অনুতপ্ত নন গ্রেপ্তার আমিনী

গ্রেপ্তারের পর হাসিমুখে হত্যা মামলার প্রধান আসামি ফজলুল হক আমিনী, ছবি : আগামীর সময়
সাতক্ষীরার দেবহাটায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে ওয়াহিদুজ্জামান শামীম (৩৮) নামে এক যুবককে গণপিটুনিতে হত্যার মামলার প্রধান আসামি ফজলুল হক আমিনী (৪৫) নিজের ভূমিকার জন্য অনুতপ্ত নন বলে জানিয়েছেন।
গ্রেপ্তারের পর আজ রবিবার গণমাধ্যমের সামনে আমিনী বলেন, ‘আইনের দৃষ্টিতে আমি অপরাধী, আমি অনুতপ্ত নই।’
হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে দুর্ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, ‘পিটিয়ে মারার উদ্দেশ্য ছিল না, দুর্ঘটনাবশত হয়ে গেছে।’
নিজের কর্মকাণ্ডের বিষয়ে তিনি আরও বলেন, ‘যে কাজটি করছি, সেটি আল্লাহ পাক ফয়সালা করবেন।’
রবিবার বিকাল ৩টার দিকে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) গ্রেপ্তার আমিনীকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে। পরে বিকাল ৪টার দিকে তাকে আদালতে পাঠানো হয়।
এর আগে গতকাল শনিবার রাত ১১টার দিকে সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ উপজেলার কৃষ্ণনগর এলাকায় যৌথ অভিযান চালিয়ে আমিনীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ ও এসআরবি সদস্যরা। হত্যাকাণ্ডের পর থেকে তিনি আত্মগোপনে ছিলেন।
গ্রেপ্তারের পর শামীমের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগের বিষয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন আমিনী। তিনি দাবি করেন, আগে শামীম সম্পর্কে তাদের এমন ধারণা ছিল না। পরে বিভিন্ন দেশ থেকে ফোনে হুমকি পাওয়ার পর শামীম সম্পর্কে তার ধারণা তৈরি হয়। তবে এসব দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া গেছে কি না, তা জানা যায়নি।
দেবহাটা থানার ওসি এইচ এম শাহীন জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ফজলুল হক আমিনী শামীমকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার ইচ্ছাও প্রকাশ করেছেন।
ওসি আরও জানান, আমিনী স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে রাজি হওয়ায় আপাতত তাকে রিমান্ডে নেওয়ার প্রয়োজন মনে করছে না পুলিশ। তবে আদালতে তার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়েছে কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
যেভাবে গণপিটুনিতে মৃত্যু
গত মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) দেবহাটায় ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ তুলে ওয়াহিদুজ্জামান শামীমকে কয়েক দফায় গণপিটুনি দেওয়া হয়। পরিবারের দাবি, শামীম দীর্ঘদিন ধরে মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। তার সঙ্গে স্ত্রীর কথোপকথনের একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তার বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ ওঠে।
এর জেরে প্রথমে স্থানীয় একটি বাজারে তাকে মারধর করা হয়। পরে অসুস্থ অবস্থায় এক পল্লীচিকিৎসকের চেম্বারে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় একদল লোক তাকে টেনে-হিঁচড়ে বের করে আবারও মারধর করে।
খবর পেয়ে পুলিশ শামীমকে উদ্ধার করে দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। অভিযোগ রয়েছে, সেখানেও একদল উত্তেজিত লোক প্রবেশ করে তাকে মারধর করে। পরে গুরুতর আহত শামীমকে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।
মামলায় আসামি ২৬০ জনের বেশি
এ ঘটনায় নিহতের বড় ভাই আবদুল জলিল বাদী হয়ে দেবহাটা থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় ফজলুল হক আমিনীকে প্রধান আসামি করে ১০ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া অজ্ঞাতনামা ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার পর পুলিশ অভিযান চালিয়ে এজাহারভুক্ত আসামি মোক্তার হোসেন খান ও আসাদুল ইসলাম মোল্লাকে গ্রেপ্তার করে। সর্বশেষ প্রধান আসামি আমিনী গ্রেপ্তার হওয়ায় এ ঘটনায় মোট তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
অনিশ্চয়তায় নিহতের পরিবার
প্রধান আসামি গ্রেপ্তার হলেও নিহত শামীমের পরিবারের শোক ও উদ্বেগ কাটেনি। স্বামীকে হারিয়ে দুই শিশুসন্তানকে নিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে পড়েছেন তার স্ত্রী নাজমা খাতুন।
শামীমের ছোট ভাই তাওসিফ রহমান এর আগে গণমাধ্যমকে জানান, প্রধান আসামি গ্রেপ্তারের খবরে পরিবার কিছুটা স্বস্তি পেয়েছে। তবে হত্যাকাণ্ডে জড়িত সবাইকে দ্রুত গ্রেপ্তার করে সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
একই সঙ্গে বাবাহারা দুই শিশুর ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে সরকারের সহযোগিতা কামনা করেছেন পরিবারের সদস্যরা।
ধর্ম অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে সংঘটিত এ হত্যাকাণ্ডের তদন্ত অব্যাহত রেখেছে পুলিশ। ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
প্রধান আসামির অনুতপ্ত না হওয়ার বক্তব্যের পর হত্যাকাণ্ডে তার ভূমিকা ও দায় স্বীকারের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। তবে পুলিশের কাছে দেওয়া বক্তব্য এবং আদালতে আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য স্বীকারোক্তি এক বিষয় নয়। মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হবে তদন্তে পাওয়া সাক্ষ্য-প্রমাণ ও আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।





