আমাদের রাষ্ট্র শিশুদের জন্য চরম বৈরী হয়ে উঠেছে
- সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত দুটি প্রতিবেদনে আমাদের শিশুদের নিরাপত্তার চরম নাজুক চিত্র উন্মোচিত হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, গত সাত মাসে ১৫ হাজারের বেশি শিশু নিখোঁজ হয়েছে এবং ২ হাজারের বেশি শিশুর সন্ধান মেলেনি। অন্যদিকে, ‘আওয়াজ ডট বিডি’ প্ল্যাটফর্মে দেখা যাচ্ছে শিশুরা নিজ ঘর ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভয়াবহ যৌন নিগ্রহের শিকার হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, পরিবার থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান- কোথাও শিশুরা নিরাপদ নয়। এসব বিষয় নিয়ে আগামীর সময়ের সঙ্গে কথা বলেছেন শিশুসাহিত্যিক ও অনুবাদক দিলওয়ার হাসান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাঈদ জুবেরী।

প্রতীকী ছবি
আগামীর সময়: একদিকে শিশুরা নিখোঁজ হচ্ছে, অন্যদিকে, দেখা যাচ্ছে শিশুরা নিজ ঘর ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভয়াবহ যৌন নিগ্রহের শিকার হচ্ছে। সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও সমাজে শিশুদের বর্তমান বিপদগ্রস্ত অবস্থাকে আপনি কীভাবে বিশ্লেষণ করবেন?
দিলওয়ার হাসান: অত্যন্ত ক্ষোভ ও বেদনার সঙ্গে বলতে হচ্ছে, আমাদের বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও সমাজ দিন দিন শিশুদের জন্য চরম বিপদসঙ্কুল এবং বৈরী হয়ে উঠেছে। সমাজে শিশুরা বরাবরই উপেক্ষিত, নিগৃহীত এবং নানান হিংস্রতার শিকার। আমরা ওভারঅল শিশুদের কথা যদি বলি—ছেলেশিশু, মেয়েশিশু কিংবা ধনী, মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র শ্রেণী—সব শ্রেণীর শিশুই এখন চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। মাঝেমধ্যেই আমরা পত্রিকায় দেখি অমুক মাদ্রাসায় শিশু নিগৃহীত হচ্ছে, রাস্তায় শিশু দুর্ঘটনায় পড়ছে বা শিশু অপহরণের শিকার হচ্ছে। এই গোটা ব্যাপারটি আমাদের রাষ্ট্রের মৌলিক নীতিমালার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
রাষ্ট্র যদি তার সবচেয়ে কোমল ও অনুত্পাদক নাগরিক, অর্থাৎ শিশুদের সুরক্ষার সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা না করে, তবে বাইরে থেকে আমরা যতই বিচ্ছিন্ন চেষ্টা করি না কেন, এ সমস্যার আসল জায়গাটা এড্রেস করা যাবে না। রাষ্ট্র, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, অভিভাবক শ্রেণি এবং স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের এখানে বিশাল ভূমিকা থাকা উচিত ছিল। তাদের এটা হৃদয়ে অনুভবের মাধ্যমে সমস্যা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। শিশুরা আমাদের ভবিষ্যৎ; তারাই একদিন রাষ্ট্র ও সমাজের সব ক্ষেত্রে অবদান রাখবে। রাষ্ট্র যদি তাদের জীবন ও শৈশবের সুরক্ষা নিশ্চিত না করে, তবে একটি জাতি হিসেবে আমরা কোথায় গিয়ে দাঁড়াব?
আগামীর সময়: পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, শতকরা ৫৬ ভাগ ক্ষেত্রে শিশুই নিজ বাড়িতে কিংবা নিকটাত্মীয়ের বাসায় নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। এই ঘরোয়া নিরাপত্তার অভাবকে কীভাবে দেখেন?
