টাঙ্গাইলের নাগরপুর
একই আঙিনায় মন্দির-মসজিদ, ৫৬ বছর ধরে সম্প্রীতির বন্ধনে দুর্গাপূজা

ছবি: আগামীর সময়
একই আঙিনায় মসজিদ ও মন্দির। সেখানে চলছে দুর্গাপূজার আয়োজন। সাম্প্রদায়িক হানাহানি নয়, বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্প্রীতির বন্ধনে চলছে নিজ নিজ ধর্মের চর্চা। মসজিদে আজানের সময় মন্দিরে বন্ধ থাকে ঢাকঢোলসহ সব বাদ্যযন্ত্র। নামাজ শেষ হলে আবার শুরু হয় পূজার আয়োজন। প্রশাসনও বলছে, সম্প্রীতি অটুট রাখতে তারা সজাগ রয়েছে। সেখানে কোনো শঙ্কা নেই।
জানা যায়, টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলার নাগরপুর সদরে একই উঠানে প্রায় ৫৬ বছর ধরে মসজিদ ও মন্দিরের কার্যক্রম চলছে। নিজ নিজ ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ধুমধামের সঙ্গে পালন করলেও দুর্গাপূজার মতো বড় উৎসবেও মসজিদের আজানের সময় ঢাকঢোল ও আতশবাজিসহ সব ধরনের আয়োজন বন্ধ রাখা হয়।
নাগরপুর সদরের চৌধুরী বাড়িতে শ্রী পরেশ চন্দ্র ও শৈলেশ চন্দ্র প্রথমে দেবী দুর্গার মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। এর কয়েক বছর পর ১৯৬২ সালে একই উঠানে প্রতিষ্ঠিত হয় মুসলমানদের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ। সেই সময় থেকেই পাশাপাশি চলছে দুই ধর্মের মানুষের ধর্মীয় কার্যক্রম।
এ ছাড়া টাঙ্গাইলের ১২টি উপজেলায় ১ হাজার ৩৫৭টি মণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন চলছে। এর মধ্যে মির্জাপুর উপজেলায় সর্বোচ্চ ২৭০টি পূজামণ্ডপ রয়েছে। অন্যদিকে, দেলদুয়ার উপজেলায় সর্বনিম্ন ৩৪টি মণ্ডপ রয়েছে।
গণেশ চন্দ্র রায় জানান, মসজিদে আজানের পর মুসল্লিরা নামাজ আদায় করতে আসেন। এ সময় দেবী দুর্গার পূজার সব আয়োজন বন্ধ রাখা হয়। নামাজ শেষ হলে আবার শুরু হয় পূজার আনুষ্ঠানিকতা। এভাবেই ইসলাম ধর্মের ধর্মীয় কার্যক্রমের প্রতি সম্মান দেখিয়ে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা তাদের উৎসব পালন করেন। অন্যদিকে, মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষও তাদের ধর্মীয় কার্যক্রমে কোনো ধরনের বাধা সৃষ্টি করেন না।
স্থানীয়রা জানান, মসজিদে আজানের সময় হলেই মন্দিরে সব ধরনের বাদ্যযন্ত্র বন্ধ হয়ে যায়। এ জন্য কাউকে আলাদা করে কিছু বলতে হয় না। দুর্গাপূজায় ঢাকের আওয়াজ, আলোকসজ্জা আর ভক্তদের উপস্থিতিতে মুখর হয়ে ওঠে মন্দির। স্থানীয় মুসলিম ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ পরস্পরের আনন্দকে স্বাগত জানান।
সরেজমিন দেখা যায়, নাগরপুর সদরের চৌধুরী বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত মন্দিরটি এলাকার অন্যতম বড় মন্দির। একই বাড়ির আঙিনায় রয়েছে চৌধুরী বাড়ি কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ। সীমানা প্রাচীরের ভেতরে আঙিনার পশ্চিম পাশে মন্দির এবং পূর্ব পাশে মসজিদ। মসজিদের দক্ষিণ পাশে রয়েছে অজুর ব্যবস্থা।
চৌধুরী বাড়ি কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের পেশ ইমাম মাওলানা হুমায়ুন কবির জানান, দীর্ঘদিন ধরে একই আঙিনায় মসজিদ ও মন্দির রয়েছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ মন্দিরকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করেন। অন্যদিকে, স্থানীয় মুসলমানরা মসজিদকে কেন্দ্র করে নিজেদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করেন। এ নিয়ে কখনো কাউকে কিছু বলতে হয়নি। তারা একে অপরের সঙ্গে মিলেমিশে ধর্মীয় উৎসব পালন করেন।
পূজা উদ্যাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক ঝুনট কুমার সাহা জানান, হিন্দু সম্প্রদায়ের বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব পালনে যাতে কোনো ধরনের ব্যাঘাত না ঘটে, সেদিকে স্থানীয় মুসলমানেরা খেয়াল রাখেন। এই সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ুক, এমনটাই প্রত্যাশা তার। এতে সাম্প্রদায়িক হানাহানি রোধে ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে বলে তিনি মনে করেন।
নাগরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লিখন বণিক জানান, বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। চৌধুরী বাড়ি এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। একই আঙিনায় মসজিদ ও মন্দির রয়েছে। মুসলমানেরা নামাজ আদায় করেন, আর সনাতন ধর্মাবলম্বীরা পূজা উদ্যাপন করেন। বিগত বছরগুলোর মতো এ বছরও সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে পূজা উদ্যাপিত হচ্ছে।
টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার মুহাম্মদ শামসুল আলম সরকার জানান, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা। জেলায় ১ হাজার ৩৫৭টি পূজামণ্ডপে সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে পূজা উদ্যাপিত হচ্ছে। দুর্গাপূজা ঘিরে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি গোয়েন্দা তৎপরতাও বাড়ানো হয়েছে।
অন্যদিকে, নাগরপুরের চৌধুরী বাড়িতে একই আঙিনায় মসজিদ ও মন্দিরে নিজ নিজ ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করছেন দুই সম্প্রদায়ের মানুষ। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের এই দৃষ্টান্ত এলাকায় তৈরি করেছে এক অনন্য পরিবেশ।
টাঙ্গাইল-৬ (দেলদুয়ার-নাগরপুর) আসনের সংসদ সদস্য মো. রবিউল আওয়াল লাভলু আগামীর সময়কে বলেন, এ দেশে সংখ্যালঘু বলতে কিছু নেই, আমরা সবাই এ দেশের মানুষ। যার যার ধর্ম, সে সে পালন করবে। একই আঙিনায় পূজামণ্ডপে পূজা উদ্যাপন ও নামাজ আদায় করা হয়, এতে সমস্যা হয় না। আমরা সবাই মিলেমিশে, সম্প্রীতি ও ঐক্যবদ্ধভাবে বসবাস করছি।




