স্মার্ট অভিবাসন নীতি ছাড়া অর্থনৈতিক অগ্রগতি সম্ভব নয় : আরিফ উল্লাহ

মোহাম্মদ আরিফ উল্লাহ। ছবি: সংগৃহীত
স্মার্ট অভিবাসন নীতি প্রণয়ন ছাড়া কোনো দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ফ্রান্স টুয়েন্টি ফোরে কর্মরত বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ফরাসি সাংবাদিক মোহাম্মদ আরিফ উল্লাহ।
ফ্রান্স টুয়েন্টি ফোরের প্যারিস সদর দপ্তরে অভিবাসন বিষয়ক সাংবাদিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। একই সঙ্গে রয়েছেন ইউরোপভিত্তিক বিশেষায়িত সংবাদমাধ্যম ইনফোমাইগ্রেন্টসেও, যা ফ্রান্স টুয়েন্টি ফোর এবং জার্মান গণমাধ্যম ডয়চে ভেলের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত।
চট্টগ্রামে জন্ম নেওয়া আরিফ উল্লাহ দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন অভিবাসন, শরণার্থী সংকট, ইউরোপীয় নীতি, মানবাধিকার এবং বৈশ্বিক রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশে কাজ ও ভ্রমণের অভিজ্ঞতা তাকে অভিবাসন ও আন্তর্জাতিক অর্থনীতির বাস্তব চিত্র কাছ থেকে দেখার সুযোগ দিয়েছে বলে জানান তিনি।
তার ভাষ্য, এই অভিজ্ঞতার কারণে অভিবাসন বিষয়ে তার বিশ্লেষণ শুধু সাংবাদিকতার পর্যবেক্ষণ নয়, বরং বাস্তব অভিজ্ঞতালব্ধ মূল্যায়ন।
সম্প্রতি প্যারিসে ‘আগামীর সময়’-এর সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে গণমাধ্যম, অভিবাসন, বাংলাদেশের অর্থনীতি, রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেন তিনি। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেন সরদার হাসান ইলিয়াছ তানিম।
আগামীর সময় : আপনাকে শুভেচ্ছা। আপনি কবে থেকে ফ্রান্সে আছেন? শুরুর দিকের অভিজ্ঞতা জানতে চাই।
আরিফ উল্লাহ : ধন্যবাদ। আমার বাড়ি বাংলাদেশের চট্টগ্রাম শহরে। ২০১৬ সালে ফ্রান্সে আসি আমি। ফরাসি ভাষা শিক্ষা ও উচ্চশিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়েছি শুরু থেকেই। প্রথমে পন্থেও-সর্বন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফরাসি ভাষার উপর করেছি ডিপ্লোমা ও স্নাতক। পরে প্যারিস ইনস্টিটিউট অব পলিটিক্যাল স্টাডিজ যেটি ‘সায়েন্স পো’ নামে পরিচিত, সেখান থেকে অ্যাপ্লাইড সোশ্যাল সায়েন্সে করেছি স্নাতকোত্তর।
আগামীর সময় : পড়াশোনার বাইরে ফরাসি সমাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে কী ধরনের কাজ করেছেন?
আরিফ উল্লাহ : অভিবাসন, মানবাধিকার ও কূটনীতি বিষয়ক নানা ফরাসি ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পেশাগত ও স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করেছি আমি। ফরাসি সংস্থা লা সিমাদ, সিঙ্গা, ইচ ওয়ান, ডক্টরস উইদাউট বর্ডারসসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করার মাধ্যমে হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ কিছু অভিজ্ঞতা। এসব অভিজ্ঞতাই ফ্রান্সে কার্যকর নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে সহায়তা করেছে আমাকে। এ ছাড়া জুনিয়র ডিপ্লোম্যাট ইনিশিয়েটিভের (জেডিআই) মাধ্যমে ফ্রান্সে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশের দূতাবাসের সঙ্গে কাজ করার সুযোগও হয়েছিল।
আগামীর সময় : মানবাধিকার নিয়ে ঠিক কী ধরনের কাজ করেছেন?
আরিফ উল্লাহ : ২০১৮ সাল থেকে ফরাসি মানবাধিকার সংগঠন পিআরডিএইচ-এর সঙ্গে ‘প্রজেক্ট ম্যানেজার’ হিসেবে যুক্ত আছি আমি। বিশেষ করে বাংলাদেশের আইনের শাসন, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গণতন্ত্র নিয়ে সংস্থাটি প্রথমবারের মতো ফরাসি ভাষায় দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনা প্রকাশ করে। এ দুটি প্রকল্পেই কাজ করেছি সক্রিয়ভাবে। সবশেষ বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন নিয়েও একটি প্রকাশনা তৈরীর কাজ করছে পিআরডিএইচ। ফ্যাসিবাদবিরোধী সংগ্রামের অংশ হিসেবে এসব কাজ আমার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি হয়ে থাকবে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁর ঢাকা সফরের সময় মানবাধিকার ও গণতন্ত্র ইস্যুতে জোর দিয়ে বিবৃতি প্রদানকারী একমাত্র সংগঠন ছিল পিআরডিএইচ। পরবর্তীতে বিবৃতিটি বিএনপির মিডিয়া সেলসহ বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল।
আগামীর সময় : সাংবাদিকতায় কীভাবে এলেন?
