ছুটির পাঠ
তেল যেদিন হয়ে উঠল বিশ্বরাজনীতির অস্ত্র

ছবি: এআই
১৯৭৩ সালের এক শীতের সকালে যুক্তরাষ্ট্রের একটি পেট্রল পাম্পে গাড়ির দীর্ঘ সারি। চালকরা অপেক্ষা করছেন, কখন তাদের গাড়ির ট্যাংকে কিছু পেট্রল ভরা যাবে। কারও কর্মস্থলে, কারও স্কুলে সন্তানকে পৌঁছে দেওয়ার তাড়া। তবে সবার সামনে একই অনিশ্চয়তা, পেট্রল মিলবে তো?
যুক্তরাষ্ট্রে গাড়ি অনেকটাই ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রতীক। কিন্তু সেই গাড়ি চালানোর জ্বালানি জোগাড় করাই তখন ছিল দুশ্চিন্তার কারণ। কোথাও জ্বালানি কেনায় বিধিনিষেধ, কোথাও পাম্প বন্ধ। কয়েক মাস আগেও যা ছিল স্বাভাবিক জীবনযাত্রার অংশ, সেটিই হঠাৎ হয়ে উঠেছে দুর্লভ।
গল্পটা শুরু হয়েছিল একটি যুদ্ধ দিয়ে। তবে সেই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় অভিঘাত পড়েছিল বিশ্ববাজারে। সেখানে অস্ত্র ছিল না, ছিল তেল। আর তেলের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে আরব দেশগুলো দেখিয়ে দিয়েছিল, সামরিক শক্তিতে পিছিয়ে থেকেও বিশ্বরাজনীতিতে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করা যায়।
১৯৭৩ সালে কয়েক মাসে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় চার গুণ বেড়ে যায়। পশ্চিমা অর্থনীতি পড়ে যায় গভীর গাড্ডায়। শিল্পের উৎপাদন ব্যাহত হয়, পরিবহন ব্যয় বাড়ে, মূল্যস্ফীতি ছড়িয়ে পড়ে। তেল তখন আর জ্বালানি থেকে হয়ে ওঠে রাজনৈতিক ক্ষমতার হাতিয়ার।
যুদ্ধের ময়দান থেকে তেলের বাজারে
১৯৭৩ সালের ৬ অক্টোবর। ইহুদিদের ধর্মীয় উৎসব ইয়ম কিপুরের দিন মিসর ও সিরিয়ার বাহিনী ইসরায়েলের ওপর আক্রমণ চালায়। ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধে হারানো ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারের লক্ষ্য ছিল এ হামলার অন্যতম প্রেক্ষাপট। শুরু হয় ইয়ম কিপুর যুদ্ধ।
যুদ্ধের গতিপথ দ্রুত বদলাতে থাকে। ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা দিতে এগিয়ে আসে যুক্তরাষ্ট্র। ১৪ অক্টোবর থেকে দেশটি ইসরায়েলে ব্যাপক সামরিক সরঞ্জাম পাঠানোর বিমান অভিযান শুরু করে। আরব দেশগুলোর কাছে এ সহায়তা ছিল স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা—ওয়াশিংটন শুধু কূটনৈতিকভাবে নয়, সামরিকভাবেও ইসরায়েলের পাশে দাঁড়িয়েছে।
এর জবাব দিতে আরব তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো এমন একটি পথ বেছে নেয়, যা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির সঙ্গে সরাসরি পাল্লা না দিয়েও দেশটিকে চাপে ফেলতে পারে।
১৬ অক্টোবর তেল উৎপাদনকারী (ওপেক সদস্যভুক্ত) পারস্য উপসাগরীয় ছয়টি দেশ তেলের ঘোষিত মূল্য প্রায় ৭০ শতাংশ বাড়িয়ে ব্যারেলপ্রতি ৩.০১ ডলার থেকে ৫.১২ ডলারে নিয়ে যায়। পরদিন ১৭ অক্টোবর, আরব পেট্রোলিয়াম রপ্তানিকারক দেশগুলোর সংগঠন ওপেক ঘোষণা করে, ইসরায়েল অধিকৃত ভূখণ্ড থেকে সরে না আসা এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত প্রতি মাসে তেল উৎপাদন অন্তত ৫ শতাংশ করে কমানো হবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক সহায়তা দেওয়া দেশগুলোর বিরুদ্ধে পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার হুমকিও দেওয়া হয়।
