সুশাসনের বীজ বপন করতে হবে প্রাথমিক শিক্ষায়

একটি দেশের সামগ্রিক ও টেকসই উন্নয়ন কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বিশাল অবকাঠামোগত উন্নয়ন কিংবা উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহারের ওপর নির্ভর করে না; বরং একটি জাতির আসল শক্তি লুকিয়ে থাকে তার জনগণের নৈতিক মূল্যবোধ, সততা, দায়িত্ববোধ ও সামাজিক আচরণের পরিশীলতার মধ্যে। আইন ও প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো হয়তো সুশাসনের বাইরের একটি সুনির্দিষ্ট কঙ্কাল বা কাঠামো তৈরি করে দেয়, কিন্তু সেই কাঠামোকে সচল, প্রাণবন্ত ও জনকল্যাণমুখী রাখতে অত্যন্ত জরুরি নৈতিকতাসম্পন্ন ও সচেতন নাগরিক।
সমাজে দুর্নীতি প্রতিরোধ করা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা, সর্বস্তরে সামাজিক ন্যায়বিচার জোরদার করা এবং সুস্থ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ বিকাশে প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থাকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়া এখন সময়ের দাবি। শৈশবের শিক্ষা বিষয়ক ও পারিবারিক পরিবেশ শিশুর ভবিষ্যৎ চিন্তা, জীবনদর্শন ও বৈচিত্র্যময় সামাজিক আচরণ গঠনে গভীর প্রভাব ফেলে। এই প্রারম্ভিক বয়সে শেখা সততা, ন্যায়পরায়ণতা, সহমর্মিতা, শৃঙ্খলা, অন্যের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ তার পুরো জীবনের স্থায়ী ভিত্তি তৈরি করে। নীতি-নৈতিকতা ও নাগরিক সচেতনতার চর্চা তাই পাঠ্যবইয়ের কেবল কয়েকটি নির্দিষ্ট অধ্যায়ে সীমাবদ্ধ রাখার বিষয় নয়; এটি একটি সুসংগঠিত, সমৃদ্ধ, ন্যায়ভিত্তিক ও দুর্নীতিমুক্ত ভবিষ্যৎ সমাজ গঠনের সবচেয়ে দূরদর্শী এবং কার্যকর জাতীয় বিনিয়োগ।
বাংলাদেশের সংবিধানে আইনের শাসন, সমতা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও নাগরিকের মৌলিক অধিকারের বিষয়গুলো সুস্পষ্টভাবে স্বীকৃত ও প্রতিষ্ঠিত। তবে কেবল আইন প্রণয়ন কিংবা শাস্তির ভয় দেখিয়ে একটি সমাজে স্থায়ী ও ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন প্রতিটি নাগরিকের হৃদয়ে আইন মান্য করার সহজাত সংস্কৃতি এবং অন্যের অধিকারকে সম্মানের চোখে দেখার সুস্থ মানসিকতা তৈরি করা। পরীক্ষার খাতায় অসদুপায় অবলম্বন করা, পরিচিতি বা প্রভাব খাটিয়ে অন্যায্য সুবিধা নেওয়া, সারিবদ্ধ লাইনে না দাঁড়িয়ে নিয়ম ভাঙা, সরকারি সম্পদের অপচয় করা কিংবা ব্যক্তিগত স্বার্থে সাধারণ আইন অমান্য করার মতো বিষয়গুলোকে অনেকেই সাধারণ চোখে ছোটখাটো অপরাধ মনে করেন। কিন্তু বাস্তবিকভাবে এসব আপাতক্ষুদ্র আচরণই ধীরে ধীরে গোটা সমাজে নিয়মভঙ্গ, স্বজনপ্রীতি ও অনৈতিকতাকে একটি স্বাভাবিক সংস্কৃতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে তোলে।
শিশুদের শৈশব থেকেই সুস্পষ্টভাবে বোঝাতে হবে যে অন্যায় বা অনৈতিক উপায়ে অর্জিত কোনো সাফল্যই প্রকৃত সাফল্য হতে পারে না। নৈতিক শিক্ষা মানে কেবল বড়দের কথা অন্ধভাবে মেনে চলা নয়; বরং নিজের বুদ্ধি ও বিবেক দিয়ে সঠিক ও ভুলের পার্থক্য করতে শেখা, যুক্তিনির্ভর সিদ্ধান্ত নেওয়া, অন্যের দৃষ্টিভঙ্গি অনুধাবন করা এবং নিজের ভুল কাজের দায়িত্ব নিজে নেওয়া। প্রশ্ন করার স্বাধীনতা অর্জন করা এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ জানিয়ে সত্য ও ন্যায্যতার পক্ষে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ানোর সাহস তৈরি করাই হলো আদর্শ নাগরিকত্বের প্রকৃত ভিত্তি।
