আগামীর চোখ
ওষুধের উল্টোরথ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বরাবর
স্বাস্থ্য সচিব
আমি একজন রোগীর সাধারণ স্বজন। হাসপাতালের করিডরে বসে আজকাল স্বাস্থ্যব্যবস্থার অনেক নতুন বিষয় শিখছি। পত্রিকায় প্রকাশিত ‘রোগীর কেনা ওষুধ অপারেশন থিয়েটার থেকে যেভাবে ফেরে ফার্মেসিতে’ শিরোনামে খবরটি পড়ে মনে হলো, চিকিৎসাবিজ্ঞানের পাশাপাশি আমাদের হাসপাতালগুলোতে বোধ হয় ‘ওষুধ পুনর্ব্যবস্থাপনা বিজ্ঞান’-এরও ব্যাপক উন্নতি হয়েছে!
আমার আত্মীয়ের অপারেশনের জন্য ফার্মেসি থেকে টাকা দিয়ে ওষুধ কিনলাম। ভাবলাম, ওষুধগুলো রোগীর জীবন বাঁচাতে কাজে লাগবে। কিন্তু খবর পড়ে জানলাম, অপারেশন থিয়েটারে রোগীর জন্য কেনা ওষুধ নাকি আবার ঘুরেফিরে ফার্মেসিতে ফিরে যেতে পারে। বাহ! কী চমৎকার ব্যবস্থা!
আমাদের মতো সাধারণ মানুষ অবশ্য এত বুদ্ধিমান নয়। আমরা ভাবি, রোগীর নামে কেনা ওষুধ রোগীর চিকিৎসাতেই ব্যবহার হবে। ব্যবহার না হলে অন্তত রোগীর স্বজনকে ফেরত দেওয়া হবে। কিন্তু সেই ওষুধ আবার ফার্মেসিতে যদি ফিরে যায়, তাহলে প্রশ্ন জাগে— একই ওষুধ কি দ্বিতীয়বার বিক্রি হয়? তৃতীয়বার? নাকি তারও কোনো ‘পুনর্জন্ম’ ব্যবস্থা আছে?
এ যেন ওষুধেরও বাড়ি ফেরার নাড়ির টান। রোগীর শরীরের দিকে না গিয়ে মাঝপথে হয়তো ওর মনে হয়েছে— না, এই শরীরটা আমার জন্য নয়; আমি বরং আবার ফার্মেসিতেই ফিরে যাই!
অব্যবহৃত ওষুধ আবার ফার্মেসিতে ফিরল। তারপর সেটি যদি আবার বিক্রি হয়, তাহলে একই পণ্য থেকে একাধিকবার আয়
রোগীর টাকা কোথায় যাচ্ছে, তার যাত্রাপথটি রহস্যে ঢাকা! একটি ওষুধ একবার বিক্রি হলো। রোগীর কাছ থেকে টাকা নেওয়া হলো। ওষুধ অপারেশন থিয়েটারে গেল। অব্যবহৃত ওষুধ আবার ফার্মেসিতে ফিরল। তারপর সেটি যদি আবার বিক্রি হয়, তাহলে একই পণ্য থেকে একাধিকবার আয়! ব্যবসায় শিক্ষার বইয়ে এমন মডেল থাকলে উদ্যোক্তারা হয়তো হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা শিখতে হাসপাতালেই ভর্তি হতেন।
আমরা রোগীর স্বজন। চিকিৎসকের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে চাই না, হাসপাতালের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকেও সন্দেহ করতে চাই না। কিন্তু স্বাস্থ্যসেবা যদি এমন হয় যে রোগীর কষ্ট, অসহায়ত্ব ও জরুরি মুহূর্তকে কেউ ব্যবসার সুযোগ হিসেবে নেয়, তাহলে সেটি শুধু অনিয়ম নয়; মানবিকতার পরাজয়।
আপনার কাছে বিনীত অনুরোধ, ঘটনাগুলো তদন্ত করুন। কোন ওষুধ কত টাকায় কেনা হলো, অপারেশন থিয়েটারে কটি গেল, কতটুকু ব্যবহৃত হলো আর কতটা ফেরত গেল এবং ফেরত যাওয়া ওষুধের পরবর্তী গন্তব্য কোথায়— সবকিছুর হিসাব জনসমক্ষে আনা হোক।
আমরা চাই না, রোগীর ওষুধ হাসপাতালের ভেতর ‘ভ্রমণ’ করুক। এমন ভ্রমণে ভ্রমণে ক্লান্ত হয়ে একসময় মেয়াদ ফুরিয়ে ওরও প্রাণবায়ু বেরিয়ে যেতে পারে। শেষে যদি হাসপাতালের মর্গে ঠাঁই হয়, তাহলে এই ‘পুনর্জন্ম’ খেলা বন্ধ হয়ে যাবে!
ইতি
একজন রোগীর উদ্বিগ্ন স্বজন



