সম্পাদকীয়
অন্ধকার রসিকতা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বিদ্যুৎ নিয়ে আমাদের দেশে যা চলছে, তাকে রসিকতা বললেও কম বলা হয়। আলো থাকুক আর না থাকুক, মাসের শেষে ভুতুড়ে বিলের কাগজটা গ্রাহকের হাতে ঠিকই পৌঁছে যাচ্ছে। কোথাও ব্যবহার একই; কিন্তু বিলের অঙ্ক দ্বিগুণ কিংবা তিন গুণ। আবার ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং চললেও বিল কমার কোনো লক্ষণ নেই। এই অদ্ভুত বিদ্যুৎ ব্যবস্থার বলি হচ্ছেন বরগুনার বেতাগী থেকে শুরু করে দিনাজপুরের হিলির সাধারণ ও নিম্নবিত্ত মানুষ। ডিজিটাল বাংলাদেশ পার হয়ে আমরা কোথায় এলাম? অফিসে বসে আন্দাজে মিটার রিডিং তুলে বিল বানানোর নাম কি আধুনিক প্রযুক্তি?
হিলির এক ভুক্তভোগীর দুই মাসের ব্যবধানে বিল দুই হাজার টাকা থেকে লাফিয়ে সাত হাজারে উঠেছে। ব্যবসা করা কিংবা সংসার চালানো এখন আর সহজ বিষয় নয়, যেন অপরাধের শামিল। কর্তৃপক্ষ পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর দোহাই দিচ্ছে। সঙ্গে শোনানো হচ্ছে লোডশেডিং কমার অজুহাত। অথচ বাস্তবে মানুষ দেখছে সম্পূর্ণ উল্টো ছবি। সিলেটে আবার তীব্র গরমে দিনে ১০ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। মেঘ দেখা দিলে বা একটু বাতাস বইলেই বিদ্যুৎ উধাও হওয়া নিয়মে পরিণত হয়েছে।
অথচ এমন বেহাল সেবার মধ্যেও গ্রাহকের পকেট কাটায় কোনো ক্ষান্তি নেই। সাধারণ মানুষ বকেয়া রাখলে বা রিডিংয়ে একটু সমস্যা হলে সংযোগ কাটতে এক সেকেন্ডও দেরি হয় না। প্রিপেইড মিটারে টাকা শেষ হলে অন্ধকার নেমে আসে মুহূর্তেই। অথচ উল্টো চিত্র আমাদের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে। চাঁদপুর পৌরসভার বকেয়া বিল দাঁড়িয়েছিল ২১ কোটি টাকায়, যা টেনেটুনে এখন ১৭ কোটিতে নেমেছে। সাধারণ মানুষের কাছ থেকে হোল্ডিং ট্যাক্স, নানা রকম ফি ঠিকই আদায় করা হচ্ছে। অথচ বিদ্যুৎ বিল জমে পাহাড় হয়ে যাচ্ছে। সাধারণ গ্রাহকের বেলায় কঠোর নিয়ম আর সরকারি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে অসীম ছাড়— এ বৈষম্য আসলে কার স্বার্থে?
মিটার রিডিং না দেখে অনুমানভিত্তিক বিল তৈরি করা সরাসরি দুর্নীতি ও দায়িত্বজ্ঞানহীনতা। এই ব্যবস্থার জবাবদিহি কোথায়? বেতাগী ও হিলির স্থানীয় প্রশাসন এবং সাব-জোনাল কর্মকর্তারা আশ্বাস দিচ্ছেন, অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অভিযোগ জানানোর পর কেন ব্যবস্থা নিতে হবে? মিটার দেখে সঠিকভাবে বিল তৈরি করা কি স্বাভাবিক কাজের অংশ নয়? সাধারণ মানুষকে কেন নিজের কষ্টের টাকায় ভুল বিল শুধরে নিতে অফিসের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হবে? দীর্ঘদিন নিয়মিত রিডিং না নিয়ে হঠাৎ কয়েক মাসের ইউনিট একসঙ্গে যোগ করে বিল পাঠানো আরেক ধরনের ফাঁদ। এতে ইউনিটের ধাপ বদলে গিয়ে গ্রাহককে চড়া দামে বিল মেটাতে হয়। প্রশাসনিক অবহেলা আর অনিয়মের এই মাশুল গ্রাহক কেন গুনবেন?
বর্তমানে জীবনযাত্রার ব্যয় আকাশছোঁয়া। চাল, ডাল, তেলের বাজার এমনিতেই সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস তুলছে। তার ওপর এই আকাশচুম্বী আর ভুল বিদ্যুৎ বিল যেন ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’। বিদ্যুৎ বিভাগকে অবিলম্বে এই ভুতুড়ে বিলের সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। অনুমানভিত্তিক বিল তৈরি বন্ধ করে নিয়মিত রিডিং নিশ্চিত করতে হবে। যেসব কর্মকর্তা অফিসে বসে কাল্পনিক বিল বানাচ্ছেন, তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। পাশাপাশি লোডশেডিংয়ের নামে বিদ্যুৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলা বন্ধ হওয়া দরকার। সেবার মান না বাড়িয়ে শুধুই দাম বাড়ানো আর অনুমানের ওপর বিল চাপিয়ে গ্রাহক নাজেহাল করার এই অনিয়ম এবার থামুক।




