অপরাধীদের অভয়ারণ্য

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেশের সংবিধান রাষ্ট্রকে নাগরিকের জীবন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব দিয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা এমন এক অবস্থানে পৌঁছেছে, যেখানে মানুষ ঘর থেকে বের হওয়ার আগে নিশ্চিত হতে পারে না, সে নিরাপদে ঘরে ফিরতে পারবে। রাজধানী থেকে মফস্বল, শহর থেকে গ্রাম— খুন, ছিনতাই, ডাকাতি ও সন্ত্রাসের ঘটনায় মানুষের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। এমনকি খোদ পুলিশের গোয়েন্দা শাখার কর্মকর্তা যখন পিটুনিতে নিহত হন, তখন আতঙ্ক ও উদ্বেগ অারও গভীর হয়। একজন প্রশিক্ষিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য যদি উচ্ছৃঙ্খল ব্যক্তিদের হাতে প্রাণ হারান, তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কতটা নাজুক— তা সহজেই অনুমেয়।
আরেকটি মর্মান্তিক বিষয় হলো, জামালপুরের ইসমাইল হোসেন নিজ গ্রাম থেকে জমি বিক্রির ৫ লাখ টাকা সঙ্গে নিয়ে গাজীপুরের কাশিমপুরে যাওয়ার জন্য রওনা হয়েছিলেন। টাকাগুলো ছিল মেয়ের বিয়ের জন্য। ঢাকার অদূরে তিনি নিহত হন, হারান সমুদয় টাকা ও মোবাইল ফোন। অন্যদিকে সাভারে দম্পতির মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। সে মৃত্যু স্বাভাবিক ছিল না। নারায়ণগঞ্জে রাস্তায় পাওয়া যায় যুবকের গুলিবিদ্ধ লাশ।
দৈনিক আগামীর সময়ে ‘৫ পরিবারে ৮ খুন’-এর খবর যখন পাঠক পড়েন, তখন তিনি স্বস্তি বোধ করেন না। একটি সমাজে যখন একের পর এক এত প্রাণহানি ঘটে, তখন তা শুধু বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; বরং আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার দুর্বলতা, সামাজিক অবক্ষয় এবং অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রশ্ন হলো, কেন এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে? কেন অপরাধীরা ক্রমেই বেপরোয়া হয়ে উঠছে? মানুষের জীবনের মূল্য কি এতই কম?
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) বিভিন্ন প্রতিবেদনে বারবার উঠে এসেছে খুন, ছিনতাই ও সংঘবদ্ধ অপরাধের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। অপরাধ সংঘটনের পর দ্রুত বিচার ও দৃশ্যমান শাস্তির অভাব অপরাধীদের মধ্যে একধরনের দায়মুক্তির সংস্কৃতি তৈরি করছে। তারা জানে, ধরা পড়লেও বিচার দীর্ঘসূত্রতায় আটকে যেতে পারে; ফলে অপরাধ করতে তাদের ভয় কমে যাচ্ছে।
অপরাধ বৃদ্ধির পেছনে অর্থনৈতিক চাপ, বেকারত্ব, মাদকের বিস্তার, রাজনৈতিক প্রভাব এবং দুর্বল তদন্তব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কিন্তু এসব কারণ দেখিয়ে কোনোভাবেই রাষ্ট্রের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। নাগরিক কর দেয়, আইন মেনে চলে এবং রাষ্ট্রের ওপর আস্থা রাখে এই বিশ্বাসে যে, রাষ্ট্র তাকে সুরক্ষা দেবে। যখন এতগুলো অস্বাভাবিক মৃত্যুর খবর গণমাধ্যমে উঠে অাসে, তখন সে আস্থার ভিত নড়ে ওঠে।
দুঃখজনক হলেও সত্য, দেশে অনেক সময় অপরাধ সংঘটনের পর জোরালো বক্তব্য শোনা যায়, তদন্ত কমিটি গঠিত হয়, কয়েক দিন আলোচনা চলে; কিছু দিন পর বিষয়টি চাপা পড়ে যায়। অপরাধী চক্র আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে। এই চক্র ভাঙতে না পারলে নিরাপত্তাহীনতা আরও বাড়বে।
সরকারি অাইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য নিহত ও এতগুলো মৃত্যু রাষ্ট্রের জন্য একটি সতর্কবার্তা। নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ রাষ্ট্র কখনোই উন্নয়ন, বিনিয়োগ বা সামাজিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে পারে না। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের পাশাপাশি মানুষের চাওয়া হলো— জীবন নিয়ে নিরাপদে ঘরে ফেরা।
একজন বাবার অসমাপ্ত স্বপ্ন, একটি মেয়ের থমকে যাওয়া বিয়ের আয়োজন এবং একাধিক পরিবারের নিভে যাওয়া জীবনের আর্তনাদ আমাদের মনে করিয়ে দেয়— নিরাপত্তা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। রাষ্ট্র যদি সে অধিকার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে উন্নয়নের সব দাবি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।





