কিরণের যৌতুকবিরোধী লড়াই

পথে পথে যৌতুকবিরোধী লিফলেট বিতরণ করেন কিরণ শংকর দে । ছবি: আগামীর সময়
৩০ বছর আগে কিরণ শংকর দে যে লড়াই শুরু করেছিলেন, সেটি থামেনি আজও। এখনো পথে পথে লিফলেট বিলি করেন যৌতুকের বিরুদ্ধে মানুষকে সচেতন করতে। মরণোত্তর দেহ দান করেছেন মানুষের কল্যাণে।
স্ত্রী, তিন মেয়ে জয়া, রিয়া, কান্তা আর ছেলে অলককে নিয়ে কিরণের সংসার। ১৯৯৫ সালে মেজো মেয়ে রিয়ার জন্মের পরই যৌতুক নিয়ে ভাবনাটা চেপে ধরে তাকে। মানবেতর জীবনযাপন করা কিরণ ভাবেন, এত টাকা যৌতুক দিয়ে মেয়েকে বিয়ে দেবেন কীভাবে? সিদ্ধান্ত নেন, যৌতুকের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলার।
কিরণ শংকর দের জন্ম ১৯৬২ সালে। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের বাপ্পী চত্বর এলাকার ভাড়া বাসায় বসবাস করেন তিনি। ১৯৭২ সালের ২৫ ডিসেম্বর ঘরে আগুন লেগে বাবা মধুসূদন দে-মা পারুল রানী দে ও এক বোন মারা যাওয়ার পর থেকে অনাদর-অবহেলায় বড় হয়েছেন কিরণ। এসএসসি পাস করেছেন শহরের জয় গোবিন্দ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে। বর্তমানে কাজ করেন একজন ডাক্তারের সহকারী হিসেবে।
কিরণ শংকর দে জানালেন, মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে শুরুতে তিনি বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় যৌতুক, নারী নির্যাতন, বাল্যবিয়ে নিয়ে যেসব সংবাদ ছাপা হতো, সেগুলো থেকে শিক্ষণীয় ও সচেতনতামূলক তথ্য সংগ্রহ করতেন। এসব তথ্যসংবলিত পোস্টার-লিফলেট ছাপিয়ে রাস্তায় বিলি করতেন হেঁটে হেঁটে। একসময় কাগজের ঠোঙা বানিয়ে দোকানে দোকানে বিক্রি করতেন তিনি। যা আয় হতো, তা থেকে যৌতুকবিরোধী পোস্টার, লিফলেট ও স্থানীয় পত্রিকায় বিজ্ঞাপন ছাপাতেন। এখনো রাস্তায়, বিভিন্ন দোকানে, লঞ্চ টার্মিনাল, বাস টার্মিনাল, মানুষের ঘরে ঘরে লিফলেট বিলি করার পাশাপাশি যৌতুকের বিরুদ্ধে সবাইকে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান; উদ্বুদ্ধ করেন যৌতুকবিরোধী আইন মেনে চলতে।
কিরণ জানালেন, এ কাজ করতে গিয়ে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েছেন। অভাবের সংসারে এমন কাজ করা মোটেও সহজ নয়। যখন হাতে টাকা থাকত না, বাসার টুকটাক জিনিসপত্র বিক্রি করে, কখনো স্ত্রীর স্বর্ণালংকার বিক্রি করে, মেয়েদের টিউশনির টাকা সরিয়ে যৌতুকবিরোধী প্রচার চালিয়েছেন। স্ত্রী-সন্তানরা তখন কষ্ট পেয়ে জিজ্ঞাসা করেছেন, এসব করে আমি কী ফল পাব? অনেকে এসব নিয়ে হাসিঠাট্টা করতেন। কিন্তু আমি কাজ চালিয়ে গেছি। ওই সময়ে তিনটি মেয়েকে নিয়ে কী যে পরিস্থিতি ছিল আমার... এ কথা বলেই ডুকরে কেঁদে ওঠেন কিরণ।
‘তিন মেয়েকে যৌতুক ছাড়া বিয়ে দিতে না পারলে আমার আত্মহত্যা করতে হতো! এই আন্দোলনে নামার কারণেই হয়তো সৃষ্টিকর্তার কৃপায় আমি তাদের বিনা যৌতুকে ভালো পরিবারে বিয়ে দিতে পেরেছি। গরিব মানুষের আসলে খুব বেশি কিছু করার থাকে না’—বলছিলেন কিরণ।
যৌতুকের বিরুদ্ধে আমৃত্যু প্রচার চালিয়ে যেতে চান কিরণ। মানুষ যৌতুকের বিরুদ্ধে আরও অনেক বেশি সচেতন হবেন— এটাই তার প্রত্যাশা। যৌতুকের কারণে যেন আর একটি প্রাণও না ঝরে, তা চান তিনি।
কিরণের স্ত্রী ধেনু রানী দে আগামীর সময়কে বললেন, ‘শুরু থেকেই তার এসব কাজে আত্মীয়স্বজন, আমি বাধা দিয়েছি। বলেছি, পরিবারের ক্ষতি হচ্ছে। তিনি কারও কথা শোনেননি, তার কাজ চালিয়ে গেছেন কারও সাহায্য ছাড়াই।’
নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির আগামীর সময়কে জানালেন, ‘কিরণ শংকর দে নিঃসন্দেহে ভালো কাজ করছেন। তার বাস্তব অভিজ্ঞতা ও পরামর্শ আমাদের যৌতুকবিরোধী ক্যাম্পেইনগুলোয় যুক্ত করব।’




