সম্পাদকীয়
আনন্দ অগ্নিদগ্ধ

কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীর টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০ জন পর্যটকের মর্মান্তিক মৃত্যু শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়; এটি আমাদের পর্যটন অবকাঠামোর নিরাপত্তাব্যবস্থা, অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীলতার প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে। কয়েক ঘণ্টার আগুনে ১০টি প্রাণ ঝরে গেছে, যার মধ্যে একই পরিবারের ছয়জন। একটি আনন্দভ্রমণ মুহূর্তেই পরিণত হয়েছে একাধিক পরিবারের আজীবনের কান্নায়। হৃদয়বিদারক এমন মৃত্যু যেন কোনো ব্যক্তি বা পরিবারের জীবনে না আসে।
অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এখনো তদন্তাধীন। প্রাথমিকভাবে শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই অাগুন থেকে রান্নাঘরের গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হলে আগুনের ভয়াবহতা আরও ছড়িয়ে পড়ে। একটি রিসোর্টে রান্নাঘরে চুলা বা গ্যাস সিলিন্ডার থাকা স্বাভাবিক। তবে যেসব প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই তা হলো— এমন স্থাপনায় অগ্নিনিরাপত্তার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল কি না, জরুরি বহির্গমনের ব্যবস্থা কেমন ছিল, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম কার্যকর ছিল কি না, অতিথিদের নিরাপদে বের করে আনার প্রশিক্ষিত লোকবল ছিল কি না এবং স্থাপনাটি আদৌ পর্যটকদের থাকার উপযোগী হিসেবে অনুমোদিত ছিল কি না।
রিসোর্টটি কাঠনির্ভর হওয়ায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। অধিকাংশ পর্যটক তখন ঘুমিয়ে ছিলেন। ফলে আগুন লাগার পর কয়েকজন ভেতরে আটকা পড়েন। এখানেই রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের নিরাপত্তাব্যবস্থার সক্ষমতা প্রশ্নবিদ্ধ। একটি আবাসিক পর্যটনকেন্দ্রে রাতযাপনের ব্যবস্থা থাকবে, অগ্নিকাণ্ডের মতো জরুরি পরিস্থিতিতে অতিথিদের দ্রুত বের করে আনার কার্যকর ব্যবস্থাও থাকতে হবে।
এই অগ্নিকাণ্ড আমাদের আরেকটি নির্মম বাস্তবতা দেখিয়ে দিয়েছে— দুর্যোগের পর আমরা তৎপর হই; কিন্তু দুর্যোগের আগে প্রস্তুতি নিতে ব্যর্থ হই। আগুন লাগার পর ফায়ার সার্ভিস ছুটে যায়, তদন্ত কমিটি গঠন ও মামলা করা হয়, শোকবার্তা আসে। কিন্তু আগুন লাগার আগে নিরাপত্তা পরীক্ষা কোথায় ছিল? বৈদ্যুতিক সংযোগ নিরাপদ কি না, রান্নাঘরের গ্যাসব্যবস্থা সঠিক কি না, জরুরি দরজা খোলা থাকে কি না— এসব পরীক্ষা নিয়মিত হওয়ার কথা।
এ ঘটনার পর শুধু কক্সবাজার নয়, সারা দেশের পর্যটনকেন্দ্রগুলোর রিসোর্ট ও হোটেলে জরুরি নিরাপত্তা অডিট করতে হবে। বিশেষ করে কাঠের তৈরি বা দাহ্য উপকরণে নির্মিত স্থাপনাগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। যেসব প্রতিষ্ঠানের অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নেই, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। শুধু মালিকের কাগজপত্র নয়— বাস্তবে জরুরি মুহূর্তে মানুষ বের হতে পারবে কি না, সেটিও পরীক্ষা করতে হবে।
নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করাও জরুরি। আহতদের চিকিৎসার দায়িত্বও নিতে হবে। ক্ষতিপূরণ কোনো প্রাণের মূল্য হতে পারে না; তবে এটি রাষ্ট্র ও দায়ী প্রতিষ্ঠানের নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্বের অংশ।
সবচেয়ে বড় কথা, এই ১০ মৃত্যু যেন আরেকটি সংবাদ হয়ে হারিয়ে না যায়। আজ তদন্ত কমিটি হবে, মামলা হবে, কয়েকজন গ্রেপ্তার হবেন— তারপর কিছুদিন পর সবকিছু আগের মতো চলবে— এমন পরিণতি আমরা দেখতে চাই না। তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হবে, দায়ীদের বিচার নিশ্চিত করতে হবে এবং তদন্তে যদি কোনো সরকারি কর্মকর্তার দায়িত্বে অবহেলা প্রমাণিত হয়, তাকেও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
কক্সবাজার দেশের বৃহৎ পর্যটন অঞ্চল। সেখানে পর্যটনকে নিরাপদ করতে হলে প্রথমেই অনুমোদনহীন ও অগ্নিঝুঁকিপূর্ণ কোনো পর্যটন স্থাপনায় পর্যটকের রাতযাপন চলবে না। ব্যবসার লাভের চেয়ে মানুষের জীবন বড়। পর্যটকের নিরাপত্তার বিনিময়ে কোনো ব্যবসার অনুমতি দেওয়া যায় না।
টুপটুপ রিসোর্টের আগুন তাই শুধু একটি ভবন পুড়িয়ে দেয়নি; এটি আমাদের ব্যবস্থাপনার গাফিলতি, তদারকির দুর্বলতা এবং ‘ঘটনার পর ব্যবস্থা নেওয়া’র সংস্কৃতিকে আবার সামনে দাঁড় করিয়েছে। ১০টি প্রাণের বিনিময়ে পাওয়া এই সতর্কবার্তা যদি আবারও উপেক্ষা করা হয়, তবে ভবিষ্যতের কোনো অগ্নিকাণ্ডে আরও প্রাণহানির দায় এড়ানোর সুযোগ থাকবে না।