দিলওয়ার হাসান: দেখুন, নিজ বাড়িতে বা নিকটাত্মীয়ের দ্বারা শিশুদের যৌন নিপীড়ন (সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট বা অ্যাবউজ) কিন্তু কোনো একক দেশের সমস্যা নয়, এটি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা একটি ইউনিভার্সাল প্রবলেম। তবে আমাদের এই ভারতীয় উপমহাদেশে, বিশেষ করে বাংলাদেশে, এ সমস্যাটার গভীরতা অনেক বেশি। এর মূল কারণ হলো আমাদের দেশে সোশ্যাল কনশাসনেস বা সামাজিক সচেতনতার চরম অভাব।
আমাদের সমাজ এ বিষয়গুলো নিয়ে একদমই ভাবে না। মিডিয়া, সমাজবিজ্ঞানী বা মনোবিজ্ঞানীরা হয়তো ইদানীং ভাবছেন, কিন্তু যে পরিমাণে সামাজিক তোলপাড় ও গবেষণামূলক ভাবাভাবি দরকার, তা হচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে কেবল রাষ্ট্র নয়—শিক্ষক, সমাজবিজ্ঞানী, এমনকি আমাদের লেখক-সাহিত্যিকদেরও গভীরভাবে ভাবতে হবে। শিশুরা কীভাবে এবং কাদের দ্বারা নিগৃহীত হচ্ছে, এগুলো মিডিয়ার সামনে তুলে ধরা, সামাজিক সচেতনতা তৈরি করা এবং সর্বস্তরে শিশুদের গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। কোনো শিশু যদি নিজ ঘরেই স্বজনের কাছে মারাত্মক ট্রমাটিক সিচুয়েশনে মানসিক ও শারীরিকভাবে বিধ্বস্ত হয়ে বড় হয়, তবে সে বড় হয়ে কীভাবে স্বাভাবিক নাগরিক হবে? একজন যদি শৈশবে এমন বিভীষিকাময় ট্রমার ভেতর দিয়ে যান, তবে তিনি সমাজকে সুস্থ সেবা দেবেন কীভাবে? তাই পরিবার থেকে শুরু করে রাষ্ট্র—সবাইকে এই নীরব ঘাতক মানসিকতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে।
আগামীর সময়: পুলিশের হিসাবে ২০২৩ থেকে ২০২৫—এই তিন বছরে নিখোঁজের জিডি হয়েছে প্রায় ৫৬,৭৭২টি। প্রতিদিন গড়ে অসংখ্য শিশু হারানো বা অপহৃত হওয়ার এই ভয়াবহতাকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
দিলওয়ার হাসান: এই চিত্র অত্যন্ত আতঙ্কজনক। তবে মনে রাখতে হবে, নিখোঁজ হওয়ার এই সংখ্যাটা হঠাৎ করে রাতারাতি তৈরি হয়নি। শিশু হারিয়ে যাওয়া বা নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা আমাদের দেশে আগেও ছিল, এখনো আছে। আগে এগুলো মিডিয়ায় এত আসত না, এখন আসছে বলে আমরা জানতে পারছি। এমনকি বহু পরিবার তো পুলিশ পর্যন্ত যায়ই না বা কেস ফাইল করে না। সুতরাং পেছনের সত্যটা আরও বড় হতে পারে।
এটিকে আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজকে চরম গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। অভিভাবকদের মধ্যেও অনেক সময় সচেতনতার অভাব দেখা যায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শক্ত আইনের প্রয়োগ এখানে নিশ্চিত করতে হবে। পুলিশ প্রশাসন ও আদালতের কঠোর পদক্ষেপ এবং সর্বস্তরের সামাজিক সচেতনতা ছাড়া এই মহাবিপদ দূর করা সম্ভব নয়।
আগামীর সময়: পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, সাধারণ নিম্নবিত্ত বা দরিদ্র পরিবারের শিশু নিখোঁজ হলে বা অপহৃত হলে পুলিশ সেটিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখতে চায় না। এই শ্রেণী বৈষম্য ও পুলিশের উদাসীনতা দূর করতে বিশেষ কোনো পুলিশিং ব্যবস্থার দরকার আছে কি?