এরপর ১৯ অক্টোবর তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ইসরায়েলকে ২২০ কোটি ডলারের জরুরি সামরিক সহায়তা দেওয়ার জন্য কংগ্রেসের কাছে অর্থ বরাদ্দ চান। এর পরপরই ওপেকের আরব সদস্যরা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তেল নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করে। নেদারল্যান্ডসসহ ইসরায়েলকে সমর্থনকারী আরও কয়েকটি দেশও নিষেধাজ্ঞার আওতায় আসে।
আরব দেশগুলোর লক্ষ্য ছিল, তেলের সরবরাহকে রাজনৈতিক চাপের হাতিয়ার বানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যনীতি পরিবর্তনে বাধ্য করা।
প্রথম দিকে ওয়াশিংটন নিষেধাজ্ঞার বাস্তব প্রভাবকে খুব একটা পাত্তা দেয়নি। কিন্তু উৎপাদন কমতে থাকায় এবং বাজারে সরবরাহের অনিশ্চয়তা বাড়ায় পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব তেল উৎপাদনে অতিরিক্ত সক্ষমতা কম ছিল; ফলে আমদানি ব্যাহত হলে ঘাটতি পূরণের সুযোগও সীমিত হয়ে পড়ে। ইউরোপ ও জাপানের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতিগুলোও চাপের মুখে পড়ে।
১৯৭৪ সালের জানুয়ারিতে তেলের ঘোষিত মূল্য ব্যারেলপ্রতি ১১.৬৫ ডলারে পৌঁছায়, নিষেধাজ্ঞার আগের ২.৯০ ডলারের তুলনায় যা প্রায় চার গুণ। মার্চে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হলেও তেলের উচ্চমূল্য থেকে যায়।
এই সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক তাৎপর্য ছিল সুদূরপ্রসারী। আরব দেশগুলো দেখিয়ে দিল, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সামরিক সংঘাতে না গিয়েও তার অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব। যে সম্পদের ওপর নির্ভর করে চলে শিল্প, পরিবহন ও বাণিজ্য, তার সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করেই প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করা যায়।
তেলের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে?
১৯৭৩ সালের সংকটের পেছনে শুধু যুদ্ধ ছিল না। এর আগে থেকেই বৈশ্বিক তেলবাজারে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলাচ্ছিল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিম ইউরোপের অর্থনীতি দ্রুত বড় হতে থাকে। শহর সম্প্রসারিত হয়, মহাসড়ক তৈরি হয়, গাড়ির ব্যবহার বাড়ে। শিল্পকারখানা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন— সব ক্ষেত্রেই তেলের চাহিদা বাড়ছিল। সস্তা জ্বালানির ওপর ভর করেই গড়ে উঠেছিল আধুনিক শিল্পোন্নত বিশ্বের একটি বড় অংশ।
কিন্তু যে দেশগুলো তেল ব্যবহার করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করছিল, তাদের অনেকেরই নিজস্ব উৎপাদন চাহিদা মেটানোর জন্য যথেষ্ট ছিল না। বিশেষ করে পশ্চিম ইউরোপকে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে তেল আমদানি করতে হতো। যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব উৎপাদন থাকলেও ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে আমদানির ওপর নির্ভরতাও বাড়ছিল।
অন্যদিকে, তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর চেষ্টা করছিল। ১৯৬০ সালে প্রতিষ্ঠিত ওপেকের লক্ষ্য ছিল সদস্যদেশগুলোর স্বার্থ রক্ষা এবং আন্তর্জাতিক তেলবাজারে তাদের প্রভাব বাড়ানো। সত্তরের দশকে এসে সেই প্রচেষ্টা আরও জোরালো হয়।
তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর ভূখণ্ডে সম্পদ থাকলেও তার বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিন পশ্চিমা তেল কোম্পানিগুলোর প্রভাব ছিল। ধীরে ধীরে উৎপাদনকারী দেশগুলো সেই ব্যবস্থায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে থাকে। তেলের মূল্য নির্ধারণ, উৎপাদনের পরিমাণ এবং রপ্তানির সিদ্ধান্তে তাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
১৯৭৩ সালের সংকট এ পরিবর্তনকে বিশ্ববাসীর সামনে স্পষ্ট করে দেয়। পশ্চিমা দেশগুলো বুঝতে পারে, শিল্প ও সামরিক শক্তিতে এগিয়ে থাকা মানেই সব ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকা নয়। অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে যে জ্বালানি প্রয়োজন, তার সরবরাহ অন্য দেশের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করতে পারে।
সেই সময়ের কূটনৈতিক আলোচনাতেও তেলের এ ক্ষমতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। ১৯৭৩ সালের ১৪ ডিসেম্বর সৌদি আরবে বাদশাহ ফয়সালের সঙ্গে বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার তেলকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের কার্যকারিতা নিয়ে মন্তব্য করেন।
কিসিঞ্জার বলেছিলেন, আরব দেশগুলো সতর্কতার সঙ্গে তেলের অস্ত্র ব্যবহার করলে তা কার্যকর হতে পারে, তবে অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করলে তা হিতে বিপরীতও হতে পারে। তার আশঙ্কা ছিল, নিষেধাজ্ঞা দীর্ঘায়িত হলে যুক্তরাষ্ট্রের জনমত ইসরায়েলের বদলে আরব দেশগুলোর বিরুদ্ধেও চলে যেতে পারে।
কিসিঞ্জারের এ বক্তব্যের তাৎপর্য ছিল দ্বিমুখী। একদিকে, যুক্তরাষ্ট্র স্বীকার করছিল যে তেলের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব। অন্যদিকে, তেলের অস্ত্র ব্যবহারের সীমাবদ্ধতাও সামনে আসছিল। উৎপাদনকারী দেশগুলো প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলতে পারলেও দীর্ঘমেয়াদে নিজেদের বাজার ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষতি করার ঝুঁকি ছিল।
পেট্রল পাম্পের লাইন থেকে মন্দা
তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার অভিঘাত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে। তেল শুধু গাড়ি চালানোর জ্বালানি নয়; কৃষি, শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন, পণ্য পরিবহন এবং অসংখ্য পেট্রোকেমিক্যাল পণ্যের উৎপাদনের সঙ্গেও এটি জড়িত। ফলে তেলের দাম বাড়লে তার প্রভাব পড়ে গোটা সরবরাহব্যবস্থায়।
যুক্তরাষ্ট্রে সংকটের সবচেয়ে পরিচিত দৃশ্য হয়ে ওঠে পেট্রল পাম্পের সামনে গাড়ির দীর্ঘ সারি। জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়। কোথাও সরবরাহ সীমিত করা হয়, কোথাও চালকদের জ্বালানি ব্যবহারে সংযমী হতে বলা হয়। গাড়িনির্ভর সমাজে পেট্রলের ঘাটতি শুধু যাতায়াতের সমস্যা ছিল না; এটি হয়ে উঠেছিল দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ওপর সরাসরি আঘাত।
ইউরোপেও পরিস্থিতি ছিল কঠিন। বিশেষ করে ব্রিটেন তখন শিল্পসংঘাত ও জ্বালানি সমস্যার মুখে পড়ে। কয়লাখনির শ্রমিকদের ধর্মঘট এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের সীমাবদ্ধতার মধ্যে ১৯৭৪ সালে সরকার বাণিজ্যিক খাতের বিদ্যুৎ ব্যবহার কমাতে তিন দিনের কর্মসপ্তাহ চালু করে। এই পদক্ষেপের পেছনে শুধু তেলসংকট নয়, কয়লা ও বিদ্যুৎ সরবরাহের সমস্যাও ছিল। তবু বৃহত্তর জ্বালানি সংকটের প্রতীক হয়ে ওঠে এই ব্যবস্থা।
