তদন্তের দুর্বলতা ও ন্যায়বিচার

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলায় নিম্ন আদালতে দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায় উচ্চ আদালতে এসে ব্যাপকভাবে বদলে যাওয়ার চিত্রটি বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার এক গভীর ও উদ্বেগের জায়গা উন্মোচন করেছে। প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, একটি বিশেষ হাইকোর্ট বেঞ্চে নিষ্পত্তি করা ১৪টি ডেথ রেফারেন্সের ৩০ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির মধ্যে মাত্র সাতজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রয়েছে। বাকিদের মধ্যে ১০ জন সম্পূর্ণ খালাস পেয়েছেন এবং ১৩ জনের সাজা কমে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে রূপ নিয়েছে। নিম্ন আদালতে দেওয়া চারটির মধ্যে তিনটি মৃত্যুদণ্ডই হাইকোর্টে এসে টিকছে না। এ পরিসংখ্যান আমাদের বিদ্যমান তদন্তব্যবস্থা ও তড়িঘড়ি করে বিচারিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক বার্তা দেয়।
উচ্চ আদালতে নিম্ন আদালতের রায় ও সাজা এভাবে ভেস্তে যাওয়ার পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে পুলিশি তদন্তের চরম দুর্বলতা এবং বিচারে তড়িঘড়ি করার মানসিকতা। নারী ও শিশু নির্যাতনের স্পর্শকাতর ও আলোচিত ঘটনাগুলোয় সমাজ এবং গণমাধ্যমের প্রবল চাপ থাকে। অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক নির্দেশে মামলা ‘ফাস্ট ট্র্যাক’ বা দ্রুত বিচার আদালতের আদলে নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হয়। জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদের ভাষায়, ‘বিচার যখন হারিড (hurried) হয়, ন্যায়বিচার তখন বারিড (buried) হয়ে যায়।’ জনরোষ এড়াতে বা দ্রুত বিচার শেষ করার বাহবা কুড়াতে গিয়ে সাক্ষ্যপ্রমাণের সূক্ষ্ম বিচার না করেই মৃত্যুদণ্ডের মতো চরম দণ্ড দিয়ে দেওয়ার এক প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
ডেটা ও বৈজ্ঞানিক আলামতের অভাব বিচারিক প্রক্রিয়াকে গোড়াতেই পঙ্গু করে দিচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তির যুগেও অধিকাংশ মামলায় ডিএনএ পরীক্ষা, আঙুলের ছাপ বা ডিজিটাল আলামত সংগ্রহ না করে শুধু আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি ও আত্মীয়স্বজনদের মৌখিক সাক্ষীর ওপর নির্ভর করা হয়। হাইকোর্টে এসে যখন বৈজ্ঞানিক প্রমাণের অনুপস্থিতি, পারিপার্শ্বিক প্রমাণের অসংগতি কিংবা প্রধান সাক্ষীদের বৈরী রূপ প্রকট হয়, তখন ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার মৌলিক নীতি— ‘সন্দেহের অতীত প্রমাণ’ অনুযায়ী আসামিকে খালাস বা সাজা কমানো ছাড়া বিচারকদের সামনে বিকল্প থাকে না। বিশেষ করে যৌতুকজনিত হত্যাকাণ্ডের মামলায় আইনের নির্দিষ্ট ধারা প্রমাণের ব্যর্থতায় মৃত্যুদণ্ড বাতিল করে সাধারণ দণ্ডবিধির আওতায় সাজা কমাতে হচ্ছে।
বিচার পাওয়ার দীর্ঘ অপেক্ষার পর বিচারিক আদালতের রায়ে স্বস্তি পেলেও উচ্চ আদালতে এসে মামলা ভেস্তে গেলে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো নতুন করে চরম হতাশা ও অন্যায়ের শিকার হয়। অন্যদিকে, তদন্তের দুর্বলতায় প্রকৃত অপরাধী খালাস পেয়ে গেলে অপরাধপ্রবণতা কমার বদলে আরও বৃদ্ধি পায়।
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার স্বার্থে আবেগ বা লোকদেখানো কার্যকারিতার চেয়ে নিখুঁত বিচার প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা জরুরি। প্রথমত, পুলিশ বিভাগের তদন্ত কর্মকর্তাদের আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক তদন্ত পদ্ধতির সঠিক প্রশিক্ষণ দিতে হবে এবং প্রতিটি মামলায় ফরেনসিক আলামত বাধ্যতামূলক করতে হবে। দ্বিতীয়ত, নিম্ন আদালতে বিচারে গতি আনার পাশাপাশি মান নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি, যাতে রায় প্রদানের ক্ষেত্রে আলামত ও প্রমাণের পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনার ঘাটতি না থাকে। আইনের প্রয়োগ হতে হবে কঠোর, তবে তা যেন যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়। নতুবা অন্যায় দণ্ড যেমন আইনের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করবে, তেমনি দুর্বল তদন্তের সুবাদে অপরাধীর পার পেয়ে যাওয়া বিচারব্যবস্থার ওপর জনমানুষের আস্থা সম্পূর্ণ নিঃশেষ করে দেবে।




