সম্পাদকীয়
স্বাস্থ্য খাতের জাঁক ও সেবা খাতের ফাঁক

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
পরিসংখ্যানের খাতা সবসময়ই ভারী। সেখানে লেখা থাকে ৬৫ হাজার ৪৯৯ জন আক্রান্ত, আর ১৯৫ জন মৃত। গত ২৪ ঘণ্টায় আরও পাঁচজনের মৃত্যু, ১ হাজার ৮৭২ জন নতুন রোগী— স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বুলেটিনে এসব স্রেফ কিছু গাণিতিক হিসাব। সরকার কাগজপত্র সংখ্যা গোনে। অন্যদিকে হাসপাতালের বারান্দায় একের পর এক কফিন যোগ হয়। কিন্তু সেই খাতার হিসাব কি একজন মণি আকতারের অনাগত সন্তানের জীবনের দাম মেটাতে পারে? নাকি সরকারি ফাইলের লাল ফিতায় হারিয়ে যাওয়া অর্পিতা দাশদের করুণ গল্প বদলাতে পারে?
বাস্তবতা হলো, দেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতি এখন চরম অরাজকতায় ডুবে আছে। একে তো মশার তাণ্ডব, তার ওপর চিকিৎসার নামে চলছে প্রকাশ্য ডাকাতি ও চরম অবহেলা। সরকারি হাসপাতালে সিট বা এইচডিইউ (হাই ডিপেন্ডেন্সি ইউনিট) বেড মেলে না। অগত্যা স্বজনদের দৌড়াতে হয় বেসরকারি হাসপাতালের দিকে। আর সেখানে পৌঁছানো মানেই শুরু শোষণচক্র। মণি আকতারের আইসিইউ বিল উঠেছিল ১ লাখ ২১ হাজার টাকা। যে দেশে সাধারণ মানুষের জীবন চালাতে হিমশিম খেতে হয়, সেখানে এই টাকা দেওয়া অসম্ভব। ফলে লাইফ সাপোর্ট খুলে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার মুচলেকা দিতে হয় স্বজনদের। চিকিৎসার অভাবে পথেই মারা যান অন্তঃসত্ত্বা নারী। এই মৃত্যু কি শুধু রোগে ভুগে? নাকি এটি আমাদের অর্থলোভী চিকিৎসাব্যবস্থার এক প্রকাশ্য হত্যাকাণ্ড?
আরও নির্মম হলো, হাসপাতালগুলোর জালিয়াতি ও তথ্য লুকানোর সংস্কৃতি। সাজিনাস হসপিটালের ব্যবস্থাপক নির্বিকার ভঙ্গিতে দাবি করেন, তাদের ওখানে নাকি মণি আকতার নামে কেউ কোনোদিনই ছিলেন না! মৃত্যুর পরও রোগীর অস্তিত্ব মুছে দেওয়ার এই অবিশ্বাস্য সাহস তারা কোথায় পায়? কারণ, প্রশাসন ঘুমিয়ে আছে। জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় প্রতিদিন তথ্যের কাগজ সামলায়। অথচ কোন বেসরকারি হাসপাতাল কতশত রোগীর তথ্য লুকিয়ে ব্যবসা চালাচ্ছে, তার কোনো খোঁজ রাখে না। ফলে সরকারি বুলেটিনে থেকে যায় বিশাল ফাঁক।
এখন সেই অসহায় পরিবারটির আট বছরের শিশু আবু জাহেদও চট্টগ্রাম মেডিকেলে বমি আর জ্বর নিয়ে ছটফট করছে। এক ডেঙ্গু একটি পরিবারকে পুরো ধ্বংস করে দিল। মা ও অনাগত ভাই চলে গেছে, এখন শিশুটি লড়ছে বাঁচার লড়াইয়ে। অথচ নগর কর্তৃপক্ষ নীরব। তারা প্রতি বছর বাজেটের শতকোটি টাকা মশকনিধনের নামে জলে ঢালে। অথচ মশা মারার ওষুধের ওষুধত্ব নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। রাস্তার জমানো পানি আর নোংরা পরিবেশ দেখে মনে হয় না মশকনিধনে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ আছে।
পরিসংখ্যান দিয়ে সান্ত্বনা দেওয়ার দিন শেষ। মশকনিধনে সদিচ্ছা দেখাতে হবে, শুধু বাজেটের টাকা নয়। বেসরকারি হাসপাতালগুলোর এই গলার ওপর ছুরি চালানো বাণিজ্য এবং তথ্য চুরির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রশাসনিক এই নির্লিপ্ততা ও গাফিলতি চলতে থাকলে ডেঙ্গু নয়, সরকারি অবহেলাই হবে দেশের মানুষের প্রধান ঘাতক।
মশার বিষাক্ত ছোবলের চেয়েও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে স্বাস্থ্য খাতের পঙ্গুত্ব। প্রশাসনিক নির্লিপ্ততা ও অপেশাদারিত্বের পরিণতি টানছে নিঃস্ব সাধারণ মানুষ। ফাঁকা বুলি ও শুভংকরের ফাঁকি বন্ধ করে এখনই যদি কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে এই চরম অরাজকতাই হবে আমাদের ধ্বংসের মূল কারণ।