দিলওয়ার হাসান: আপনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন তুলেছেন। উন্নত বিশ্বে কিন্তু নিখোঁজ শিশুদের তাৎক্ষণিক সন্ধানে ‘অ্যাম্বার অ্যালার্ট’ (Amber Alert)-এর মতো দারুণ ট্র্যাকিং ব্যবস্থা ও পুলিশের বিশেষায়িত চাইল্ড প্রটেকশন ইউনিট থাকে। সিঙ্গাপুর বা উন্নত দেশে পুলিশ ও ট্রাফিকের কঠোর নজরদারির কারণে একটা ছোট্ট শিশু একা হেঁটে নিরাপদে স্কুলে যাতায়াত করতে পারে। আমাদের দেশেও শিশুদের জন্য পুলিশের একটি সম্পূর্ণ আলাদা, প্রশিক্ষিত বিশেষায়িত ইউনিট গড়ে তোলা জরুরি, যারা কেবল শিশু উদ্ধার ও সুরক্ষা নিয়ে কাজ করবে।
আর দরিদ্রদের অভিযোগ না নেওয়ার বিষয়টি কেবল পুলিশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়—এটি আমাদের গোটা সমাজের একটি সামাজিক বিভাজন ও শ্রেণী বৈষম্যের ফল।
আগামীর সময়: ‘আওয়াজ ডট বিডি’র উপাত্তে দেখা যায়, ৩৬ শতাংশ শিশু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিপীড়নের শিকার হয়েছে। কওমি মাদ্রাসা, আলিয়া মাদ্রাসা, জেনারেল স্কুল—সবখানেই শারীরিক প্রহার ও যৌন নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে। আমরা কি শিশুদের জন্য কোনো সুরক্ষিত একাডেমিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে পেরেছি?
দিলওয়ার হাসান: একদমই পারিনি। আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো শিশুবান্ধব হওয়া তো দূরের কথা, এগুলো বহু ক্ষেত্রে শিশুদের জন্য ভীতিপ্রদ স্থান হয়ে উঠেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা আবাসিক হোস্টেলগুলোর কোনো দায়বদ্ধতা নেই। পরিচালনা পর্ষদ ও শিক্ষকরা তাদের অর্পিত দায়িত্ব পালন করছেন না। অনেক অভিভাবকও জানেন না যে প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নিরাপত্তা দাবি করা তাদের অধিকার।
আমরা একটা অশুভ এবং বিকৃত ইকোসিস্টেমের মধ্যে আটকা পড়ে গেছি। যে শিক্ষক বা ব্যক্তি শৈশবে নিজে প্রচণ্ড প্রহার ও নিগ্রহের শিকার হয়েছেন, তার ভেতরে একধরনের অবচেতন প্রতিশোধপরায়ণতা কাজ করে। তিনি মনে করেন—‘আমি ছোটবেলায় মাইর খেয়ে বড় হয়েছি, নিগৃহীত হয়েছি, তো এখন এদের মারলে বা এদের ওপর নির্যাতন করলে দোষ কী?’ এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক ব্যাধি
আমাদের দেশে নির্যাতন ও শাসনের বিভাজন নিয়ে বড় রকমের বোঝাপড়ার ঘাটতি রয়েছে। বহু শিক্ষক মনে করেন শিশুকে মারা বা প্রহার করাই শাসনের একমাত্র পথ। অথচ আমাদের দেশে বহু আগেই শিক্ষার্থীদের ওপর শারীরিক প্রহার আইন করে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কোনো শিক্ষার্থী পড়া পারল না বা ভুল করল, আর শিক্ষক তাকে বেধড়ক পিটিয়ে দিলেন—এটি আইনত অপরাধ। কিন্তু আইন থাকলেও তার কার্যকর এনফোর্সমেন্ট বা প্রয়োগ নেই। এনফোর্সমেন্ট না থাকার কারণেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এই বেপরোয়া সহিংসতা ও নিপীড়ন বন্ধ হচ্ছে না।
আগামীর সময়: এই যে শিশুরা প্রহৃত হচ্ছেন, অনেক সময় যৌন নিগ্রহের শিকার হচ্ছেন- এতে কি একধরনের ‘নিপীড়নের ইকোসিস্টেম’ গড়ে উঠছে? অর্থাৎ শৈশবে নিজে বেতের বাড়ি বা অ্যাবিউজের শিকার হয়ে বড় হওয়া ব্যক্তিটি পরবর্তীতে শিক্ষক বা অভিভাবক হয়ে একই সহিংসতার পুনরাবৃত্তি করছেন?
