আগামীর চোখ
মাটি খাঁটি, লাভের হিসাব আরও খাঁটি!

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বরাবর
কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক দপ্তর
মহোদয়, ছোটবেলা থেকে বিটিভিতে শুনে আসছি—
‘সোনা সোনা সোনা, লোকে বলে সোনা সোনা নয় তত খাঁটি
বলো যত খাঁটি, তারও চেয়ে খাঁটি বাংলাদেশের মাটিরে...।’
গানটি এতদিন শুনেছি দেশপ্রেমের আবেগে। এখন বুঝতে পারছি, আবেগের মতোই আসলে মাটির মধ্যে গভীর বৈজ্ঞানিক সত্যও লুকিয়ে নেই। আপনারা তার লাভ-ক্ষতির হিসাব কষে ফেলতে পারছেন লাভ-ক্ষতির জাবেদায়। বিশেষ করে কুড়িগ্রামের ব্রহ্মপুত্রের বালু। বৈজ্ঞানিক সত্য বলছে, সেখানে সোনা না থাকলেও সম্ভাবনা আছে, খনিজ না মিললেও গবেষণা আছে, আর গবেষণা শুরু না হলেও প্রকল্পের লাভ-লোকসান নির্ধারণে আপনাদের বিরল প্রতিভা আছে!
আমি একজন মৃত্তিকাবিজ্ঞানী। মাটি পরীক্ষা করে তার উপাদান শনাক্ত করা, সম্ভাবনা যাচাই করা এবং সেই সম্ভাবনাকে মানুষের কাজে লাগানোই আমার বিদ্যাচর্চা। এতদিন জানতাম, কোন মাটিতে কী আছে, তা জানতে নমুনা সংগ্রহ করতে হয়; খনিজের পরিমাণ বুঝতে পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ করতে হয়; আর শিল্প গড়ে তোলা লাভজনক কি না, তা জানতে অর্থনৈতিক সমীক্ষা চালাতে হয়। আপনাদের দপ্তরের নামে প্রচারিত লাভ-ক্ষতির অভিমত আমার সেই দীর্ঘদিনের শিক্ষাকে এক নিমেষে বালুচাপা দিয়ে
বিজ্ঞানী হিসেবে আমি বিভ্রান্ত। বালুর ভেতরে কী আছে, তা জানতে গবেষণা লাগে
শুনলাম, প্রায় ৯০০ কোটি টাকা ব্যয়ে কুড়িগ্রামে বালু গবেষণা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র গড়ার উদ্যোগ আট বছর ধরে আটকে রয়েছে। এরই মধ্যে মন্ত্রণালয়ের সভার কার্যবিবরণীতে আপনাদের দপ্তরের বরাতে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য ব্যয়ের তুলনায় সরকারের প্রাপ্তি উল্লেখযোগ্য হবে না। অথচ জেলা প্রশাসক জানিয়েছেন, এমন কোনো প্রতিবেদন তার দপ্তর কেউ পাঠায়নি। মহোদয়, প্রতিবেদন যদি আপনাদের নাও হয়ে থাকে তবে লাভ-ক্ষতির এই মহাজ্ঞানী মতামতের জনক কে— জানতে চাই।
বিজ্ঞানী হিসেবে আমি বিভ্রান্ত। বালুর ভেতরে কী আছে, তা জানতে গবেষণা লাগে। গবেষণার ফল থেকে কী উৎপাদন সম্ভব, তা বুঝতে পরীক্ষাগার লাগে। উৎপাদনের খরচ ও আয় নির্ধারণে লাগে অর্থনৈতিক সমীক্ষা। কিন্তু এসবের আগেই যদি লাভের অঙ্ক মেলানো যায়, তবে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এতদিন বিজ্ঞান পড়িয়ে রাষ্ট্রের সময় ও অর্থ নষ্ট করা হয়েছে কেন?
শুধু একটা কথা মনে রাখবেন, মহোদয়। মাটির খাঁটিত্ব নিয়ে, তার সম্ভাবনা যাচাই করা কঠিন। আর যাচাইয়ের আগেই সম্ভাবনাকে অলাভজনক ঘোষণা করা— এ এক অনন্য দাপ্তরিক বিজ্ঞান।
ইতি
একজন মৃত্তিকাবিজ্ঞানী



