ঔষধি গাছে আয় ও আয়ু : ১৬ গ্রামের ১০ হাজার মানুষের ভাগ্যবদল

নাটোরে মাঠের পর মাঠে চাষ হচ্ছে অ্যালোভেরা
চারদিকে সবুজ। মাঠের পর মাঠে চাষ হচ্ছে অ্যালোভেরা। পাশের জমিতে শতমূলী, ঘৃতকাঞ্চন, শিমুলমূল, অশ্বগন্ধা ও রোজেলা। বাড়ির উঠানেও রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির ঔষধি গাছ। এসব ভেষজ উদ্ভিদ ঘিরেই গড়ে উঠেছে নাটোরের লক্ষ্মীপুর ও খোলাবাড়িয়া ইউনিয়নের ১৬ গ্রামের মানুষের জীবন-জীবিকা। স্থানীয়ভাবে ঔষধি গ্রাম নামে পরিচিত এই পল্লীতে ভেষজ চাষ, প্রক্রিয়াজাত, বিপণন ও পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন প্রায় ১০ হাজার মানুষ। বছরে প্রায় ১০০ কোটি টাকার বাণিজ্য হচ্ছে এখানে।
একসময় অভাব-অনটনে থাকা এসব গ্রামের মানুষের কাছে ভেষজ চাষ এখন প্রধান অর্থকরী কর্মকাণ্ড। এই চাষের ওপর ভর করে অনেক কৃষক হয়েছেন স্বাবলম্বী। কেউ চাকরি ছেড়ে ফিরেছেন গ্রামে, কেউ আবার কৃষিকাজে যুক্ত হয়ে গড়ে তুলেছেন নিজের ব্যবসা।
নাটোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, এ এলাকায় প্রায় ১৫৫ হেক্টর জমিতে ভেষজ উদ্ভিদের চাষ হয়। এর মধ্যে ৭৫ হেক্টরে অ্যালোভেরা, ৫০ হেক্টরে শিমুলমূল এবং বাকি ৩০ হেক্টরে অন্যান্য ভেষজ উদ্ভিদ চাষ করা হয়। বছরে এখানে প্রায় ১৫ হাজার টন অ্যালোভেরা উৎপাদিত হয়। সব মিলিয়ে এলাকায় চাষ হয় প্রায় ১৫০ প্রজাতির ঔষধি উদ্ভিদ।
অ্যালোভেরা এখানকার প্রধান উৎপাদিত ভেষজ পণ্য। প্রতিদিন ট্রাকে করে এসব পাতা দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়। ওষুধ, প্রসাধনী, জুস ও শরবত তৈরিতে কাঁচামাল হিসেবে অ্যালোভেরার চাহিদা রয়েছে। ময়মনসিংহের ভালুকায় অবস্থিত তাইওয়ান সিন লিন এন্টারপ্রাইজও এখানকার অ্যালোভেরার বড় ক্রেতা। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ভেষজ কাঁচামাল প্রক্রিয়াজাত করে তৈরি পণ্যের কিছু অংশ বিদেশেও রপ্তানি হয়।
ভেষজ পল্লীর গোড়াপত্তন কবিরাজ আফাজ উদ্দিন পাগলার হাত ধরে। ১৯৯৫ সালের দিকে খোলাবাড়িয়ায় নিজের বসতবাড়ির আশপাশে বিভিন্ন প্রজাতির ঔষধি গাছের চাষ শুরু করেন তিনি। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগ্রহ করতেন এসব গাছের চারা ও বীজ। তার উদ্যোগ দেখে আশপাশের গ্রামের মানুষও ভেষজ চাষে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। ধীরে ধীরে তা ছড়িয়ে পড়ে গ্রাম থেকে গ্রামে।
আফাজ উদ্দিন মারা গেছেন। তবে তার দেখানো পথে ভেষজ চাষ করে এলাকার অনেক পরিবারে ফিরেছে সচ্ছলতা। তাদের একজন সৌরভ হোসেন। ঢাকায় একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করতেন তিনি। পরে সেই চাকরি ছেড়ে গ্রামে ফিরে শুরু করেন অ্যালোভেরা চাষ। এখন তার দুই বিঘা জমিতে এই ভেষজ উদ্ভিদ চাষ হচ্ছে।
সৌরভ হোসেনের ভাষায়, অ্যালোভেরার যত্ন ও পরিচর্যা করলে ভালো ফলন পাওয়া যায়। দামও মোটামুটি ভালো। পাতা বিক্রি করেই তার সংসার চলে। তার মতো এলাকার অনেক তরুণ বিভিন্ন ভেষজ উদ্ভিদ চাষ করে আয় করছেন।
অ্যালোভেরার পাশাপাশি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে রোজেলা চাষ। ২০১৭ সালে প্রথম রোজেলা চাষ শুরু করেন শহিদুল ইসলাম। এ বছর তিনি দুই একর জমিতে এই উদ্ভিদ চাষ করেছেন। তার চাষ দেখে স্থানীয় আরও অনেক কৃষক রোজেলা উৎপাদনে আগ্রহী হয়েছেন।
শুধু ভেষজ উদ্ভিদ উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ নেই এই পল্লীর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। কাঁচামাল প্রক্রিয়াজাত করে বাজারজাত করার কাজেও যুক্ত হয়েছেন অনেকে। লক্ষ্মীপুর বাজারের ভেষজ পণ্যের ব্যবসায়ী মোবারক হোসেন তাদের একজন। তিনি জানালেন, নিজেদের উৎপাদিত ভেষজ উদ্ভিদ প্রক্রিয়াজাত করে গুঁড়া ও হালুয়া তৈরি করেন। এসব পণ্য দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করেন তিনি।
নাটোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক হাবিবুল ইসলামের ভাষ্য, ভেষজ উদ্ভিদ চাষের মাধ্যমে ১৫-১৬ গ্রামের প্রায় ১০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। এখানকার উৎপাদিত ভেষজ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয়। অ্যালোভেরা এখানকার অন্যতম প্রধান উৎপাদিত পণ্য, যা শরবতসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্য তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
তার মতে, ভেষজ উদ্ভিদ সংরক্ষণে গবেষণা বাড়ানো এবং কৃষকদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনা গেলে উৎপাদন আরও বাড়ানো সম্ভব। অবশ্য এক্ষেত্রে কৃষকদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে কৃষি বিভাগ।