আরিফ উল্লাহ : দীর্ঘদিন অভিবাসন নিয়ে কাজ করার ফলে ইউরোপ ও ফ্রান্সের অভিবাসনব্যবস্থা সম্পর্কে তৈরি হয় বাস্তব অভিজ্ঞতা। সায়েন্স পো থেকে পড়াশোনা শেষ করার পর রেডিও ফ্রান্স ইন্টারন্যাশনালে কর্মরত এক সহকর্মী আমাকে জানান, ফ্রান্স টুয়েন্টিফোর-এর একটি ডেস্কে ফরাসি ও বাংলা ভাষায় দক্ষ একজন সাংবাদিক প্রয়োজন। এরপর আমি আবেদন করি। পরে ডয়চে ভেলে বাংলা বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে তারা। ২০২১ সালের জানুয়ারিতে ইনফোমাইগ্রেন্টসে কাজ শুরু করি আমি।
আগামীর সময় : অভিবাসন নিয়ে কী ধরনের কাজ করেছেন? অভিজ্ঞতা কেমন?
আরিফ উল্লাহ : ইনফোমাইগ্রেন্টসের হয়ে আমি ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরের পাশাপাশি ইতালি, গ্রিস, রোমানিয়া, বেলজিয়ামসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে একক ও যৌথ অ্যাসাইনমেন্টে কাজ করেছি। মূলত বাংলাদেশি অভিবাসীরা যেসব রুট ব্যবহার করে ইউরোপে আসেন, চেষ্টা করেছি সেসব পথের জটিলতা, ঝুঁকি ও মানবিক দুর্ভোগ তুলে ধরতে।
আগামীর সময় : আপনার কাজের মধ্যে কোন অভিজ্ঞতাগুলো সবচেয়ে স্মরণীয়?
আরিফ উল্লাহ : ২০২২ সালে বাংলাদেশ ও গ্রিসের মধ্যে শ্রম অভিবাসন নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি হয়। ওই সময় গ্রিস সফরে গিয়ে দেশটির আলোচিত অভিবাসনমন্ত্রীর একক সাক্ষাৎকার নেওয়ার সুযোগ হয়েছিল, যা আমার জন্য অত্যন্ত স্মরণীয় অভিজ্ঞতা। এ ছাড়া ২০২৪ সালে বাংলাদেশের বিতর্কিত জাতীয় নির্বাচনের আগে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পর্যবেক্ষক দল পাঠানো নিয়ে নির্বাচন কমিশনের বিভ্রান্তিকর তথ্যের বিষয়ে ইইউ ফরেন অ্যাফেয়ার্স বিভাগের মুখপাত্র নাবিলা মাসরালির সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। সেই সাক্ষাৎকারে নির্বাচন কমিশনের তথ্যগত অসঙ্গতি স্পষ্টভাবে উঠে আসে। পরে এটি প্রথম আলোর বাংলা ও ইংরেজি সংস্করণসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল। ঘটনাটি আমার সাংবাদিকতা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতাগুলোর একটি।
আগামীর সময় : বাংলাদেশের অভিবাসন নীতি নিয়ে আপনার চিন্তা কী?
আরিফ উল্লাহ : বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ইনকামিং অভিবাসন মূলত রোহিঙ্গা সংকটকেন্দ্রিক এবং আউটগোয়িং অভিবাসন প্রবাসী কর্মী পাঠানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ফলে আমাদের অভিবাসন নীতি এখনো সুসংগঠিত কাঠামোয় আসেনি। শিক্ষার্থী অভিবাসন, দক্ষ কর্মী তৈরি, ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে অনিয়মিত অভিবাসন প্রতিরোধ, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে জি-টু-জি ও বেসরকারি উদ্যোগে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। আমাদের বিপুল জনশক্তিকে দক্ষ প্রবাসীতে রূপান্তর করতে না পারলে বর্তমান সরকারের জন্য নাজুক অর্থনীতি সামাল দেওয়া কঠিন হবে। দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টির হার কম হওয়ায় বিভিন্ন দেশের শ্রমবাজারের সংকটকে কাজে লাগানো গেলে ভালো ফল পাওয়া সম্ভব। বিশেষ করে শুধু মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক অভিবাসন নীতি থেকে বের হয়ে আসতে হবে। স্মার্ট অভিবাসন নীতি প্রণয়ন ছাড়া বাংলাদেশের অর্থনীতি এগোবে না।
আগামীর সময় : এ বিষয়ে বর্তমান সরকার কিংবা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কি কখনো আলাপের সুযোগ হয়েছে?
আরিফ উল্লাহ : প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে কখনো আলাপ হয়নি। তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কর্মরত অনেক কূটনীতিকের সঙ্গে বিভিন্ন আলোচনায় এসব বিষয় তুলে ধরেছি আমি। তবে তাদেরও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
আগামীর সময় : পেশাদার সাংবাদিকতার বাইরে সাংবাদিকদের অধিকার নিয়েও কি কাজ করেন?
আরিফ উল্লাহ : জি, আমি প্যারিসভিত্তিক সংগঠন ফ্রান্স-বাংলাদেশ জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশনের (এফবিজেএ) মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। এছাড়া বিদেশি সংবাদমাধ্যমে কর্মরত বাংলাদেশি সাংবাদিকদের সংগঠন বাংলাদেশি জার্নালিস্টস ইন ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়ার (বিজেআইএম) সদস্য আমি। এ ছাড়া নিয়মিত রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস (আরএসএফ) এবং কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টসের (সিপিজে) সঙ্গে সাংবাদিকদের অধিকার বিষয়ে তথ্য দিয়ে সহায়তা করি।
আগামীর সময় : পুরো সাক্ষাৎকারের জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। শুভকামনা রইল।
আরিফ উল্লাহ : আগামীর সময়-কেও নতুন অগ্রযাত্রার জন্য শুভেচ্ছা।






