সম্পাদকীয়
সরকারি সাত খুন মাফ

আইনের চোখে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান আর বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকার কথা নয়। বরং রাষ্ট্রের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানই আইন মানার ক্ষেত্রে সবার আগে দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে— এটাই স্বাভাবিক প্রত্যাশা। কিন্তু চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদী দূষণের সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) সংশ্লিষ্টতা এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্ধারিত প্রায় ৩ কোটি টাকা জরিমানা কার্যকর না হওয়ার যে চিত্র সামনে এসেছে, তা সেই প্রত্যাশার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
পরিবেশ অধিদপ্তরের দায়িত্ব পরিবেশ রক্ষা করা। কোন প্রতিষ্ঠান সরকারি, বেসরকারি, দেশি কিংবা বিদেশি, তা তাদের বিবেচ্য নয়। প্রতিষ্ঠান আইন ভাঙলে ব্যবস্থা নেওয়া এবং ক্ষতি করলে ক্ষতিপূরণ আদায় করাই তাদের কর্তব্য। অথচ ইআরএলের ক্ষেত্রে জরিমানা নির্ধারণের পরও যদি আন্তঃমন্ত্রণালয় তদবিরের কারণে তা কার্যকর না হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই— পরিবেশ আইন কি সবার জন্য সমান নয়?
আরও উদ্বেগের বিষয়, ইআরএলের দূষণের প্রসঙ্গটি নতুন নয়। অতীতে পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিদর্শনেও অপরিশোধিত তরল বর্জ্য কর্ণফুলীতে যাওয়ার প্রমাণ পাওয়ার কথা প্রকাশিত হয়েছে। ২০২০ সালসহ একাধিবার এ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নদী দূষণের দায়ে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ সমস্যাটি সাময়িক নয়; দীর্ঘদিনের ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা ও পরিবেশগত দায়বদ্ধতার প্রশ্ন এখানে জড়িত।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো— সরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য কি আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে অদৃশ্য কোনো ছাড়পত্র বা শক্তিশালী হাত আছে? থাকলে তাদের স্বার্থ কী? যদি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পরিবেশ দূষণ করে জরিমানা দিতে বাধ্য হয়, মামলা হয়, তাহলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে একই আইন প্রয়োগ হবে না কেন? একটি বেসরকারি কারখানার দূষণে যে নদীর পানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দূষণে সেই নদীর পানি কি তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়? প্রকৃতি মালিকের পরিচয় দেখে দূষিত বা পরিশুদ্ধ হয় না।
কর্ণফুলী নদী চট্টগ্রামের প্রাণ। এই নদী শুধু একটি জলধারা নয়; বন্দর, শিল্প, মৎস্য, নৌপরিবহন, জীববৈচিত্র্য ও নগরজীবনের সঙ্গে এর সম্পর্ক গভীর। সেখানে শিল্পবর্জ্য গিয়ে পড়লে তার ক্ষতি কাগজে-কলমে একটি জরিমানার অঙ্কে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাব পড়ে নদীর পানি, জলজ পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর।
সুতরাং, পরিবেশ অধিদপ্তর কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে জরিমানা নির্ধারণ করলে সেটিকে রাজনৈতিক, প্রশাসনিক কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক তদবিরে আটকে রাখার সংস্কৃতি ক্ষতিকর, মন্দচর্চা এবং বৈষম্যমূলক। যে কর্মকর্তা বা কর্তৃপক্ষ আইনানুগ জরিমানা কার্যকর হওয়ার পথে অযৌক্তিক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছেন, বিষয়টি তদন্ত করে তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন। কারণ জরিমানা না দেওয়ার দায় শুধু যে প্রতিষ্ঠানটির, তা নয়; আইন প্রয়োগের সিদ্ধান্তকে যারা দুর্বল করে দেন, তাদের দায়ও কম নয়।
ইস্টার্ন রিফাইনারি দেশের গুরুত্বপূর্ণ একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। জ্বালানি নিরাপত্তায় এর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু জাতীয় স্বার্থের কথা বলে পরিবেশগত দায় প্রতিষ্ঠানটি এড়িয়ে যেতে পারে না। বরং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইআরএলের কাছ থেকেই সর্বোচ্চ পরিবেশগত মানদণ্ড ও সতর্কতা প্রত্যাশিত।
কর্ণফুলীকে দূষণমুক্ত রাখা কোনো মন্ত্রণালয় বা একটি প্রতিষ্ঠানের একক দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব। আর সেই দায়িত্ব পালনের প্রথম শর্ত হলো— আইনের চোখে সবাই সমান।
সরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য যদি জরিমানা ‘মাফযোগ্য’ আর বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য ‘অবশ্য পরিশোধযোগ্য’ হয়, তাহলে সেটি শুধু প্রশাসনিক বৈষম্য নয়— আইনের প্রতি মানুষের আস্থার জন্যও বিপজ্জনক ও আইন ভাঙার মতো ধৃষ্টতা। যারা জরিমানা কার্যকর হতে বাধা দিয়েছেন এবং টালবাহানা করেছেন কিংবা আইনগত সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছেন, তাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।



