সৈকত আছে শৃঙ্খলা নেই

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটন জেলা কক্সবাজারের নাম বিশ্ব পর্যটনকেন্দ্রের তালিকায় না থাকাটা কোনো সুসংবাদ নয়। এটা দেশের পর্যটন শিল্পের নানামুখী সমস্যা ও সংকট তথা দৈন্যের বহিঃপ্রকাশ। অথচ বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক বালুকাময় সমুদ্রসৈকত, পাহাড়, বৈচিত্র্যময় বন, সবুজের সমারোহমণ্ডিত টিলা, দ্বীপ, প্রবাল, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য— সবই আছে কক্সবাজারে। মানসম্পন্ন বিমানবন্দর, রেল ও সড়ক যোগাযোগ, শত শত হোটেল-রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁ রয়েছে এখানে। প্রতি বছর ৬০-৮০ লাখ পর্যটকও আসেন। তবু বৈশ্বিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে কক্সবাজারের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগেনি। গতকাল রবিবার প্রকাশিত আগামীর সময়ের এক প্রতিবেদনে মূল সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে সৈকতের বাইরে পর্যটন পণ্যের ঘাটতি, পরিবেশের অবনতি এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনা। অতি সম্প্রতি শহরের একটি রেস্তোরাঁয় ডিজে নাইট ঘিরে পুলিশের তৎপরতা ও কিছু নারী-পুরুষ আটকের ঘটনায় পর্যটক প্রতিকূলতাকে স্পষ্ট করে। স্থানীয় পর্যটন ব্যবসায়ীদের ভাষ্যে সেই হতাশার কথাও উঠে এসেছে। তারা বলেছেন, দিনে লাখো পর্যটকের ভিড় থাকলেও রাতে বৈধ, নিরাপদ ও বৈচিত্র্যময় বিনোদনের সুযোগ এখানে সীমিত। এ পর্যটন ঘিরেই বছরে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হয়। পর্যটনবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত না করে উল্টো নানামুখী প্রতিকূল পরিবেশ সৃষ্টি করার অর্থ ‘হাতের লক্ষ্মী পায়ে ঠেলা’।
কক্সবাজার নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের গর্ব। অথচ আন্তর্জাতিক পর্যটন মানদণ্ডে কক্সবাজার এখনো কাঙ্ক্ষিত অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি। বিমানবন্দর সম্প্রসারণ, হোটেল-মোটেল নির্মাণ কিংবা সড়ক যোগাযোগের উন্নয়ন হয়েছে ঠিকই, কিন্তু আন্তর্জাতিক পর্যটকদের আকৃষ্ট করার জন্য প্রয়োজন আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, উন্নত গণপরিবহন, পর্যাপ্ত তথ্যসেবা এবং নিরাপদ পর্যটনব্যবস্থা। এসব ক্ষেত্রে এখনো উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে। গত ঈদের পর তিন দিনে সৈকত থেকে এক টনের বেশি বর্জ্য সরাতে হয়েছে বলে স্থানীয় পরিবেশকর্মীদের অভিযোগ। শহরে প্রতিদিন প্রায় ১৮০ টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। অধিকাংশ হোটেলে কার্যকর পয়ঃনিষ্কাশন শোধনাগার না থাকায় অপরিশোধিত বর্জ্যপানি সাগরে ফেলার অভিযোগ নতুন নয়।
পর্যটকদের নিরাপত্তা ও সেবার মান নিয়ে অভিযোগ দীর্ঘদিনের। গত ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে সুগন্ধা পয়েন্টের একটি রেস্তোরাঁয় ডিজে নাইট ঘিরে পুলিশের তল্লাশি এবং কটেজ জোন থেকে ২১ নারী-পুরুষকে আটক করা হয়। এ ঘটনা নতুন করে সামনে এনেছে নিরাপত্তার প্রশ্ন এবং নির্বিঘ্নে ও স্বচ্ছন্দে বৈধ আনন্দ উদযাপনের পরিবেশ অনুকূল নয়। অতিরিক্ত ভাড়া, পর্যটক হয়রানি, দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য, নগরে অনিয়ন্ত্রিত যানবাহন এবং মৌসুমি ব্যবসার অরাজকতা পর্যটনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে। একজন বিদেশি পর্যটকের কাছে একটি নেতিবাচক অভিজ্ঞতা পুরো পর্যটন শিল্পের জন্য ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে।
সময়ের সঙ্গে পর্যটকের চাহিদা বদলাবে এটাই স্বাভাবিক। তারা সমুদ্র ও সূর্যাস্তের পাশাপাশি নিরাপদ জলক্রীড়া, ডাইভিং, কায়াকিং, দ্বীপভ্রমণ, প্রকৃতিতে হাঁটা, স্থানীয় সংস্কৃতি উপভোগ, কেনাকাটা ও রাতের বিনোদন চান। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা সীমিত সংখ্যক বিনোদনের উপাদান ও মাধ্যম রাখায় বিদেশি পর্যটকদের তেমন আকৃষ্ট করতে পারছেন না।
এমন বাস্তবতা থেকে উত্তরণের জন্য প্রথমত স্থানীয় জনগণকে পর্যটন উন্নয়নের অংশীদার করতে হবে। পর্যটন তখনই টেকসই হবে, যখন স্থানীয় মানুষ এর সুফল ভোগ করবে। দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা, পর্যটনসংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণ এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহায়তা দিলে পর্যটনশিল্প আরও শক্তিশালী হবে।
কক্সবাজার শুধু একটি সমুদ্রসৈকত নয়; এটি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক পরিচয়ের অন্যতম মুখ। তাই এটিকে বিশ্বমানের পর্যটনকেন্দ্রে উন্নীত করা কোনো বিলাসিতা নয়, বরং জাতীয় প্রয়োজন।



