আগামীর চোখ
হারাম খেয়ে হালাল সনদ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বরাবর,
মহাপরিচালক, বিএসটিআই, ঢাকা
মহাত্মন, আমরা জানি, পৃথিবীতে কোনো কিছুই নিঃশুল্ক নয়। বাতাস নিতে গেলে ফুসফুসের আয়ু ফুরোয়, আর পৃথিবীতে বাঁচতে গেলে তো মূল্য দিতেই হয়। আপনারা সেই পরম সত্যটি ব্যবসায়ীদের বুঝিয়ে দিয়েছেন।
এ দেশের মানুষের অন্তরে হালাল-হারামের চেতনা বড্ড গভীর। বিশ্বাসের সেই পবিত্র আবেগকে আপনারা ব্যবসায়িক পুঁজিতে রূপান্তর করেছেন। মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে যে এমন সুনিপুণ প্রতারণা করা যায়, তা আপনাদের না দেখলে জানা হতো না। হালাল শব্দের ভেতরের যে আধ্যাত্মিক শুভ্রতা, তাকে আপনারা জাগতিক অর্থের ওজনে বেঁধে ফেলেছেন। ১৬-১৮ লাখ টাকার বিনিময়ে কিংবা একটা বিলাসবহুল গাড়ির বিনিময়ে যে সনদ মেলে, তা তো আর কেবল কাগজ নয়; তা এক স্বর্গীয় পাসপোর্ট। ঘুষের হারাম টাকায় ভেজানো সেই হালাল কাগজের বরকত সত্যিই অনন্য।
অবশ্য আমাদের মতো সাধারণ ভোক্তারা যখন বাজারে যাই, তখন ওজনে কম পাওয়াটা আমাদের কাছে নিয়তি বলে মনে হয়। আপনারা ওজনের কাঁটায় যে সূক্ষ্ম কারসাজির স্বাধীনতা ব্যবসায়ীদের দিয়েছেন, তা এক গভীর দার্শনিক শিক্ষা। কম ওজনে বেঁচে থাকাটাই যে আসল বৈরাগ্য, তা বিএসটিআই-এর সিল মারা দাঁড়িপাল্লা না দেখলে বুঝতাম না।
ভেজাল? সে তো এখন আমাদের রক্তের অংশ। খাবারে ফরমালিন, দুধে ডিটারজেন্ট আর মসলায় ইটের গুঁড়া— এ তো আসলে একধরনের অমৃত। আপনারা আমাদের শরীরকে এমন এক লোহার খাঁচায় রূপান্তর করছেন, যা কোনো বিষেই আর মরে না। আপনারা চান, এই দেশের মানুষ ভেজাল খেয়ে খেয়ে অমরত্ব লাভ করুক।
হে শুদ্ধতার কারিগরগণ, ব্যবসায়ীরা কাঁদছে। তারা বলছে, আপনাদের সনদের দাম নাকি বড্ড চড়া। আর সেই সনদের মান নাকি সুদূর সৌদি আরবেও পৌঁছায় না। আপনাদের সিল মারা কাগজের ওপর যখন আরবের মরুর বাতাস আস্থা পায় না, তখন ব্যবসায়ীরা বাধ্য হয়ে ভারত, থাইল্যান্ড কিংবা সিঙ্গাপুরে ছুটছে শুদ্ধতার খোঁজে। তারা বোঝে না, আপনারা তো কেবল পণ্যের মান পরীক্ষা করেন না; আপনারা ব্যবসায়ীদের পকেটও নিখুঁতভাবে পরিষ্কার করেন। পকেট ফাঁকা থাকাই তো দুনিয়ার সবচেয়ে বড় পবিত্রতা।
আপনাদের এই ‘টাকা দিলে হালাল’ নীতি চিরজীবী হোক। দেশের মানুষ ওজনে কম পাক, ভেজাল খেয়ে ধন্য হোক আর আপনারা গাড়িতে চড়ুন। পরকালের হিসাব তো পরেই হবে, ইহকালের হালাল-হারামের হিসাবটা আপনারা এভাবেই চাকা আর নোটে চুকিয়ে দিন।
ইতি
এক ভেজাল-সহনশীল সাধারণ ভোক্তা