দিলওয়ার হাসান: হ্যাঁ, সাইকোলজিক্যালি এটি শতভাগ সত্যি। আমরা একটা অশুভ এবং বিকৃত ইকোসিস্টেমের মধ্যে আটকা পড়ে গেছি। যে শিক্ষক বা ব্যক্তি শৈশবে নিজে প্রচণ্ড প্রহার ও নিগ্রহের শিকার হয়েছেন, তার ভেতরে একধরনের অবচেতন প্রতিশোধপরায়ণতা কাজ করে। তিনি মনে করেন—‘আমি ছোটবেলায় মাইর খেয়ে বড় হয়েছি, নিগৃহীত হয়েছি, তো এখন এদের মারলে বা এদের ওপর নির্যাতন করলে দোষ কী?’ এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক ব্যাধি।
অথচ পৃথিবী অনেক বদলে গেছে, প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের চরম বিকাশ ঘটেছে, মানুষের মনোজগতে পরিবর্তন আসছে। পুরনো যুগের সেই ‘মাইর খেয়ে শেখা’র প্রথা আজ মধ্যযুগীয় বর্বরতা ছাড়া আর কিছুই নয়। কিন্তু আমাদের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনের জন্য রাষ্ট্র বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না। শুধু সরকার নয়, বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। শিক্ষকদের মোটিভেশন দেওয়া, শিশুদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো এবং এই বিষাক্ত চক্র বা ইকোসিস্টেম ভাঙার জন্য জাতীয়ভাবে আলাদা এফোর্ট বা প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
আগামীর সময়: আগের প্রজন্মের তুলনায় বর্তমানে পরিবারগুলোতে সন্তানের সংখ্যা অনেক কমে এসেছে—বেশিরভাগ পরিবারেই একটি বা দুটি সন্তান। তাসত্ত্বেও পরিবারে শিশুদের প্রতি এই অবহেলা ও নিরাপত্তাহীনতা কেন দেখা দিচ্ছে?
দিলওয়ার হাসান: ঠিকই বলেছেন, আজ থেকে তিন-চার প্রজন্ম আগে এক একটি পরিবারে সাত-আটজন করে সন্তান থাকত। তখন হয়তো চরম আর্থিক ও সামাজিক সীমাবদ্ধতার কারণে বাবা-মায়েরা প্রতিটি সন্তানকে আলাদা করে নিবিড় টেক কেয়ার বা মনোযোগ দিতে পারতেন না, যদিও ভালোবাসা বা মমতার অভাব ছিল না। কিন্তু এখন তো মানুষের সন্তানসংখ্যা এক বা দুইয়ে নেমে এসেছে। সুতরাং বাবা-মায়ের পক্ষে সন্তানকে আরও অনেক বেশি আগলে রাখা ও টেক কেয়ার করা সম্ভব ছিল।
কিন্তু দুঃখজনকভাবে, আধুনিক নাগরিক জীবনযাত্রায় অভিভাবকরা এই টেক কেয়ারের জায়গাটিতে চরম অবহেলা করছেন। আবার পারিবারিক সচেতনতা বা ফ্যামিলি প্ল্যানিংয়ের যে সরকারি উদ্যোগগুলো আগে ছিল, সেগুলোও স্থবির হয়ে পড়েছে। পরিবারগুলো যেমন ছোট হচ্ছে, তেমনি শিশুদের সামাজিক ও মানসিক নিরাপত্তার বন্ধনগুলোও আলগা হয়ে যাচ্ছে।
আগামীর সময়: কর্মজীবী দম্পতি বা গার্মেন্টস শ্রমিকদের জন্য দেশে নিরাপদ ‘চাইল্ড কেয়ার’ বা ডে-কেয়ার ব্যবস্থার প্রচণ্ড অভাব রয়েছে। অনেক গার্মেন্টস শ্রমিক তাদের ৪-৮ বছরের শিশুদের বাধ্যতামূলকভাবে আবাসিক মাদ্রাসায় পাঠিয়ে দিচ্ছেন চাইল্ড কেয়ারের বিকল্প হিসেবে। রাষ্ট্রীয়ভাবে এই চাইল্ড কেয়ার কাঠামোর ঘাটতিকে কীভাবে দেখেন?
