কিরণের আলো

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমাজের অনেক পুরনো প্রাচীন বিষয়গুলো হারিয়ে যাচ্ছে। অনেক অভ্যাস, আচার, প্রথা এখন আর কেউ চর্চা করে না। কিন্তু সমাজের প্রাচীন ব্যাধি হিসেবে যৌতুকপ্রথা এখনো বহাল তবিয়তে টিকে আছে। উল্লেখ্য, ইসলামের বিধানে কোথাও বলা নেই, কনেপক্ষকে বর বা বরপক্ষকে যৌতুক দিতে হবে। বরং নিয়ম আছে, বর বা বরপক্ষ কনেকে বিয়ের সময় গয়না, পরিধেয় বস্ত্রসহ নির্ধারিত মোহরানা উপঢৌকন হিসেবে দেবে। এটা বরের পক্ষে অবশ্যকর্তব্য। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, অধিকাংশ ধর্মপ্রাণ বাঙালি মুসলমানের এ বিষয়ে তেমন আগ্রহ নেই। বরং বিপরীতক্রমে কনের বাবার কাছ থেকে গলা বেঁধে যৌতুক আদায়ে তাদের প্রবল উৎসাহ। যে দেশের অধিকাংশ লোক মুসলমান এবং তারা নিজেদের ধর্মপ্রাণ বলে দাবি করেন, সেখানে কী করে যুগের পর যুগ ধরে এ অনাচার টিকে থাকে— সেটা একটা প্রশ্ন। এ নিকৃষ্ট প্রথার কারণে কত হত্যা ও আত্মহত্যার ঘটনা জড়িয়ে আছে, কত নারী ও তার পিতা-মাতার অশ্রু ঝরছে, তার ইয়ত্তা নেই। এই অশ্রুমোচনের তাগিদ থেকেই এগিয়ে এসেছেন কিরণ শংকর দে।
যৌতুকবিরোধীয় প্রচারণায় তিনি কাজ করছেন প্রায় ৩০ বছর। মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে শুরুতে তিনি বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় যৌতুক, নারী নির্যাতন, বাল্যবিয়ে নিয়ে যেসব সংবাদ ছাপা হতো, সেগুলো থেকে শিক্ষণীয় ও সচেতনতামূলক তথ্য সংগ্রহ করতেন। সেসব তথ্যসংবলিত পোস্টার-লিফলেট ছাপিয়ে রাস্তায় বিলি করতেন হেঁটে হেঁটে। একসময় কাগজের ঠোঙা বানিয়ে দোকানে দোকানে বিক্রি করতেন। যা আয় হতো, তা থেকে যৌতুকবিরোধী পোস্টার, লিফলেট ও স্থানীয় পত্রিকায় বিজ্ঞাপন ছাপাতেন। বৃহস্পতিবার এ বিষয়ে ‘আগামীর সময়’-এ একটি বিশেষ প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে।
বাংলাদেশে প্রথম যৌতুকবিরোধী আইন পাস হয় ১৯৮০ সালে (যৌতুক নিরোধ আইন, ১৯৮০)। পরে সময়ের চাহিদায় আইনটি সংশোধন ও যুগোপযোগী করে যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৮ প্রণয়ন করা হয়। কিন্তু অাইন করা হলেও সমাজে এর প্রভাব খুব একটা পড়েনি। পত্রিকার পাতা খুললে খবর পাওয়া যায় প্রায় প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবারে নারীরা হচ্ছেন যৌতুকের শিকার। আইন সম্পর্কে অজ্ঞতা, আইনের কঠোর প্রয়োগ ও শাস্তি না হওয়া, ধর্ম ও সামাজিক নেতাদের একপেশে দৃষ্টিভঙ্গি, যৌতুকের কুফল নিয়ে প্রচার-প্রচারণায় ঘাটতি, নারীশিক্ষা ও ক্ষমতায়নের মাত্রা কম ইত্যাদি কারণে আইনের কার্যকারিতা নেই। এমতাবস্থায় সমাজপতি ও রাজনৈতিক নেতাদের উচিত ছিল এ নিয়ে ক্রুসেড ঘোষণা করে সমাজ থেকে এ ব্যাধি নির্মূলের উদ্যোগ নেওয়া। কিন্তু তাদের সে সময় কোথায়?
সব কাজ পাশে রেখে কিরণ শংকর এখনো রাস্তায়, বিভিন্ন দোকানে, লঞ্চ ও বাস টার্মিনাল, মানুষের ঘরে ঘরে লিফলেট বিলি করার পাশাপাশি যৌতুকের বিরুদ্ধে সবাইকে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানাচ্ছেন; উদ্বুদ্ধ করছেন যৌতুকবিরোধী আইন মেনে চলতে। কিরণকে আমরা স্যালুট জানাই। আমরা চাই, এই অসাধারণ মানুষটির মহৎ কর্মযজ্ঞের আলো ছড়িয়ে পড়ুক সবখানে।
কাজটা কিন্তু কিরণের একার নয় এবং এভাবে একার লড়াইয়ে সমাজ থেকে এ ব্যাধি দূর করা যাবে না। এর সঙ্গে যদি সরকারের বিভিন্ন যন্ত্র সক্রিয় অংশ নেয়, রাজনৈতিক নেতারা, আলেম সমাজ, সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মানুষ সম্পৃক্ত হন, তাহলে কিছু সুফল আশা করা যায়। বিশেষ কর্মসূচি নিয়ে যৌতুকের বিরুদ্ধে যদি তারা সোচ্চার হন, তবেই কিরণের স্বপ্নপূরণ ও লড়াই সার্থক হবে।




