সম্পাদকীয়
ভুল সবই ভুল

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
একটি প্রকল্পের ৯৭ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ার পর সেটি বাতিল করার সিদ্ধান্ত শুধু বিস্ময়কর নয়, রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা ও অর্থ ব্যবস্থাপনার ভয়াবহ ব্যর্থতার দৃষ্টান্ত। ১৪ বছর ধরে নির্মাণযন্ত্রণা, হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়, মানুষের কর্মঘণ্টা ও জীবনের মূল্যবান সময় নষ্ট, নির্মাণকালে প্রাণহানি, যানজটের অসহনীয় দুর্ভোগ— সবকিছুর পরিণতি যদি হয় প্রকল্প বাতিল, তাহলে এই ব্যর্থতার দায় নেবে কে? বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্প দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনার নামে অপরিকল্পিত ব্যয়ের এক স্মারক হয়ে থাকল। প্রশ্ন হলো— উন্নয়নের নামে জনগণের অর্থের এমন অপচয় আর
কত দেখতে হবে?
গতকাল বৃহস্পতিবার আগামীর সময়ের প্রধান শিরোনামে এমন ভয়াবহতার চিত্র উঠে এসেছে। ভুলে ভরা বিআরটি প্রকল্প, পেছনের কারিগরদের শাস্তির চিন্তাও করা হচ্ছে। ২০১২ সালে বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত বিশেষায়িত বাস চলাচলের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়। ২০১৮ সালের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও ১৪ বছরেও তা আলোর মুখ দেখেনি। প্রাথমিকভাবে ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ হাজার ৪০ কোটি টাকা। কয়েক দফায় মেয়াদ ও ব্যয় বাড়িয়ে সর্বশেষ অনুমোদিত ব্যয়
প্রশ্ন হচ্ছে, এত বড় একটি প্রকল্পের পরিকল্পনা প্রণয়নের আগে কি যথাযথ সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়নি? বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত দেশের অন্যতম ব্যস্ত শিল্প ও বাণিজ্যিক করিডরে বিআরটি ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হবে, তা কি বিবেচনায় নেওয়া হয়নি? এর উপযোগিতা কতটুকু, তা কি বিবেচনায় আনা হয়েছিল? এই সড়কে ভারী যানবাহনের চাপ, শিল্পাঞ্চলের পণ্য পরিবহন, ভবিষ্যৎ যাত্রী চাহিদা এবং বিদ্যমান সড়ক অবকাঠামোর সক্ষমতা কি সমীক্ষায় যথাযথভাবে উঠে এসেছিল? যদি না
প্রকল্পটির সবচেয়ে জনভোগান্তির দিক হলো— টঙ্গী থেকে বনানী পর্যন্ত যাতায়াতকারী মানুষের দুর্ভোগ, যানজট, পরিবেশদূষণ এবং নির্মাণকাজের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষতি— এসবের আর্থিক হিসাব হয়তো সরকারি নথিতে নেই। লাখো মানুষের যে কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়েছে, তার ক্ষতি কোনোভাবেই সামান্য নয়। নির্মাণকালে দুর্ঘটনায় সাতজনের মৃত্যুর তথ্যও প্রতিবেদনে এসেছে। অর্থাৎ প্রকল্পটি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই করেনি, মানুষের জীবন ও নিরাপত্তার ওপরও ভয়াবহ প্রভাব ফেলেছে।
এটি কি নিছক অদক্ষতা, পেশাগত অযোগ্যতা ও দায়িত্বহীনতার ফল, নাকি পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের কোথাও কোনো অসৎ উদ্দেশ্য কাজ করেছে? এ দেশে পূর্ববর্তী সরকার কোনো প্রকল্প গ্রহণ করলে পরবর্তী ভিন্নমতাদর্শের সরকার তা বাতিল করার কুসংস্কৃতি আছে। এ প্রকল্পে এমনটা হয়েছে বলে আমরা বিশ্বাস করতে চাই না। সরকারের কাছে প্রত্যাশা, যারা এ প্রকল্পের পক্ষে সাফাই গেয়েছিলেন, তাদের বক্তব্য যাচাই এবং তথ্য-প্রমাণসহ জনসমক্ষে তুলে ধরতে হবে। একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও
অতঃপর এ প্রকল্প যারা অনুমোদন দিয়েছে, সরকার যদি তাদের শাস্তির আওতায় আনতে পারে, তবে সেটা হবে একটা অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। জনগণের করের টাকায় তৈরি প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে যে কেউ সাতবার ভাববে। উন্নয়নের নামে জনগণের পকেট কাটার দিন শেষ হওয়ার প্রত্যাশা এই সরকারের কাছে বেশি।