প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের উপযোগী করে একটি সমন্বিত ও সুগঠিত ‘নীতি-নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও নাগরিক শিক্ষা’ কাঠামো রূপায়ণ করা অত্যন্ত জরুরি। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে পাঠ্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত সততা, সত্যবাদিতা, পারস্পরিক সহমর্মিতা, ভাগাভাগি করার মানসিকতা, পরিচ্ছন্নতা এবং শ্রেণিকক্ষে সহপাঠীদের প্রতি পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ। তৃতীয় শ্রেণিতে শিশুদের অধিকার ও কর্তব্য, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং দৈনন্দিন জীবনে নিয়ম মানার গুরুত্ব সম্পর্কে বাস্তবসম্মত ধারণা দেওয়া যেতে পারে। চতুর্থ শ্রেণিতে সামাজিক দায়িত্ববোধ, সড়ক নিরাপত্তা, পরিবেশ রক্ষা, পাবলিক প্রপার্টি বা জনসম্পদের সুরক্ষা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গুজব বা ভুল তথ্যের কুফল সম্পর্কে সচেতনতা অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। এরপর পঞ্চম শ্রেণিতে গিয়ে গণতন্ত্রের মূলনীতি, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা, আইনের শাসন, দুর্নীতিবিরোধী চেতনা এবং নাগরিক অংশগ্রহণের প্রাথমিক ধারণা যুক্ত করা দরকার।
আমাদের দেশের পরিবেশগত প্রেক্ষাপটও এই শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত; যেমন বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন ও পরিবেশদূষণের মতো প্রাকৃতিক চ্যালেঞ্জগুলো শিক্ষার্থীদের পরিবেশগত নাগরিকত্ব শেখানোর সেরা মাধ্যম। একই সাথে ছেলে-মেয়ে, ধনী-দরিদ্র, বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায় ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের সমান মর্যাদা ও সুযোগ দেওয়ার শিক্ষা আমাদের সমাজে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও বৈষম্যহীন অন্তর্ভুক্তি সুদৃঢ় করবে।
নৈতিক শিক্ষা যদি কেবল পাঠ্যবইয়ের তত্ত্ব ও মুখস্থবিদ্যার মধ্যে আবদ্ধ থাকে, তবে বাস্তবে তার কোনো ইতিবাচক প্রতিফলন দেখা যায় না। নৈতিকতার পুঁথিগত সংজ্ঞা মুখস্থ করে পরীক্ষায় বেশি নম্বর পাওয়ার অর্থ এই নয় যে শিশুটি বাস্তব জীবনে সৎ আচরণ করবে। তাই প্রথাগত মুখস্থ পদ্ধতির বদলে বাস্তব জীবনের নানান উদাহরণ, অনুপ্রেরণাদায়ী গল্প বলা, দলগত আলোচনা, ভূমিকাভিনয় এবং বাস্তব সমস্যা সমাধানের মতো অংশগ্রহণমূলক শিখন পদ্ধতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের ভূমিকা এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল। শিক্ষক যদি নিজে সততা, নিরপেক্ষতা, ন্যায্যতা ও সমতার প্রতিচ্ছবি হন এবং প্রতিটি শিক্ষার্থীর অনুযোগ ও মতামত মনোযোগ দিয়ে শোনেন, তবেই পাঠ্যবইয়ের নীতিবাক্যগুলো শিক্ষার্থীদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য ও রূপায়ণযোগ্য হয়ে ওঠে। অন্যদিকে, বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বৈষম্য কিংবা অন্যায্য কোনো আচরণ দেখলে শিশুদের মনে নৈতিক শিক্ষা সম্পর্কে দ্বিধা তৈরি হয়। বিদ্যালয়ে ছোট আকারের ‘শিশু সংসদ’ বা শ্রেণি প্রতিনিধি নির্বাচনের ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে, যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা ছোটবেলা থেকেই নিজেদের সমস্যা নিয়ে আলোচনা, গণতান্ত্রিক ভোটাভুটি এবং যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা অর্জন করবে। এটি তাদের মনে নেতৃত্ব ও জবাবদিহিতার ভিত্তি গেঁথে দেবে। পাশাপাশি প্রতি মাসে বৃক্ষরোপণ, শ্রেণি ও বিদ্যালয় পরিচ্ছন্ন রাখা কিংবা পানির অপচয় রোধ করার মতো সামাজিক কাজে যুক্ত থাকা শিক্ষার্থীদের দায়িত্বশীল করে তোলে।
