অসুস্থদের ঠিকানা তাজুলের বৃদ্ধাশ্রম

বৃদ্ধাশ্রমের বাসিন্দা এক নারীকে খাইয়ে দিচ্ছেন তাজুল ইসলাম
করোনাকালে ভবঘুরে মানুষদের খাবার দিতেন তাজুল ইসলাম ও তার বন্ধুরা। সেসময় রাস্তার পাশে অনেক অসুস্থ ও মানসিক ভারসাম্যহীনকে দেখতে পেতেন তারা। চিকিৎসার অভাবে কয়েকজন মারাও যান সেসময়। এসব দেখেই ২০২১ সালে তাদের আশ্রয়ের জন্য তাজুল গড়ে তোলেন আদর্শ নিবাস বৃদ্ধাশ্রম। অসুস্থদের উদ্ধারের পর হাসপাতালে চিকিৎসা করিয়ে এ পর্যন্ত ৪৭ জনকে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে এই বৃদ্ধাশ্রমে।
২০২১ সালে বরিশাল সদর উপজেলার তালতলী শফীর গ্যারেজ এলাকায় গড়ে ওঠা আদর্শ নিবাস বৃদ্ধাশ্রমের পরিচালক হাফেজ তাজুল ইসলাম বলছিলেন, ‘যখন এই বৃদ্ধাশ্রম চালু করা হয়, তখন মাত্র চারজন মানসিক ভারসাম্যহীন ছিলেন। এখন পর্যন্ত আশ্রয় নেওয়া ৪৭ জনের মধ্যে ২৬ জনকে তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বর্তমানে বৃদ্ধাশ্রমে ১৪ জন রয়েছেন, তাদের মধ্যে ৯ জন নারী।’
‘আমরা যখন তাদের উদ্ধার করে নিয়ে আসি, তখন অবস্থা খুব একটা ভালো থাকে না। বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা করিয়ে তারপর বৃদ্ধাশ্রমে নিয়ে আসা হয়। তাদের খাবার খাইয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে সব ধরনের সেবা দেওয়া হয়। এখানে একজন স্বেচ্ছাসেবী নার্স রয়েছেন, যিনি তাদের চিকিৎসার দিকে খেয়াল রাখেন’— যোগ করেন তিনি।
তাজুল জানালেন, বৃদ্ধাশ্রমে আব্দুল মজিদ নামে ভারতের চেন্নাইয়ের এক বাসিন্দাও রয়েছেন। তাকে ২০২৪ সালের ১৫ আগস্ট বৃদ্ধাশ্রমে নিয়ে আসা হয়। তার চুলের জট ছিল প্রায় পা পর্যন্ত। মজিদ এখন শারীরিকভাবে সুস্থ রয়েছেন।
তিনি বললেন, ‘গত ৯ সেপ্টেম্বর একজনকে উদ্ধার করেছিলাম, তার অবস্থা অত্যন্ত খারাপ ছিল। চার দিনের মাথায় তিনি মারা যান।’
তাজুল উল্লেখ করেন, বর্তমানে শফীর গ্যারেজ এলাকায় ৩২ শতাংশ সরকারি খাসজমিতে শারীরিকভাবে অসুস্থ এবং মানসিক ভারসাম্যহীনদের নিয়ে এই বৃদ্ধাশ্রমের কার্যক্রম চলছে। সরকারি বা ব্যক্তি পর্যায়ের সহায়তা তেমন পাওয়া যায় না। তাজুলের ভাষ্য, ‘আমরা ২৭ জন বন্ধু রয়েছি। তারাই প্রতি মাসে নির্ধারিত অঙ্কের টাকা দিয়ে এই বৃদ্ধাশ্রম পরিচালনা করি। কেউ ২ হাজার, কেউ ৫০০ টাকা আবার কেউ ৩ হাজার টাকা দিয়ে থাকে।’
তাজুল ইসলাম চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদ্রাসায় দাওরায়ে হাদিস বিভাগে পড়াশোনা করছেন। বরিশাল নগরীর বেলতলার বাসিন্দা তাজুলের পরিবারে রয়েছে বাবা, মা, দুই ভাই ও এক বোন।
স্থানীয় বাসিন্দা সাইদ মেমন বলেছেন, তাজুল যেভাবে মানসিক ভারসাম্যহীন বৃদ্ধদের সেবা করছেন, তা মনে হয় অনেকে নিজের বাবা-মায়ের জন্যও করেন না। নিজে কোলে করে হাসপাতালে নিয়ে যান চিকিৎসার জন্য, আবার তাজুলই তাদের খাবার খাইয়ে দেন। এই বৃদ্ধাশ্রমের জন্য আরও সাহায্য-সহযোগিতা দরকার। সহায়তা পেলে আরও শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ রোগীদের এখানে আশ্রয় দেওয়া যাবে। বরিশাল সমাজসেবা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক সাজ্জাদ পারভেজ বলেছেন, ‘তাজুলের বৃদ্ধাশ্রমের জন্য খাসজমি দেওয়া হয়েছে। তারপরও আরও কী সহায়তা করা যায়, সেই বিষয়টি আমরা দেখব।’



