বিনামূল্যে আমিনুলের কৃষিসেবা

সমন্বিত কৃষি ক্লিনিকে আসা এক কৃষককে পরামর্শ দিচ্ছেন আমিনুল
ধানক্ষেতে পোকা ধরায় আপন (৪০) হাজির হয়েছেন ‘সমন্বিত কৃষি ক্লিনিকে’। আপন ধানগাছের পাতা দেখিয়ে সমস্যার কথা জানাতেই আমিনুল ইসলাম (৫০) সঠিক কীটনাশক প্রয়োগের পদ্ধতি বুঝিয়ে দিলেন।
আপনের মতো দিনে অনেক কৃষক বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আমিনুল ইসলামের গড়া সমন্বিত কৃষি ক্লিনিকে আসেন। সেখানে ১২ বছর ধরে আমিনুল কৃষক ও খামারিদের বিনামূল্যে কৃষিসেবা দিয়ে যাচ্ছেন। সম্প্রতি দিনাজপুর সদর উপজেলার সুন্দরবন গ্রামে আমিনুলের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির মূল ফটকের কাছেই একটি কক্ষে আমিনুলের সমন্বিত কৃষি ক্লিনিক। যেখানে বসে তিনি কৃষকদের সমস্যার কথা শুনে পরামর্শ দেন। তিনি কক্ষ জুড়ে সাজিয়ে রেখেছেন কৃষি-সংক্রান্ত বিভিন্ন বই। কৃষকরা চাইলে সেই বইও পড়তে পারেন।
এ ছাড়া তার সেই কক্ষে রয়েছে মাইক্রোস্কোপ, বীজ শোধনযন্ত্র, মাটি-পানি পরীক্ষার সরঞ্জাম, পশু চিকিৎসার যন্ত্রপাতি, বিভিন্ন রকম ওষুধ ও জৈব বালাইনাশক সরঞ্জাম। এ ছাড়া আঙিনায় গবাদি পশুর চিকিৎসার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়েছে।
সমন্বিত কৃষি ক্লিনিকে আমিনুল রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমিয়ে আনতে নিজেই প্রস্তুত করছেন সাধারণ জৈব সার, কেঁচো সার, ট্রাইকো কম্পোস্ট ও অণুজীব সার। এসব সার জমিতে ব্যবহারের উপকারিতা তুলে ধরে তিনি কৃষকদের বিভিন্ন সময় প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন।
১২ বছর ধরে এখান থেকে সেবা পাওয়ায় কৃষক-খামারিদের ভরসা এবং আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছে আমিনুলের কৃষি ক্লিনিক। কৃষি বিষয়ে আমিনুল সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে অর্ধশতাধিক প্রশিক্ষণ নিয়েছেন।
আমিনুল ১৯৯৯ সালে ঠাকুরগাঁও যুব উন্নয়ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রাণী, মৎস্য, ফসল উৎপাদন ও প্রাথমিক চিকিৎসা বিষয়ে তিন মাসের প্রশিক্ষণ নিয়ে এলাকায় শুরু করেন পশুর চিকিৎসা। এরপর ধীরে ধীরে তিনি কৃষি নিয়েও কাজ শুরু করেন। ২০১৭ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্ল্যান্ট প্যাথলজি বিভাগের প্ল্যান্ট ডিজিজ ডায়াগনস্টিক ক্লিনিকে বিভিন্ন বিষয়ে মোট ২১ দিন প্রশিক্ষণ নেন। সেখান থেকে সনদ ও স্বীকৃতিপত্রও দেওয়া হয় তাকে। এ ছাড়া তিনি কৃষি-সংক্রান্ত প্রায় ১০০টির বেশি প্রশিক্ষণ নিয়েছেন।
আমিনুলের কাছে পুকুরে মাছ মরার কারণ জানতে এসেছিলেন স্থানীয় চাষি আবুল মিয়া (৩৮)। তার সমস্যার কথা শুনে পুকুরে ছুটে যান আমিনুল। সেখানে গিয়ে পানি পরীক্ষা করে অ্যামোনিয়া গ্যাসের মাত্রা বেশি দেখতে পান। সঙ্গে সঙ্গে মাছচাষিকে তিনি সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেন।
মাছচাষি আবুল মিয়া বললেন, ‘তার কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে অনেক উপকৃত হয়েছি। তিনি সঠিক পরামর্শ দিয়ে আমাদের পাশে থাকেন।’
সমন্বিত কৃষি ক্লিনিকের বিষয়ে আমিনুল আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘কৃষকরাই আমাদের দেশের সম্পদ। অথচ আমরা তাদের অবহেলা করি। কৃষকরা একটু সহযোগিতা পেলেই উৎপাদনে পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারেন। আমার কৃষি ক্লিনিকে বিনামূল্যে কৃষকদের পরামর্শ দিই। এতে তারা উপকৃত হচ্ছেন– যতদিন বেঁচে আছি ততদিন কৃষকদের পাশে থাকতে চাই।’
দিনাজপুর সদরের সুন্দরবন ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. মোতাহার আলীর ভাষ্য, আমিনুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে প্রান্তিক কৃষকদের বিনামূল্যে কৃষিসেবা দিয়ে যাচ্ছেন। তার কৃষি পরামর্শে কৃষকরা অনেক উপকৃত হচ্ছেন। এ ছাড়া তিনি কৃষকদের রাসায়নিক সার ব্যবহার কমিয়ে জৈব সার ব্যবহারে উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছেন। তার এমন উদ্যোগে কৃষকরা বেশ খুশি।