একটি কার্যকর ও নৈতিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে শিক্ষক, পরিবার ও সমাজের সমন্বিত এবং ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা অত্যন্ত আবশ্যক। শিক্ষকদের বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে তারা কোনো রকম মানসিক চাপ প্রয়োগ না করে আনন্দদায়ী ও ব্যবহারিক উপায়ে এই বিষয়গুলো শিক্ষার্থীদের কাছে উপস্থাপন করতে পারেন। শিক্ষকদের জন্য তৈরিকৃত নির্দেশিকায় ব্যবহারিক কৌশল, শিক্ষণীয় গল্প ও ক্রিয়াভিত্তিক মূল্যায়ন পদ্ধতি যুক্ত করতে হবে। তবে এই প্রক্রিয়ায় পরিবারের ভূমিকা কোনো অংশে কম নয়, কারণ শিশুরা মূলত তাদের পিতামাতা ও গৃহের বড়দের আচরণ পর্যবেক্ষণ করেই প্রথম পাঠ গ্রহণ করে। অভিভাবকেরা যদি নিজেরা ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধারে মিথ্যা বলেন, ট্রাফিক নিয়ম অমান্য করেন কিংবা অনিয়মকে সমর্থন জানান, তবে বিদ্যালয়ের নৈতিক শিক্ষাও সেখানে বাধাগ্রস্ত হয়। তাই অভিভাবক সভাগুলোতে পরিবারে নৈতিক পরিবেশ বজায় রাখার গুরুত্ব গভীরভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠন ও গণমাধ্যমও সচেতনতা বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে। নীতি-নৈতিকতার মতো সংবেদনশীল বিষয়ের মূল্যায়ন কখনোই প্রথাগত লিখিত পরীক্ষার নম্বরের মাধ্যমে করা উচিত নয়। বরং শ্রেণিকক্ষে শিশুর দৈনন্দিন আচরণ, সহপাঠীদের প্রতি সহমর্মিতা, দলগত কাজে অংশগ্রহণ এবং বিদ্যালয়ের সম্পদ রক্ষার প্রতি তার সচেতনতা পর্যবেক্ষণ করে তার বিকাশকে উৎসাহিত করা উচিত।
আজকের যে শিশুটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে খেলাধুলা ও পড়াশোনা করছে, আগামী দিনে সে-ই দেশের চালিকাশক্তি হিসেবে বিভিন্ন পেশায় নেতৃত্ব দেবে। শৈশব থেকেই যদি তাদের মনে সততা, ন্যায়বোধ, মানবিক সহমর্মিতা, জবাবদিহিতা ও নাগরিক দায়িত্বের মজবুত ভিত্তি তৈরি করে দেওয়া যায়, তবে একটি দুর্নীতিমুক্ত, বৈষম্যহীন ও সমৃদ্ধ ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠন আর কখনো স্বপ্ন থাকবে না।
দেশপ্রেম মানে কেবল আবেগী স্লোগান নয়; আইনকে সম্মান করা, সরকারি সম্পদের সঠিক ব্যবহার করা এবং সমাজের সর্বস্তরের মানুষের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ করাই হলো প্রকৃত দেশপ্রেম। ঠিক তেমনি, সততা কেবল একটি ভালো উপদেশ নয়, বরং ব্যক্তিগত সুবিধা ও সুযোগ থাকা সত্ত্বেও অন্যায় থেকে বিরত থাকার দৃঢ় মানসিকতাই হলো সততা। নৈতিক শিক্ষা নিশ্চিতভাবেই একদিনে সমাজের সব দুর্নীতি ও অনিয়ম দূর করে দেবে না, তবে নৈতিক শিক্ষায় বেড়ে ওঠা একজন সচেতন ও ন্যায়পরায়ণ নাগরিক যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে শক্তিশালী সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেন। আগামী দিনের বাংলাদেশকে বিশ্বমঞ্চে মর্যাদাপূর্ণ, মানবিক ও দায়িত্বশীল রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে হলে পরিবর্তনের সেই মৌলিক বীজটি বপন করতে হবে আজকের শিশুর মনে এবং তার সূচনা হতে হবে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণ থেকেই।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, হাজারীবাগ সরকারি কলেজ, ঢাকা