তেলের মূল্যবৃদ্ধি একই সঙ্গে উৎপাদন ব্যয় ও ভোক্তামূল্য বাড়ায়। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বেশি খরচে উৎপাদন চালাতে হয়। অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদন কমায়, কর্মী ছাঁটাই করে কিংবা নতুন বিনিয়োগ স্থগিত রাখে। অন্যদিকে পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়।
এই পরিস্থিতিতে পশ্চিমা অর্থনীতিগুলো এমন এক সমস্যার মুখে পড়ে, যার সমাধান সহজ ছিল না। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দুর্বল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মূল্যস্ফীতি ও বেকারত্বের চাপও বাড়ছিল। অর্থনীতির এই জটিল পরিস্থিতি পরিচিতি পায় স্ট্যাগফ্লেশন নামে— অর্থাৎ দুর্বল প্রবৃদ্ধির সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতির সহাবস্থান।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের সিদ্ধান্তের সঙ্গে হাজার হাজার মাইল দূরের মানুষের সংসার খরচের সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়।
এটাই ছিল তেলকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের সবচেয়ে বড় শক্তি। এর আঘাত কোনো একটি সরকার বা সামরিক স্থাপনায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। ছড়িয়ে পড়েছিল পুরো অর্থনীতিতে।
প্রথম সংকটের পরও কেন কাটল না নির্ভরতা?
১৯৭৩ সালের অভিজ্ঞতা পশ্চিমা দেশগুলোকে একটি কঠিন শিক্ষা দিয়েছিল। জ্বালানির সরবরাহ নিশ্চিত করা শুধু বাণিজ্যিক বিষয় নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তারও অংশ। কোনো যুদ্ধ বা রাজনৈতিক বিরোধের কারণে তেলের সরবরাহ ব্যাহত হলে তার প্রভাব সামরিক প্রস্তুতি থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
এই উপলব্ধি থেকেই জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার উদ্যোগ জোরদার হয়। ১৯৭৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ)। শিল্পোন্নত দেশগুলোর মধ্যে জ্বালানি নীতির সমন্বয়, জরুরি পরিস্থিতিতে তেলের সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতের সংকট মোকাবিলায় যৌথ প্রস্তুতি গড়ে তোলা ছিল এর গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য।
দেশগুলো তেলের মজুদ বাড়ানো, জ্বালানি ব্যবহারে দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বিকল্প উৎস খোঁজার দিকে মনোযোগ দেয়। কিন্তু নীতি বদলানো আর অর্থনীতির কাঠামো বদলানো এক বিষয় নয়। পরিবহনব্যবস্থা, শিল্পকারখানা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের অবকাঠামো রাতারাতি পরিবর্তন করা সম্ভব ছিল না। ফলে সংকটের তাৎক্ষণিক অভিঘাত কমলেও তেলের ওপর নির্ভরতা থেকে যায়।
১৯৭৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে জ্বালানি সংকটের গুরুত্ব বোঝাতে বলেন, যুদ্ধ প্রতিরোধের পর এটি তার দেশের সামনে থাকা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় তিনি যে জাতীয় প্রচেষ্টার কথা বলেন, সেটিকে আখ্যা দেন ‘যুদ্ধের নৈতিক সমতুল্য’ বলে।
কার্টারের ভাষায়, ‘এই কঠিন প্রচেষ্টা হবে যুদ্ধের নৈতিক সমতুল্য’— তবে ধ্বংস করার বদলে সবাই একসঙ্গে গড়ে তোলার জন্য কাজ করবে।
