সম্পাদকীয়
হামের কাছে হার

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
কোনোভাবেই লাগাম টানা যাচ্ছে না হামের। সংক্রমণ থেমে নেই। থেমে নেই মৃত্যুর মিছিল। গত মার্চে দেশে হামের প্রাদুর্ভাব শুরুর পর এ পর্যন্ত হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ৮৭৩ শিশুর। গতকাল সোমবার দৈনিক আগামীর সময়ে ‘হামে হেরে গেল আরও ৬ শিশু’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যাচ্ছে, এ পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে ৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। হাম ও এর উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ৬৩ শিশু।
মার্চে প্রাদুর্ভাব শুরু হলে এপ্রিলে সরকার ধাপে ধাপে দেশ জুড়ে হামের টিকা দিতে শুরু করে। কিন্তু টিকা দেওয়ার পরও নিয়ন্ত্রণে আসেনি সংক্রমণ। এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা হামের প্রকোপ না কমার দুটি কারণ বলেছেন। এগুলো হলো, অনেক শিশুর টিকা না পাওয়া এবং হাম মোকাবিলায় ‘গাইডলাইন’ বা নির্দেশিকা তৈরি না করা। তারা বলছেন, টিকা দেওয়ার পর এখন অ্যান্টিবডি যাচাই করা উচিত, আদতেই টিকা পাওয়া শিশুদের মধ্যে রোগপ্রতিরোধের প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবডি তৈরি হলো কি না। বিশেষজ্ঞদের মতামত যদি সঠিক ধরে নিই, তাহলে প্রশ্ন জাগে নীতিনির্ধারণী মহল কেন এই অতিজরুরি পদক্ষেপটি নিতে কালক্ষেপণ করছে?
হামে আক্রান্ত অধিকাংশ শিশুর পরিবার নিম্নবিত্ত ও খেটেখাওয়া শ্রেণির। যারা অধিকাংশ সময় থেকেছে নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টিসীমার বাইরে। এর একটি উদাহরণ হলো, বান্দরবানের রুমা উপজেলার দুর্গম লেংটংপাড়ার খুমি জাতিগোষ্ঠী। পাড়াটিতে সাত শিশু হাম ও এর উপসর্গে মারা গেছে। যাদের মধ্যে চারজন একই পরিবারের। এ ছাড়াও সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, পাড়ার ২৬ পরিবারের মধ্যে অন্তত ১৫টির শিশুরা বান্দরবান, রুমা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে। আক্রান্তদের সঙ্গে অভিভাবকরা হাসপাতালে দিন কাটাচ্ছেন। ফলে ধীরে ধীরে জনশূন্য হয়ে পড়ছে খুমিপাড়া। কিন্তু এ নিয়ে নীতিনির্ধারণী মহলে বিশেষ কোনো আলোচনা দেখা যাচ্ছে না। এ ঘটনা থেকে এটিই প্রমাণিত হয়, সমাজ কিংবা রাষ্ট্রে প্রভাব বিস্তার করার ক্ষমতা না থাকায় এ মানুষগুলো উপেক্ষিত হচ্ছেন। কিন্তু উপেক্ষিত এ শ্রেণিগুলোর শিশুদের জায়গায় যদি শহুরে অভিজাত শ্রেণি, উচ্চমধ্যবিত্ত কিংবা মধ্যবিত্ত শ্রেণির শিশুরা থাকত, সেক্ষেত্রে নীতিনির্ধারকরা এমন ‘উদাসীন’ থাকতে পারতেন? নিশ্চয়ই নয়।
একসময় হামের খবর পত্রিকার প্রথম পাতায় দেখে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন পাঠক। প্রতিটি মৃত্যুর খবর গুরুত্বের সঙ্গে ছাপা হতো। কিন্তু প্রাদুর্ভাবের পাঁচ মাসে এসে মৃত্যুর মিছিল না থামলেও হামের খবর চলে যাচ্ছে পত্রিকার ভেতরের পাতায়, নিউজপোর্টালের এক কোণে। আমরা ক্রমেই শিশুদের মৃত্যু মেনে নিচ্ছি। অভ্যস্ত হয়ে উঠছি রাষ্ট্রীয় নিদারুণ ‘উদাসীনতা’র সঙ্গে।
অন্তর্বর্তী সরকারের ভুল নীতির কারণে টিকার যে সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়েছিল, সেখান থেকে বেরিয়ে সরকার দ্রুততার সঙ্গে হামের টিকা সংগ্রহ এবং ক্যাম্পেইন শুরু করতে পেরেছিল, সেটা ছিল নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী পদক্ষেপ— যা প্রশংসার দাবি রাখে। তেমনি টিকা দেওয়ার পর আদতেই টিকা পাওয়া শিশুদের মধ্যে রোগপ্রতিরোধের প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবডি তৈরি হলো কি না, তা যাচাইয়ে কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ গ্রহণ না করার বিষয়টিও সমালোচনার দাবি রাখে।
হামের চিকিৎসা ও টিকাদানের ক্ষেত্রে একটা সমন্বিত পরিকল্পনার ঘাটতি এখন দৃশ্যমান। জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে আইসিইউসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতিতে এখনো বহু পরিবারকে হামে আক্রান্ত শিশু নিয়ে ঢাকায় ছুটতে হচ্ছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতামত বা পরামর্শের চেয়ে নিজেদের পছন্দসই নীতিতে চলার কারণে হাম ব্যবস্থাপনায় এ সমন্বয়হীনতা সৃষ্টি হয়েছে বলে আমরা মনে করি।




