিদ আহসান : আমার মতে, এটি ছিল আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ টার্নিং পয়েন্টগুলোর একটি। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতীকী গুরুত্ব অনেক বেশি। এখানে কোনো রাজনৈতিক শক্তির পতন হলে তার প্রভাব দ্রুত সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ১৫ ও ১৬ জুলাই ছাত্রলীগ হল ছাড়া হওয়ার পর দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থীরা নতুন সাহস পেয়েছিল। তারা বুঝতে পারে, এতদিন যে শক্তিকে অজেয় মনে করা হতো, তাকে প্রতিরোধ করা সম্ভব। সেই আত্মবিশ্বাসই আন্দোলনকে দ্রুত সারা দেশে ছড়িয়ে দেয়।
আগামীর সময় : এনসিপি ও ছাত্রশক্তিকে অভ্যুত্থানের সবচেয়ে বেশি ‘ফলভোগী’ বলা হয়। আপনি কী বলবেন?
জাহিদ আহসান : আমি ‘ফলভোগ’ শব্দটির সঙ্গেই একমত নই। একটি গণঅভ্যুত্থানের ফল কোনো রাজনৈতিক দলের প্রাপ্তি হতে পারে না। এর প্রকৃত অর্জন হওয়া উচিত একটি গণতান্ত্রিক, মানবিক ও সাম্যের বাংলাদেশ। এখন কে সেই রাষ্ট্র গঠনে কতটা দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখছে, সেটিই আলোচনার বিষয় হতে পারে।
আগামীর সময় : জুলাই আন্দোলন সফল হলো, কিন্তু আগের আন্দোলনগুলো কেন পারেনি?
জাহিদ আহসান : শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ২০২৪ সালেই প্রথম বড় আন্দোলন হয়েছে—বিষয়টি এমন নয়। ২০১৪ সালের পর থেকে বিভিন্ন সময়ে বড় বড় আন্দোলন হয়েছে। ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবরসহ আরও অনেক কর্মসূচি ঘিরেও মানুষের প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু নেতৃত্বের দূরদর্শিতা, সঠিক পরিকল্পনা এবং সংকটময় মুহূর্তে দৃঢ় অবস্থানের অভাবে সেসব আন্দোলন কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পায়নি।
‘মার্চ টু ঢাকা’ এক দিন এগিয়ে এনে ৫ আগস্ট কর্মসূচি ঘোষণা করাও ছিল অত্যন্ত সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। ৪ আগস্টই বোঝা যাচ্ছিল, মানুষ আর অপেক্ষা করতে চায় না। যদি আরও এক দিন দেরি হতো, তাহলে সরকার নতুন করে ইন্টারনেট বন্ধ, গণগ্রেপ্তার বা আরও কঠোর দমন-পীড়নের সুযোগ পেত
জুলাই আন্দোলনের নেতৃত্ব সেই জায়গায় ভিন্ন ছিল। তারা আপসের পথে যায়নি; কৌশলগত দিক থেকে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছে। যখন মানুষ রাস্তায়, যখন একের পর এক প্রাণ ঝরছে, তখনও তারা সংলাপের বদলে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আর সেটিও একবারেই চূড়ান্ত পর্যায়ে না গিয়ে ধাপে ধাপে আন্দোলনকে পরিপক্ব রূপ দেওয়া হয়েছে। সংলাপ প্রত্যাখ্যান, নয় দফা, অসহযোগ এবং এক দফার মতো কৌশলগত পদক্ষেপ—এই ধরনের বাস্তববাদী (প্র্যাগম্যাটিক) রাজনৈতিক কৌশলের অভাব আগের আন্দোলনগুলোতে ছিল।
আগামীর সময় : জুলাই আন্দোলনে নারীদের অংশগ্রহণকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
জাহিদ আহসান : জুলাই আন্দোলনের শুরু থেকেই নারীদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় থেকেই নারী শিক্ষার্থীরা সক্রিয় ছিলেন। ১৪ জুলাই রাতে বিভিন্ন হলের শিক্ষার্থীরা থালা-বাসন বাজিয়ে হলের গেট পেরিয়ে আন্দোলনে নেমে এসেছিলেন। পরে অভ্যুত্থানের পুরো সময়ই নারী শিক্ষার্থী, মা-বোনদের অংশগ্রহণ আন্দোলনকে নতুন শক্তি দিয়েছে। আন্দোলনে প্রায় ১০ জন নারীও শহীদ হয়েছেন। নারীদের এই অংশগ্রহণ না থাকলে জুলাই গণঅভ্যুত্থান কখনোই এতটা বিস্তৃত হতে পারত না।
আগামীর সময় : ছাত্রদের বাইরে সাধারণ মানুষের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল?