তার বক্তব্যে উঠে এসেছিল সংকটের গভীরতা। ১৯৭৩ সালের পেট্রল পাম্পের লাইন উঠে গেলেও সমস্যার সমাধান হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরতা, অভ্যন্তরীণ উৎপাদন কমে যাওয়া এবং আমদানি বেড়ে যাওয়াকে তিনি দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার জন্য ঝুঁকি হিসেবে তুলে ধরেন।
কার্টারের এই সতর্কবার্তা দেখিয়ে দেয়, প্রথম তেলসংকটের কয়েক বছর পরও যুক্তরাষ্ট্র সমস্যাটিকে সাময়িক ঘাটতি হিসেবে দেখছিল না। এটি ছিল দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন। তেলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো, জ্বালানি সাশ্রয় এবং বিকল্প উৎসের উন্নয়ন তাই রাষ্ট্রীয় নীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছিল।
কিন্তু এসব উদ্যোগের পরও সমস্যার মূল জায়গাটি দূর হয়নি। জ্বালানি অবকাঠামো বদলাতে সময় লাগে, শিল্পব্যবস্থাকে নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়, আর বিকল্প শক্তির জন্য প্রয়োজন বড় বিনিয়োগ। ফলে বিশ্ব কিছুটা প্রস্তুত হলেও তেলের বাজারের অস্থিরতা থেকে মুক্ত হতে পারেনি।
১৯৭৯: আবারও তেলের বাজারে আতঙ্ক
১৯৭৯ সালে ইরানের বিপ্লব মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে দেয়। দীর্ঘদিনের শাসক শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির পতন ঘটে। দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থা আমূল পরিবর্তিত হয়। বিপ্লবের সময় ধর্মঘট ও অস্থিরতায় ইরানের তেল উৎপাদন ব্যাহত হয়, কমে যায় রপ্তানিও।
ইরান তখন বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর একটি। ফলে দেশটির উৎপাদন কমে যাওয়ার খবর আন্তর্জাতিক বাজারে উদ্বেগ ছড়িয়ে দেয়। সরবরাহের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, আর ভবিষ্যতে আরও ঘাটতি দেখা দিতে পারে—এমন আশঙ্কা বাজারকে অস্থির করে তোলে।
তেলের দাম আবার বাড়তে শুরু করে। সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগের পাশাপাশি মজুত গড়ে তোলার প্রবণতা এবং বাজারের আতঙ্ক মূল্যবৃদ্ধিকে আরও তীব্র করে। ১৯৭৩ সালের সংকটের কয়েক বছর পর বিশ্ব আবারও বুঝতে পারে, জ্বালানির বাজারে রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব কতটা গভীর হতে পারে।
দুটি সংকট অবশ্য এক ছিল না। ১৯৭৩ সালে আরব দেশগুলোর রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও উৎপাদন কমানোর সিদ্ধান্ত ছিল কেন্দ্রীয় বিষয়। ১৯৭৯ সালে ইরানের বিপ্লবের ফলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল বড় কারণ। কিন্তু দুটির ফলাফলে একটি মিল ছিল—তেলের ওপর নির্ভরশীল বিশ্ব অর্থনীতি আবারও বড় ধাক্কার মুখে পড়েছিল।
এতে স্পষ্ট হয়ে যায়, প্রথম সংকটের পর নেওয়া পদক্ষেপগুলো জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়ালেও সমস্যার মূল জায়গাটি দূর করতে পারেনি। তেলের সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে তার প্রভাব সামাল দেওয়ার মতো বিকল্প তখনও যথেষ্ট ছিল না।
সত্তরের দশকের এই দুই সংকট তাই পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। প্রথমটি দেখিয়েছিল, তেলকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা যায়। দ্বিতীয়টি দেখিয়েছিল, বিশ্ব অর্থনীতি সেই অস্ত্রের আঘাত থেকে নিজেকে পুরোপুরি রক্ষা করতে পারেনি।
