সবার আগে আমার এলাকা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বাংলাদেশে জেলা ষাটের অধিক। উপজেলা আছে পাঁচশ। কিন্তু গত কয়েক দশকের প্রশাসনিক যাবতীয় উন্নয়ন-উদ্যোগে টাকা-পয়সা চুম্বকের মতো টেনে নিচ্ছে দুটি জেলা। বিষয়টি একটা মডেলের চেহারা নিয়েছে বলা যায়। সেই মডেল অনুসরণ করতে চাইছেন এখন ‘ক্ষমতাধর’ অন্যরাও।
দুটি প্রধান রাজনৈতিক পরিবারের সূত্রে কর্মসংস্থান এবং অবকাঠামো উন্নয়নে নিকট অতীতে গোপালগঞ্জ ও বগুড়া অগ্রাধিকার পেয়েছে। প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ-বদলিতেও এই জেলার এনআইডিধারীরা এগিয়ে থাকতেন। এটা যেন পুরনো দিনের বর্ণব্যবস্থার নতুন এক বাংলাদেশি মডেল হয়ে উঠেছিল। দেশের অন্য জেলার মানুষরা ধীরে ধীরে তাতে অভ্যস্তও হয়ে গেছেন। দেশের নাগরিক সমাজ নতুন এ জাতপাত ব্যবস্থা অনেকটা মেনে নিয়েছিল।
কৌতূহল-উদ্দীপক হলো, এই উন্নয়ন-বিকৃতি এখন ‘হঠাৎ-শক্তিধর-মানুষ’রাও চর্চা করতে চাইছেন। ‘সুযোগ’ পাওয়ামাত্র অন্যরাও নবতর এ ব্রাহ্মণ্যবাদ কায়েমে সচেষ্ট হয়ে পড়ছেন। তারই আলামত দেখেছি আমরা অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কুমিল্লার দুটি উপজেলা মুরাদনগর ও দেবিদ্বারের বেলায়। ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর কুমিল্লার ওই দুই উপজেলা হয়েছিল অতীতের গোপালগঞ্জ ও বগুড়া।
উন্নয়নের এ ব্রাহ্মণ্যবাদী মডেলের বিষয়টি নতুন করে দেশবাসীর সামনে এলো বগুড়াকেন্দ্রিক নেত্রনিউজের একটি প্রতিবেদনের সূত্রে। ওই প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, ২০২৬-এর জাতীয় নির্বাচন শেষে গঠিত নতুন সরকারের স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে প্রথম চার মাসে এককভাবে বগুড়া প্রায় ছয়টি জেলার সমান বরাদ্দ পেয়েছে। আবার বগুড়ার মোট বরাদ্দের অর্ধেকেরও বেশি, ৭৪ কোটি টাকার প্রকল্প গেছে শিবগঞ্জ উপজেলায়। এটি বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর উপজেলা নয়, তবে বর্তমান স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের নির্বাচনী এলাকা।
এখানে যে শুধু অস্বাভাবিক ও ব্যতিক্রমী বরাদ্দ গেছে তাই নয়, সেসব বরাদ্দ বাস্তবায়নের বড় একাংশের দায়িত্ব পেয়েছেন কর্তাদের পারিবারিক বা রাজনৈতিক নিকটজন। প্রতিবেদনে এ বিষয়ে বিস্তারিত বিবরণ দেখা গেল। এই লেখা তৈরির সময় ফেসবুকে ওই প্রতিবেদনটি ৫৩৩ বার শেয়ার হয়েছে।
ভোটার-সমাজ তখন প্রকৃতই একটা নতুন বন্দোবস্তের আশা করেছিলেন। তারা ভেবেছিলেন পুরনো উন্নয়ন মডেল থেকে বাংলাদেশ বের হতে চলেছে
যদিও ‘রাজনৈতিক ব্রাহ্মণ’দের এরকম প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে বাংলাদেশের নাগরিক সমাজ অভ্যস্ত, তারপরও শিবগঞ্জের ঘটনা যে ঝড় তুলল, তার কারণ বোধহয় এই যে, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের আগে রাষ্ট্রীয় সম্পদের এরকম বরাদ্দ-বিকৃতির বিরুদ্ধে বলেছিলেন। ভোটার-সমাজ তখন প্রকৃতই একটা নতুন বন্দোবস্তের আশা করেছিলেন। তারা ভেবেছিলেন পুরনো উন্নয়ন মডেল থেকে বাংলাদেশ বের হতে চলেছে। কিন্তু স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় আমাদের স্মরণ করিয়ে দিল, পরিবর্তন সহজ নয়। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগান হিসেবে শ্রুতিমধুর হলেও দেখা যাচ্ছে, সবার আগে ‘আমি’, ‘আমরা’, ‘আমার এলাকা’।
