সম্পাদকীয়
পুষ্টি চাই শিশুর থালায়

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
একটি শিশুর উচ্চতা কমে যাওয়ার অর্থ শুধু শারীরিক মাপের পরিবর্তন নয়। এর পেছনে যদি থাকে দীর্ঘদিনের অপুষ্টি, তাহলে সেটি একটি পরিবারের অসচ্ছলতার গল্প, সমাজের বৈষম্যের চিত্র এবং একই সঙ্গে রাষ্ট্রের খাদ্য ও সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতারও প্রতিচ্ছবি। যে শিশু পর্যাপ্ত পুষ্টি না পেয়ে বয়সের তুলনায় খর্বকায় হয়ে বেড়ে ওঠে, তার ক্ষতি শুধু শৈশবে সীমাবদ্ধ থাকে না; তার শিক্ষা, মেধার বিকাশ, কর্মক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ জীবনও এর প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
দৈনিক আগামীর সময়-এর গতকাল শুক্রবারের বিশেষ প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্য তাই গভীর উদ্বেগের কারণ। দেশের পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর ২৪ শতাংশ খর্বকায়, অর্থাৎ প্রায় প্রতি চার শিশুর একজন দীর্ঘমেয়াদি অপুষ্টির শিকার। ২০২৬ সালের বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচকে ১২২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৮৪তম এবং স্কোর ১৯ দশমিক ২, যা ক্ষুধার ‘মাঝারি’ মাত্রা নির্দেশ করে। ২০০০ সালে বাংলাদেশের স্কোর ছিল ৩৪ দশমিক ৬
বিশেষজ্ঞদের মতে, গর্ভধারণ থেকে শুরু করে শিশুর জীবনের প্রথম এক হাজার দিনের মধ্যে তার পুষ্টি পরিস্থিতি নির্ধারিত হয়ে যায়। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো কোনো শিশু একবার খর্বকায় হয়ে গেলে তার শারীরিক ও মানসিক ঘাটতি পূরণ করা প্রায় অসম্ভব। শৈশবের এই পুষ্টিহীনতার প্রভাব কৈশোর ও বয়ঃসন্ধিকালেও গড়ায়। বাংলাদেশের ১৯ বছর বয়সী তরুণীদের গড় উচ্চতা প্রায় পাঁচ ফুটের কাছাকাছি, যা বিশ্বের সর্বনিম্ন গড় উচ্চতার দেশগুলোর অন্যতম।
এখানেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। ক্ষুধার্ত মানুষের পেটে কোনোভাবে খাবার পৌঁছে দেওয়া এবং শিশুর প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করা এক বিষয় নয়। একটি শিশু হয়তো প্রতিদিন ভাত পাচ্ছে; কিন্তু সেই ভাতের সঙ্গে প্রয়োজনীয় প্রোটিন, ভিটামিন, খনিজ ও অন্যান্য পুষ্টি না থাকলে তার স্বাভাবিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। ফলে খাদ্য নিরাপত্তার হিসাব শুধু গুদামে কত টন চাল আছে, তার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে দেখতে হবে শিশুর থালায়
এক্ষেত্রে সরকারের প্রথম কাজ হওয়া উচিত অপুষ্টিতে থাকা শিশুদের দ্রুত শনাক্ত করা। মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মী, কমিউনিটি ক্লিনিক, সরকারি হাসপাতাল ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে নিয়মিত শিশুর উচ্চতা-ওজন ও পুষ্টিগত অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা দরকার। ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের জন্য বিনামূল্যে বা ভর্তুকিমূল্যে প্রয়োজনীয় পরিপূরক খাবার নিশ্চিত করা যেতে পারে, বিশেষ করে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের শিশুদের তালিকা করে তাদের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা দিতে হবে।
স্কুল পর্যায়েও পুষ্টিকর খাবারের কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। দরিদ্র এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুলভিত্তিক পুষ্টিকর খাবার শুধু ক্ষুধা কমাবে না, স্কুলে উপস্থিতি ও শেখার সক্ষমতাও বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন নিশ্চিত না করলে পুষ্টি কর্মসূচির সুফলও পূর্ণাঙ্গ হবে না।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রাজনৈতিক অঙ্গীকার। শিশুর পুষ্টিকে প্রকল্পের বিষয় না বানিয়ে জাতীয় অগ্রাধিকারে পরিণত করতে হবে। বাজেটে বরাদ্দ থাকলেই হবে না; সেই অর্থ ঠিক শিশুর কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে।



