ঋণের ভার

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেশ জুড়ে এখন আলোচিত বিষয় বাজেট। বাজেটের বহুমুখী দিকের পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকও সামনে এসেছে, সেটা হলো সরকারের ঋণ পরিশোধের বিষয়। দেশে সব অামলেই সরকার উন্নয়নযাত্রা গতিশীল রাখতে বৈদেশিক ঋণের ওপর অনেকটা নির্ভর করে থাকে। দেশের নানা অবকাঠামো যেমন— সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সড়ক ইত্যাদি নির্মাণের জন্য ঋণ গ্রহণ করা হয়।
গতকাল শনিবারের ‘আগামীর সময়’-এ উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে বৈদেশিক ঋণের আসল পরিশোধে সরকারের ব্যয় হয়েছে ২৬১ কোটি ৪০ লাখ ডলার বা প্রায় ৩১ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকা। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এর পরিমাণ বেড়ে ৩১৯ কোটি ৬০ লাখ ডলার বা প্রায় ৩৮ হাজার ৩৫২ কোটি টাকায় পৌঁছতে পারে। পরের বছরগুলোয় এই চাপ আরও বাড়বে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৩৭৭ কোটি ৮০ লাখ ডলার, ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ৪২৩ কোটি ৮০ লাখ ডলার এবং ২০২৮-২৯ অর্থবছরে ৪২৭ কোটি ৬০ লাখ ডলার আসল পরিশোধ করতে হতে পারে।
বর্তমান সরকার কৃচ্ছ্রসাধন নীতি গ্রহণ ও উন্নয়ন ব্যয় কমানোর পরও ঋণের বোঝা হালকা হয়নি; বরং ক্ষমতা গ্রহণের সময় যে দায়ভার ছিল, তা আরও বেড়েছে। উন্নয়ন ব্যয় কমানো সত্ত্বেও ঋণ কমেনি। এর অর্থ, পরিচালন ব্যয় ও সুদ পরিশোধের চাপ এখন সরকারি অর্থব্যবস্থার কেন্দ্রীয় সংকট।
আগামী কয়েক বছরে এই ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধে সরকারের ওপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে, তা বলা বাহুল্য। ঋণের মেয়াদপূর্তি, বিভিন্ন ঋণের রেয়াতকাল শেষ হওয়া এবং ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের জন্য বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের ব্যয় দ্রুত বাড়ছে। সরকারের নিজস্ব নীতিপত্রেও এই ঝুঁকির কথা আছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধ দেশের অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
নিয়মানুযায়ী বিদেশি সংস্থা বা কোনো দেশের কাছ থেকে নেওয়া ঋণ চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত সময়েই সরকারকে পরিশোধ করতে হয়। তাই প্রতি বছর ঋণের কিস্তি, সুদ এবং অন্যান্য বৈদেশিক দায় পরিশোধের জন্য আলাদা অর্থ বরাদ্দ রাখার নিয়ম। শুধু বৈদেশিক ঋণ নয়, দেশীয় ঋণ পরিশোধেও সরকার সাংবিধানিকভাবে বাধ্য। এর জন্য পূর্বপ্রস্তুতি থাকা দরকার। বৈদেশিক ঋণ নেওয়ার আগে যে প্রকল্পে অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে, তা থেকে প্রত্যাশিত ফল আসবে কি না, অবশ্যই যাচাই করে দেখা জরুরি। প্রকল্প থেকে কাঙ্ক্ষিত আয় বা অর্থনৈতিক সুফল না এলে সেই ঋণের বোঝা অর্থহীনভাবে শেষ পর্যন্ত জনসাধারণের ওপর বর্তায়।
বিগত দুই দশকে বাংলাদেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিল চোখে পড়ার মতো। এই অগ্রগতির একটি বড় অংশই অর্জিত হয়েছে অভ্যন্তরীণ এবং বৈদেশিক ঋণের ওপর ভর করে। সেই ঋণ এখন বিশাল বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু দেশের বর্তমান ঋণ পরিস্থিতি সাম্প্রতিক শ্রীলঙ্কার মতো বিপজ্জনক স্তরে পৌঁছায়নি। তবে প্রকাশিত সংবাদকে ‘সতর্কসংকেত’ বলা যায়। সময়োচিত সংস্কার, পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনা, রাজস্ব অায় বৃদ্ধি, ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের মাধ্যমে আর্থিক ঘাটতি পূরণ করে ঋণ পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। ভবিষ্যতে যাতে আর বিপুল পরিমাণে বৈদেশিক ঋণ নিতে না হয়, সেই পরিকল্পনা মতো দেশকে এগিয়ে নেওয়াই সময়ের চাহিদা।