দিলওয়ার হাসান: এটি একটি অত্যন্ত কঠিন ও জটিল বাস্তব সমস্যা। উন্নত বিশ্বে বেবি সিটিং বা চাইল্ড কেয়ার সার্ভিস একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। আমাদের দেশে সাধারণ মানুষের পক্ষে সেই ব্যয়বহুল চাইল্ড কেয়ার আফোর্ড করা অসম্ভব।
বিশেষ করে শিল্প ও গার্মেন্টস অঞ্চলগুলোতে নিম্নবিত্ত মা-বাবারা বাধ্য হয়ে চাইল্ড কেয়ারের বিকল্প হিসেবে অবুঝ শিশুদের কওমি বা আবাসিক মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়ে দিচ্ছেন। আর রাষ্ট্র এখানে সম্পূর্ণ চোখ বন্ধ করে রেখেছে। আইনে স্পষ্ট বলা আছে—প্রতিটি ব্যাংক, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও কারখানায় বাধ্যতামূলক ‘ডে-কেয়ার’ ও ব্রেস্টফিডিং কর্নার থাকতে হবে। আমি নিজে ব্যাংকে কাজ করেছি, কাগজে-কলমে আইনটি দেখেছি। কিন্তু কোথাও কোনো মনিটরিং নেই, তদারকি নেই। রাষ্ট্র যদি পোশাক শিল্পাঞ্চল ও সাধারণ কর্মজীবী মানুষের জন্য সাশ্রয়ী চাইল্ড কেয়ার সেন্টার গড়ে তুলতে প্রণোদনা ও সাহায্য না দেয়, তবে শিশুরা এভাবেই অনিরাপদ থেকে যাবে।
আগামীর সময়: সরকারি শিশু-কিশোর উন্নয়ন বা পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলোর অবস্থাও করুণ। কিছুদিন আগে একটি কেন্দ্র থেকে শিশুরা খিড়কি ভেঙে পালিয়ে যায় এবং তাদের ওপর চালানো অমানবিক নির্যাতনের কথা চিঠিতে লিখে যায়। এই প্রশাসনিক ব্যর্থতা কিসের ইঙ্গিত দেয়?
দিলওয়ার হাসান: এটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক একটি ঘটনা। যে সরকারি কেন্দ্রগুলোতে পথশিশু বা সংকটাপন্ন শিশুদের আশ্রয় ও স্বাভাবিক জীবনের ট্রেনিং দেওয়ার কথা, সেখানে শিশুদের ঠিকমতো খেতে দেওয়া হয় না, মারে, কমদামি খাবার দেওয়া হয়। অথচ রাষ্ট্র এসব শিশুদের জন্য কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দিচ্ছে। সেই বরাদ্দের টাকা দুর্নীতিবাজ আমলা ও কর্মচারীরা মেরে খাচ্ছে, তাদের ব্যবহার করছে। এটি অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে একটি ‘ব্যর্থ রাষ্ট্রে’র নমুনা প্রদর্শন করে।
আমাদের দেশে শিশু ও নারী বিষয়ক মন্ত্রণালয় আছে, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় আছে। কিন্তু তাদের প্রশাসনিক কাঠামো পুরোটাই আমলা নির্ভর। দায়িত্বপ্রাপ্ত আমলারা কেবল মাস শেষে বেতন নেওয়ার জন্য চাকরি করেন, শিশুদের প্রতি কোনো মানবিক দায়বদ্ধতা তাদের নেই। সরকারও এসব মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতি ও তদারকিতে কোনো মনোযোগ দেয় না। একটা মন্ত্রণালয় যদি তার অধীনস্থ পুনর্বাসন কেন্দ্রের বাচ্চাদের সঠিক খাবার ও নিরাপত্তা দিতে না পারে, তবে সেই মন্ত্রণালয়ের অস্তিত্বের সার্থকতা কোথায়?
আগামীর সময়: এই যে নীতি নির্ধারণে দীর্ঘসূত্রতা, সদিচ্ছার অভাব এবং তদারকিশূন্যতা—এর মূল গোড়া কোথায়? আমরা কীভাবে এই সংকট থেকে উত্তরণ পেতে পারি?
