সম্পাদকীয়
ভাতের থালায় রক্ত কার

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
গণপিটুনির নামে আইন হাতে তুলে নেওয়া দেশে নতুন কোনো ঘটনা ছিল না। কিন্তু ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এই গণপিটুনির সংস্কৃতি ভয়াবহ ‘মব জাস্টিসে’ রূপ নেয়। অর্থাৎ সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে একদল মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নিতে থাকে। এসব ঘটনায় জড়িতদের অধিকাংশকেই তখন আইনের আওতায় আনা হয়নি। এতে বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভিন্ন মাত্রা পায়। যার ফলে তুচ্ছ কারণে আইন হাতে তুলে নেওয়ার ঘটনা আজও নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি।
গতকাল সোমবার দৈনিক আগামীর সময়ে ‘ভাতের জন্য পিটিয়ে হত্যায় মামলা, ২ দিনেও গ্রেপ্তার নেই’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদে এমনই একটি ঘটনা সামনে এসেছে। প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে— ‘ভাত চুরি করে খাওয়ার’ অভিযোগে খুলনা নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আজমুল হোসেনকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় চারজনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও ২০-২৫ জনকে আসামি করে নিহত আজমুলের বাবা কুতুব উদ্দিন খুলনা মহানগরীর হরিণটানা থানায় হত্যা মামলা করলেও পুলিশ কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি।
প্রযুক্তির এ যুগে দুদিন পরও অপরাধীদের গ্রেপ্তার করতে না পারা পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চরম ব্যর্থতা; এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এমন হত্যাকাণ্ডের পর সার্বিকভাবে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের অবহেলা এবং উদাসীনতার দিকটিও স্পষ্ট ও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে যখন দেশ জুড়ে ‘মব জাস্টিস’-এর নামে হত্যা-নির্যাতনের সংস্কৃিত চূড়ান্তরূপ লাভ করেছিল, তখন অনেকেই ভেবেছিলেন নির্বাচিত সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করলে এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ সম্ভব হবে। একই সঙ্গে বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে সাধারণ মানুষ মুক্তিলাভ করবে। কিন্তু নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সাত মাস পেরিয়ে গেলেও দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যে তেমন কোনো দৃশ্যমান উন্নতি হয়নি— তা আজমুল হোসেনকে পিটিয়ে হত্যার মতো সাম্প্রতিক ঘটনাবলিই এর প্রমাণ। আর এসব ঘটনার বাড়বাড়ন্তের পেছনে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পেশাদারি মনোভাবের অভাব যেমন রয়েছে, তেমনি হত্যাকাণ্ডের মতো গুরুতর অপরাধের পরও আইনের মারপ্যাঁচে অপরাধীদের পার পেয়ে যাওয়ার পুরনো সংস্কৃতিরও দায় রয়েছে। নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটানোর পরও যখন অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে দীর্ঘ সময় লাগে কিংবা বিচারের মুখোমুখি করে শাস্তি নিশ্চিত করা যায় না, তখন বিচারব্যবস্থার প্রতি পেশাদার অপরাধী এবং সম্ভাব্য অপরাধীদের ভয় পুরোপুরি লোপ পায়।
রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব তার নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। ‘ভাত চুরি’র মতো সামান্য অভিযোগে বা যেকোনো অপবাদে একজন মানুষকে পিটিয়ে মেরে ফেলা কোনো সভ্য ও গণতান্ত্রিক সমাজের লক্ষণ হতে পারে না।
তাই আজমুল হত্যার আসামিদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে বিদ্যমান আইনি ব্যবস্থার ভেতরেই দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধী যে-ই হোক, রাজনৈতিক কিংবা সামাজিকভাবে সে যত প্রভাবশালীই হোক না কেন— আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়, এ বার্তাটি রাষ্ট্রকে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আর এর জন্য নীতিনির্ধারকদের দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। তবে খেয়াল রাখতে হবে যে— দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে গিয়ে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যেন হয়রানির শিকার না হন।
আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এই বিপজ্জনক প্রবণতা রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে যেমন পেশাদারিত্বের পরিচয় দিতে হবে, তেমনি অপরাধ সংস্কৃতি নির্মূলে সামাজিক প্রতিরোধের কথাও ভাবতে হবে নীতিনির্ধারকদের। অন্যথায়, আইন হাতে তুলে নেওয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব হবে না বলে আমরা মনে করি।