বাংলাদেশ কি তবে পুরনো বন্দোবস্তেই থেকে যাচ্ছে? এই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর এখনই দেওয়া যাবে না হয়তো। নতুন সরকার এখনো ২০০ দিন পার করেনি। জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন চলছে কেবল। সরকার ও সংসদের কাজ মূল্যায়নের জন্য এখনো যথেষ্ট সময় পার হয়নি। কিন্তু এও সত্য, খারাপ কিছু লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।
বাংলাদেশ ১৯৭২ সালে এরকম খারাপ লক্ষণগুলোর মুখোমুখি হয়েছিল একবার, ১৯৯১ সালে আবার তার মুখোমুখি হয় এবং ২০২৫-২৬-এ একই ধরনের লক্ষণ দেখছি আমরা।
১৯৭২ সালেও জনগণ ভেবেছিল সরকারকে মূল্যায়নের জন্য এখনো যথেষ্ট সময় পার হয়নি। ১৯৯১-৯২-এও একই কথা বলেছেন রাজনৈতিক ভাষ্যকাররা। গত বছর এবং এ বছরও একই কথা বলছি আমরা।
আবহাওয়াবিদ্যার অবিকশিত যুগে সকাল দেখে দিনটা কেমন যাবে সেটার সামান্যই বলা যেত। কিন্তু এখন এই শাস্ত্র অনেক বিকশিত। এখন ঝড়-বাদল-তাপমাত্রাসহ অনেক কিছুরই নির্ভরযোগ্য অনুমান করা যাচ্ছে। তেমনি নীতিনির্ধারকদের কাজকর্ম দেখে রাজনৈতিক ভবিষ্যতেরও কিছুটা আঁচ-অনুমান করাই যায় এ মুহূর্তে।
আসলে, প্রশ্নবিদ্ধ ভবিষ্যতের শুরু সংসদের প্রথম অধিবেশনেই ঘটে গেছে। আরও সঠিকভাবে বললে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেই ঘটেছে। গোপালগঞ্জ বা বগুড়াতন্ত্র তো একটি গভীর ব্যাধির প্রতীকী নামমাত্র। প্রশাসন ও রাজনীতিকে এই ব্যাধি থেকে মুক্ত করতেই ‘লাল জুলাই’ নেমে এসেছিল। লাল জুলাই যে কোটাতন্ত্রের বিরুদ্ধে বলছিল, তার বৃহত্তর মানে নিশ্চয়ই এই ছিল যে, রাষ্ট্রীয় কোষাগার কয়েকজন রাজনীতিবিদ বা প্রশাসকের একক খামখেয়ালির বিষয় হবে না। সেখানে বরাদ্দে সাম্য, ন্যায়বিচার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বৈশিষ্ট্য থাকবে। কোনো ব্যক্তিগত বিরাগ বা আনুকূল্য থাকবে না।
২০১১ থেকে পরবর্তী ১৫ বছর জেলাগুলোর উন্নয়ন বরাদ্দের তালিকায় বগুড়া ছিল ৫৯তম। মাথাপিছু বগুড়ার চেয়ে প্রায় পাঁচ গুণ বেশি বরাদ্দ পেত গোপালগঞ্জ। বোঝা যেত, এতে কারও ব্যক্তিগত বিরাগ ও আনুকূল্য ছাপ আছে। এখন যে বগুড়া তালিকার একদম ওপরে উঠে যাচ্ছে, তাতেও আবার মনে হচ্ছে কারও ব্যক্তিগত আনুকূল্য ঘটছে।
চব্বিশের অভ্যুত্থান যে অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ চেয়েছিল, সেটার সঙ্গে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের এরকম দৃষ্টিভঙ্গি বা শিবগঞ্জ মডেল কি সামঞ্জস্যপূর্ণ? নাকি বিশ্বাসভঙ্গময়? যদি তাতে বিশ্বাসভঙ্গের উপাদান থাকে, তাহলে আগামী মাসে যখন ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানে’র দ্বিতীয় বার্ষিকী আসবে, তখন এই রাজনীতিবিদ-ক্ষমতাবানরা শহীদ পরিবারগুলোর কাছে কী জবাব দেবেন? নিয়মিত এসব পরিবারকে কিছু টাকা-পয়সা-ভাতা দেওয়াই কি অভ্যুত্থানের দায়? নাকি জাতীয় নীতি-কাঠামোতে ‘জুলাই’কে ধারণ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে নীতিনির্ধারকদের?
