চিকিৎসাসেবায় মেশিন লার্নিং

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ আল নাহিদের গবেষণার প্রধান উপকরণ একটি কম্পিউটার, গাণিতিক বিশ্লেষণ আর শিক্ষার্থীদের নিয়ে কাজ করার আগ্রহ। চিকিৎসাবিজ্ঞানের তথ্য বিশ্লেষণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেশিন লার্নিং নিয়ে তিনি গবেষণা করছেন।
খুবি থেকে ২০০৭ সালে স্নাতক শেষ করেন ড. নাহিদ। পরের বছরই বিশ্ববিদ্যালয়ে ইলেকট্রনিকস অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং ডিসিপ্লিনে শিক্ষকতা শুরু করেন। ২০১২ সালে অস্ট্রেলিয়ায় যান উচ্চশিক্ষার জন্য। ইউনিভার্সিটি অব সাউথ অস্ট্রেলিয়া থেকে টেলিযোগাযোগ বিষয়ে স্নাতকোত্তর করেন। এরপর ২০১৫ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ম্যাককুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করেন বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিকস প্রকৌশলে। সেখানে তার গবেষণার মূল বিষয় ছিল মেশিন লার্নিং।
২০১৮ সালে দেশে ফিরে গবেষণার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের গবেষণায় যুক্ত করার দিকে মনোযোগ দেন অধ্যাপক নাহিদ। তার গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র চিকিৎসা-সংক্রান্ত বিপুল তথ্য বিশ্লেষণ করে সেগুলোর মধ্যে নির্দিষ্ট ধরন বা বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করা। মেশিন লার্নিংয়ের সাহায্যে ক্যানসারের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং ক্যানসার নির্দেশ করে না— এমন তথ্যের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয়ের চেষ্টা করেন তিনি। এই প্রযুক্তিকে তিনি চিকিৎসকের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক একটি ব্যবস্থা হিসেবে দেখেন। তার তৈরি অ্যালগরিদম তথ্য বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য ফলাফল তুলে ধরতে পারে। চিকিৎসক সেই ফলাফল যাচাই করে নিজের অভিজ্ঞতা ও অন্যান্য পরীক্ষার সঙ্গে মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
ড. আব্দুল্লাহ আল নাহিদ মনে করেন, গবেষণার সাফল্য শুধু অ্যালগরিদমের নির্ভুলতার সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়। তথ্যের ভিত্তিতে কতটা নির্ভরযোগ্য ফল পাওয়া যাচ্ছে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে তা কতটা সহায়তা করছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে চিকিৎসা-সংক্রান্ত তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা, নিরাপত্তা ও নৈতিক অনুমোদন নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
তার কম্পিউটার নেটওয়ার্কে অনুপ্রবেশ শনাক্ত করার একটি গবেষণাপত্র প্রায় ৬৫০ বার উদ্ধৃত হয়েছে। এ ছাড়া মানুষের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড শনাক্ত করার তথ্যভাণ্ডার নিয়েও কাজ করেছেন তিনি। এসব গবেষণার মাধ্যমে তথ্যের ধরন শনাক্ত ও শ্রেণিবিন্যাসের বিভিন্ন পদ্ধতি নিয়ে কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন।
এলসেভিয়ার বিশ্বসেরা গবেষকের তালিকায় স্থান পাওয়াকে ইতিবাচক অর্জন হিসেবেই দেখেন ড. নাহিদ। তার গবেষণার স্বীকৃতি থাকলেও কাজ করতে গিয়ে নানা সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হতে হয় তাকে। আন্তর্জাতিক গবেষণাপত্র পড়ার জন্য প্রয়োজনীয় ডেটাবেজের সাবস্ক্রিপশন বা প্রবেশাধিকার তার নেই। ফলে কখনো বিদেশে থাকা সাবেক শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে গবেষণাপত্র সংগ্রহ করতে হয়। গবেষণার অর্থায়নও নিয়মিত নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি প্রকল্প থেকে সহায়তা পেয়েছেন ঠিকই; তবে নিজের অর্থ ব্যয় করেও কাজ চালিয়ে নিতে হয়েছে।
মেশিন লার্নিংয়ের গবেষণায় উন্নত কম্পিউটিং সুবিধার প্রয়োজনীয়তার কথা বললেন অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ আল নাহিদ। বর্তমানে ১৬ গিগাবাইটের একটি গ্রাফিকস প্রসেসিং ইউনিট ব্যবহার করতে পারছেন। আরও উন্নত সক্ষমতার যন্ত্র পেলে গবেষণার কাজে সুবিধা হতো বলে জানালেন। বাংলা ভাষায় চিকিৎসা-সংক্রান্ত তথ্য নিয়ে কাজের সুযোগ তৈরি করতে চান তিনি। তার তত্ত্বাবধানে কাজ করা কয়েকজন শিক্ষার্থী বিদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পিএইচডি করছেন। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন শিক্ষার্থীকে জাপানে মনবুশো বৃত্তি নিয়ে পড়ার সুযোগ করে দেওয়ার কথাও জানালেন তিনি।
৮০টির বেশি জার্নাল নিবন্ধ ও ৩০টির মতো সম্মেলনপত্র প্রকাশের অভিজ্ঞতা নিয়ে ড. নাহিদ এখন গবেষণার নতুন ক্ষেত্র খুঁজছেন। তার কাছে গবেষণা শুধু ব্যক্তিগত স্বীকৃতি অর্জনের পথ নয়; বরং সীমিত সুযোগের মধ্যেও নতুন জ্ঞান তৈরি করা এবং পরবর্তী প্রজন্মের গবেষকদের এগিয়ে নেওয়ার একটি ধারাবাহিক প্রচেষ্টা।