দিলওয়ার হাসান: এই সংকটের মূল গোড়া হলো ‘রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত’ ও ‘রাজনৈতিক সদিচ্ছা’। শিশুদের বিষয়টিকে সমাজ বা রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। দেশের বড় বড় অর্থনৈতিক সংকট, বিদ্যুৎ বা জ্বালানি খাতের সংকটের পেছনে যেমন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত জড়িত, শিশু সুরক্ষার অবক্ষয়ের পেছনেও মূল কারণ রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব।
শিল্প ও গার্মেন্টস অঞ্চলগুলোতে নিম্নবিত্ত মা-বাবারা বাধ্য হয়ে চাইল্ড কেয়ারের বিকল্প হিসেবে অবুঝ শিশুদের কওমি বা আবাসিক মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়ে দিচ্ছেন। আর রাষ্ট্র এখানে সম্পূর্ণ চোখ বন্ধ করে রেখেছে। আইনে স্পষ্ট বলা আছে—প্রতিটি ব্যাংক, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও কারখানায় বাধ্যতামূলক ‘ডে-কেয়ার’ ও ব্রেস্টফিডিং কর্নার থাকতে হবে। আমি নিজে ব্যাংকে কাজ করেছি, কাগজে-কলমে আইনটি দেখেছি। কিন্তু কোথাও কোনো মনিটরিং নেই, তদারকি নেই
রাজনৈতিক নেতৃত্বের যদি দূরদর্শিতা ও আন্তরিক ইচ্ছা না থাকে, তবে আমলারা যা ইচ্ছা তাই করবে। একটি সত্যিকারের জনবান্ধব, পিপলস-ওরিয়েন্টেড সরকার ছাড়া শিশুদের এই সামগ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। যে সরকার জনগণকে ভালোবাসবে, দেশের শিশুদের নিজের সন্তান মনে করে পলিসি তৈরি করবে, তেমন নেতৃত্ব না এলে আমরা শুধু সেমিনারে গোলটেবিল আলোচনা করব, বাস্তব কোনো পরিবর্তন আসবে না।
আগামীর সময়: একজন জ্যেষ্ঠ শিশুসাহিত্যিক হিসেবে, দেশের এই কঠিন বাস্তবতায় আমাদের শিশু সাহিত্যের বর্তমান অবস্থা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আপনার বার্তা কী?
দিলওয়ার হাসান: যখন আমি দেখি আমাদের অবুঝ শিশুরা অমানবিক শারীরিক ও যৌন নিগ্রহের শিকার হয়েও ভয়ে মুখ ফুটে বলতে পারছে না, কিংবা অপরাধটা কী তা বুঝতেই পারছে না—তখন একজন শিশুসাহিত্যিক হিসেবে ভেবে কোনো কূলকিনারা পাই না। চরম বিষণ্নতা ও নৈরাশ্যে মন ডুবে যায়।
আমাদের বিরাট দায়বদ্ধতা রয়েছে। দুঃখজনক হলেও সত্যি, বাংলাদেশে বর্তমানে শিশুদের জন্য ভালো মানের বা গবেষণাধর্মী সাহিত্য তৈরি হচ্ছে না। বেশিরভাগ লেখক কেবল ভূতের গল্প বা কাল্পনিক রূপকথা লিখে দায় সারছেন। কিন্তু কেবল ভূতের গল্প দিয়ে তো শিশুমনকে সচেতন করা যাবে না।
আমাদের এমন সাহিত্য লিখতে হবে যা শিশুদের মধ্যে চিন্তা-চেতনার উদ্রেক ঘটায়, কোনটা ভালো স্পর্শ, কোনটা মন্দ স্পর্শ তা চিনতে শেখায়। শিশুদের ভেতরের সহানুভূতি ও প্রকৃতিপ্রেম জাগ্রত করতে হবে। প্রতিটি স্কুলের লাইব্রেরিগুলো খুলে দিতে হবে এবং রাষ্ট্র, সমাজ, শিক্ষক ও সাহিত্যিকদের এক হয়ে শিশুদের পাশে দাঁড়াতে হবে। তবেই হয়তো আমরা আমাদের শিশুদের জন্য একটি বাসযোগ্য নিরাপদ পৃথিবী রেখে যেতে পারব।