প্রশ্ন আরও রয়েছে। অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার আলোকে প্রশাসনিক সংস্কার কবে হবে? বহুকাল ধরে গবেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের প্রধান এক উন্নয়ন সংকট প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং জাতীয় বাজেট বরাদ্দের অধিকার কেন্দ্রীভূত হয়ে থাকা। সেই ১৭৯২ সালে কর্নওয়ালিস যে ব্যবস্থা করে গেছেন, বহু ‘স্বাধীনতা’র পরও বাংলাদেশের প্রশাসনে এখনো উক্তরূপ প্রভুতন্ত্রে রয়ে গেছে।
কতিপয় ব্যক্তির হাত থেকে জাতীয় উন্নয়ন বরাদ্দের ব্যবস্থার মুক্তি জরুরি। রাষ্ট্রীয় সব সম্পদ বরাদ্দের বেলায় একটি পূর্বনির্ধারিত নীতি-পদ্ধতি থাকলে এবং সেই বরাদ্দ বছরের শুরুতে সব ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদে চলে গেলে কতিপয় প্রভুর খেয়ালখুশির হাত থেকে দেশ রক্ষা পেত।
পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২২ সালের এক জরিপ জানিয়েছিল, দেশের দরিদ্রতম উপজেলা এখন মাদারীপুরের ডাসার। ডাসারসহ দারিদ্র্যের তালিকায় সর্বোচ্চ জায়গায় আছে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট, মাদারীপুরের কালকিনি, রাজৈর, শিবচর ইত্যাদি। এ উপজেলাগুলোয় দারিদ্র্যের হার ৫০ ভাগের বেশি। ‘নতুন বন্দোবস্তে’র সরকার যদি প্রকৃতই ‘সর্বাগ্রে বাংলাদেশ’কে রাখত, তাহলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে এসব উপজেলায় বেশি বরাদ্দ যাওয়া সঠিক হতো।
উন্নয়ন উদ্যোগ বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে এগিয়ে নিতে প্রয়োজন সঠিক নীতি-পদ্ধতি এবং প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত। আমাদের দ্বিতীয়টি আছে, কিন্তু প্রথমটি নেই। আমাদের বিশেষজ্ঞরা অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রশাসনিক সংস্কার কমিশন থেকে করণীয় ঠিক করে দিয়েছেন। স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনও তাদের প্রতিবেদন তৈরি করে দিয়েছিল। ইউনূস সরকার সেসবের কিছু বাস্তবায়ন করেনি বা করতে পারেনি। সরকার গঠনকারী দল হিসেবে বিএনপি তো সেটা করতে পারে। গণঅভ্যুত্থানের প্রধান রাজনৈতিক সুবিধাভোগী তারা। মানুষ তাদের পছন্দ করেছে নিশ্চয়ই এ কারণে নয়, অনেক অনেক উপজেলাকে বাদ দিয়ে রাষ্ট্রীয় বরাদ্দ যাবে মন্ত্রী-এমপিদের পছন্দসই দুই-চারটা উপজেলা-ইউনিয়নে। নেত্রনিউজের যে প্রতিবেদন নিয়ে এই লেখার সূত্রপাত, সেখানে এ-ও দেখানো হয়েছে, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের ১৪০০ কোটি টাকার যে বরাদ্দ থেকে শুধু শিবগঞ্জকে ৭৪ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে, সেখানে এক টাকারও কাজ পায়নি অন্তত শতাধিক উপজেলা। এ কেমন শাসন? এ কেমন বন্দোবস্ত? এ কেমন জাতীয় নীতি?
টাকার অঙ্ক হিসাবে শিবগঞ্জের ঘটনা বড় নয়। কিন্তু উন্নয়ন-নীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি হিসেবে এটা নিশ্চিতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অনেক জিজ্ঞাসা হাজির করেছে। যার মীমাংসার ওপর নির্ভর করছে আমরা কীভাবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উদযাপন করতে যাচ্ছি।
লেখক: গবেষক ও লেখক