অর্ধশতক গেল, কিন্তু একই প্রশ্ন থেকে গেল
সত্তরের দশকের সেই সংকটের পর অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে গেছে। প্রযুক্তির উন্নতি হয়েছে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বেড়েছে, অনেক দেশ নিজেদের জ্বালানির উৎস বহুমুখী করার চেষ্টা করেছে। তবু তেল এখনও বিশ্বরাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ।
পরিবহন, বিমান চলাচল, জাহাজ, শিল্প উৎপাদন এবং পেট্রোকেমিক্যাল খাতের সঙ্গে এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে তেলের। ফলে তেল উৎপাদনকারী অঞ্চলে যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা কিংবা সরবরাহপথে নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হলে তার প্রভাব বিশ্ববাজারে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
তবে সত্তরের দশকের মতো পরিস্থিতি প্রতিটি সংকটে হুবহু ফিরে আসে না। বিশ্ব তেলবাজারের কাঠামো বদলেছে, নতুন উৎপাদনকারী দেশগুলোর উত্থান ঘটেছে, কৌশলগত মজুত গড়ে উঠেছে। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য শক্তি ও বিদ্যুতায়ন জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর নতুন সুযোগ তৈরি করেছে।
তবু জ্বালানি রূপান্তর সহজ নয়। তেলের বিকল্প তৈরি করতে সময় ও বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন। পরিবহন ও শিল্পের অনেক খাতে এখনও তেলের ওপর নির্ভরতা রয়ে গেছে। ফলে সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে অর্থনীতিতে তার অভিঘাত পড়ার আশঙ্কাও থেকে যায়।
১৯৭৩ সালে আরব দেশগুলো দেখিয়েছিল, একটি প্রাকৃতিক সম্পদের নিয়ন্ত্রণ কীভাবে রাজনৈতিক ক্ষমতায় রূপ নিতে পারে। ১৯৭৯ সালে ইরানের বিপ্লব দেখিয়েছিল, সেই নির্ভরতা থেকে মুক্ত হওয়া কতটা কঠিন। আর এই দুই অভিজ্ঞতা মনে করিয়ে দেয়, জ্বালানি নিরাপত্তা শুধু পর্যাপ্ত তেল মজুত রাখার বিষয় নয়; বরং এমন একটি অর্থনীতি গড়ে তোলার প্রশ্ন, যা একটি উৎস বা একটি অঞ্চলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল নয়।
সত্তরের দশকে পেট্রল পাম্পের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো হয়তো বিশ্বরাজনীতির ক্ষমতার সমীকরণ নিয়ে ভাবছিলেন না। তাদের কাছে জরুরি ছিল গাড়িতে তেল ভরা, কাজে পৌঁছানো, সংসার চালানো। কিন্তু তাদের দৈনন্দিন দুর্ভোগই দেখিয়ে দিয়েছিল, রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি ও বিশ্ববাজারের সিদ্ধান্ত কীভাবে সাধারণ মানুষের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
দিন তেলের দাম বেড়েছিল কয়েক গুণ। কিন্তু তার চেয়েও বড় পরিবর্তন ঘটেছিল বিশ্বকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিতে। পশ্চিমা শক্তিগুলো বুঝেছিল, সামরিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্য থাকলেও জ্বালানির মতো গুরুত্বপূর্ণ সম্পদের জন্য অন্যের ওপর নির্ভরশীলতা তাদের দুর্বল করে দিতে পারে। আর তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো বুঝেছিল, তাদের হাতে থাকা সম্পদ শুধু অর্থ উপার্জনের মাধ্যম নয়, হয়ে উঠতে পারে আন্তর্জাতিক রাজনীতির অস্ত্র।
তথ্যসূত্র: আইইএ, এনার্জি হিস্ট্রি, মিলার সেন্টার, ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব শিকাগো, গভইনফো, এনওয়াইটি, গার্ডিয়ান, বিবিসি