জাহিদ আহসান : আমি সবসময় বলি, এটি শুধু ছাত্রদের আন্দোলন নয়; এটি ছাত্রদের নেতৃত্বে গণঅভ্যুত্থান। নেতৃত্ব ছাত্ররা দিয়েছে, কিন্তু এতে বাংলাদেশের প্রায় সব শ্রেণিপেশার মানুষ অংশ নিয়েছেন। শ্রমিক, শিক্ষক, অভিভাবক, সাংস্কৃতিককর্মী—এমনকি পথশিশুরাও এই আন্দোলনের অংশ ছিল। অনেক পথশিশুও শহীদ হয়েছে। এসব মানুষ ক্ষমতার ভাগ বা রাজনৈতিক সুবিধা চায়নি। তারা চেয়েছে এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে মানুষ গুম হবে না, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হবে না, বিনা কারণে গ্রেপ্তার হবে না, শ্রমিক ন্যায্য মজুরি পাবে এবং সাধারণ মানুষ সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে পারবে। এই প্রত্যাশাই ছিল গণঅভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় শক্তি।
আগামীর সময় : আন্দোলনের কোন মুহূর্তটি এখনো সবচেয়ে বেশি নাড়া দেয়?
জাহিদ আহসান : এমন অনেক মুহূর্ত আছে। ১৭ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলার সময় আমরা সম্পূর্ণ নিরস্ত্র অবস্থায় মিছিল করছিলাম। চারদিক থেকে র্যাব, বিজিবি ও পুলিশ গুলি, রাবার বুলেট ও টিয়ারশেল ছুড়ছিল। সবাই ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলেও কেউ হাল ছাড়েনি। সবাই আবার সংগঠিত হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে। সেই দৃঢ়তা আজও আমাকে নাড়া দেয়।
আগামীর সময় : ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি এক দিন এগিয়ে আনার সিদ্ধান্ত কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল?
জাহিদ আহসান : ‘মার্চ টু ঢাকা’ এক দিন এগিয়ে এনে ৫ আগস্ট কর্মসূচি ঘোষণা করাও ছিল অত্যন্ত সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। ৪ আগস্টই বোঝা যাচ্ছিল, মানুষ আর অপেক্ষা করতে চায় না। যদি আরও এক দিন দেরি হতো, তাহলে সরকার নতুন করে ইন্টারনেট বন্ধ, গণগ্রেপ্তার বা আরও কঠোর দমন-পীড়নের সুযোগ পেত। মানুষের তৈরি হওয়ার গতি ও মনোবলকে কাজে লাগানোর জন্য এই সিদ্ধান্ত ছিল অত্যন্ত কৌশলগত।
আগামীর সময় : আন্দোলনের নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় শক্তি কী ছিল?
জাহিদ আহসান : সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল মানুষের মনোভাব সঠিকভাবে বুঝতে পারা। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এর আগে অনেক বড় আন্দোলন হয়েছে; কিন্তু অনেক সময় নেতৃত্ব বুঝতে পারেনি মানুষ কোন পর্যায়ে আছে এবং কখন কোন কর্মসূচি দেওয়া উচিত। জুলাই আন্দোলনের নেতৃত্ব সেই জায়গায় সফল হয়েছে।
আগামীর সময় : নাহিদ ইসলামের নেতৃত্বকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
জাহিদ আহসান : আমার কাছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রধান নেতা নাহিদ ইসলাম। এর অর্থ এই নয় যে অন্য কারও অবদান ছিল না। বিএনপি, জামায়াত, ছাত্রদল, শিবির, বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন, প্রবাসী বাংলাদেশিসহ অসংখ্য মানুষ নানাভাবে এই আন্দোলনে ভূমিকা রেখেছেন। সাধারণ মানুষও যে যেভাবে পেরেছেন, আন্দোলনের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তবে একটি গণআন্দোলনে শেষ পর্যন্ত এমন একজন নেতৃত্ব দেন, যার আহ্বানে মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যায়। আমার দৃষ্টিতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সেই নেতৃত্বটি দিয়েছেন নাহিদ ইসলাম।
আগামীর সময় : জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে?
জাহিদ আহসান : জুলাই গণঅভ্যুত্থানের লক্ষ্য শুধু সরকার পরিবর্তন ছিল না। এক দফার ঘোষণাতেই বলা হয়েছিল, সরকার পতনের পাশাপাশি ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রকাঠামো ভেঙে নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলার কথা। শেখ হাসিনার পতন ঘটেছে, কিন্তু সেই রাষ্ট্রকাঠামোর মৌলিক সংস্কার এখনো সম্পূর্ণ হয়নি।
আগামীর সময় : জুলাই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় বার্তা কী?
জাহিদ আহসান : জুলাই আমাদের শিখিয়েছে, জনগণ ঐক্যবদ্ধ হলে কোনো স্বৈরাচার দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না। একই সঙ্গে এই আন্দোলন দেখিয়েছে, শুধু সাহস নয়, সুস্পষ্ট লক্ষ্য, সংগঠিত নেতৃত্ব, সময়োপযোগী কৌশল এবং সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ একটি গণআন্দোলনকে সফল করে।







