সম্পাদকীয়
গোপন চুক্তি না করার ঘোষণা স্বস্তির

দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যখন ‘গুপ্ত’ ও অন্তর্বর্তী সরকারের ‘গোপন চুক্তি’ ইত্যাদি শব্দ বেশ চর্চিত হচ্ছে, তখন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী যা বলেছেন, তা সময়োপযোগী এবং যথার্থ। অর্থমন্ত্রী গতকাল মঙ্গলবার আগামীর সময়-এর সঙ্গে বিশেষ সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘বিদ্যুৎ-জ্বালানিতে কোনো গোপন চুক্তি নয়।’ অর্থমন্ত্রীর এ মন্তব্যে দেশীয় সম্পদ রক্ষায় তার সরকারের দৃঢ় অবস্থান প্রকাশ পেল— আমরা এমনটাই প্রত্যাশা করি। মনে রাখা দরকার, অনেক রক্তের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের এই প্রিয় মাতৃভূমি। একটি ঘাসও আমরা বিনাস্বার্থে বা গোপনে কাউকে দিতে পারি না, দেব না। সবকিছুই হতে হবে প্রকাশ্যে এবং স্বচ্ছ। এখানে গোপনীয়তার কোনো স্থান নেই। দেশের সম্পদ বিকিয়ে দিয়ে আধিপত্যবাদী শক্তির সেবাদাসে পরিণত হওয়ার পরিণাম ভালো নয়, এর উদাহরণ তৃতীয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে আছে।
একটি স্বাধীন এবং সার্বভৌম রাষ্ট্রের অন্যতম অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড হলো বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত। এ খাতের যেকোনো সিদ্ধান্ত সরাসরি প্রভাব ফেলে সাধারণ মানুষের পকেট থেকে শুরু করে বৃহৎ শিল্পোৎপাদন এবং জাতীয় নিরাপত্তার ওপর। পরিতাপের বিষয়, অতীতে আমরা দেখেছি কীভাবে জনস্বার্থকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, কোনো ধরনের উন্মুক্ত দরপত্র বা যাচাই-বাছাই ছাড়াই, ‘বিশেষ বিধান’ বা ‘গোপন চুক্তি’র আড়ালে এ খাতকে নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠী বা বিদেশি স্বার্থের কাছে বিকিয়ে দেওয়া হয়েছে। একটি কায়েমি স্বার্থবাদী গোষ্ঠীর মাধ্যমে এখনো সে ধারা চলমান।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের এই কথিত ‘গোপন চুক্তি’ বা প্রতিযোগিতাহীন দায়মুক্তি আইনের আড়ালে নীতিহীন লুটেরা ধনিক গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করা হয়েছে। আর একই চরিত্রের অর্থনীতি গড়ে উঠেছে, তা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে এক মহাবিপর্যয়ের মুখে ফেলবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর নেতিবাচক প্রভাব অনেকটাই এখন দৃশ্যমান।
জ্বালানি খাতের চুক্তিগুলো যখন জনসমক্ষে প্রকাশ করা না হয়, তখন অনেক প্রশ্ন সামনে এসে যায়। নানা সন্দেহের ডালপালার বিস্তার ঘটে। এতে শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই ডেকে আনে না, জাতীয় নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়ে। প্রতিবেশী দেশের একটি ব্যবসায়ী গ্রুপের সঙ্গে সম্পাদিত বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি কিংবা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো মেগা প্রকল্পগুলোর শর্তাবলির ধোঁয়াশা এখনো কাটেনি।
অামরা বলতে চাই, চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন ও বাতিল করা দরকার। এ যাবৎ সব গোপন ও একতরফা চুক্তি অবিলম্বে জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। দায়মুক্তির স্থায়ী অবসানের জন্য বিশেষ বিধান করা যেতে পারে। বিশেষ আইনের অধীনে হওয়া সব দুর্নীতির বিচার বিভাগীয় তদন্ত করতে হবে। লুণ্ঠিত টাকা এবং পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। দেশীয় সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার করাও জরুরি। আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় স্থলভাগ ও সমুদ্রসীমায় গ্যাস এবং তেল অনুসন্ধানে প্রয়োজনে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে, দ্রুত তৎপর হতে হবে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত কোনো ব্যক্তিবর্গ বা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। এটি জনগণের সম্পদ, দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতীকও। আড়ালে বা গোপন কক্ষে বসে দেশের ভবিষ্যৎকে বন্ধক রাখার যে সংস্কৃতি জাতি দেখেছে, তার অবসান হোক। একটি গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রে জ্বালানি খাতের প্রতিটি চুক্তি হতে হবে উন্মুক্ত, প্রতিযোগিতামূলক এবং সম্পূর্ণ দেশপ্রেমের ভিত্তিতে। বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতকে লুটেরাদের কবল থেকে মুক্ত করে জনসম্পদে পরিণত করাই এ সময়ের গণদাবি।




