সম্পাদকীয়
কিউডেঙ্গায় ডেঙ্গুবধ পরিকল্পনা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রের সক্ষমতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা কোনো হাসপাতালের ওয়ার্ডে নয়, বরং মানুষের ঘরের আশপাশে জমে থাকা সামান্য পানির পাত্রে। অথচ সেই পরীক্ষাতেই আমরা বারবার ব্যর্থ হচ্ছি। এডিস মশা দিনের পর দিন বংশবিস্তার করছে, মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে, হাসপাতালে রোগীর চাপ বাড়ছে, বাড়ছে মৃত্যুও। তবে এ অবস্থার পরিবর্তনের লক্ষ্যে সুসংবাদ নিয়ে আসছে ‘কিউডেঙ্গা’ টিকা।
দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপের মধ্যে সরকার ব্যক্তিগত পর্যায়ে কিউডেঙ্গা টিকার অনুমোদন ও আমদানির বিষয়ে কাজ করছে। এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য কল্যাণকর একটি উদ্যোগ। টিকাটি ২০২৭ সালের প্রথমার্ধে বাজারে আসতে পারে এবং দেশে এর কোনো ট্রায়ালের পরিকল্পনা নেই। ব্যক্তিগতভাবে কিনে টিকা নেওয়ার সুযোগ থাকলেও দাম বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ বাংলাদেশে অন্তত সংক্ষিপ্ত পরিসরে পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। পাশাপাশি এডিস মশা নিয়ন্ত্রণই কার্যকর পন্থা বলেও উল্লেখ করেছেন।
এখানে একটি প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। টিকা এডিস মশার বিকল্প নয়। ডেঙ্গু ভাইরাস বহন করে এডিস মশা। সেই মশা শহর, গ্রাম, নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত বাড়ি, ছাদ, ফুলের টব, ফ্রিজ-এসি, টায়ার-টিউব, ফেলে রাখা পাত্র কিংবা নানা জলাবদ্ধ স্থানে নির্বিঘ্নে বংশবিস্তার করতে পারে। তাই বাস্তবতাই বলছে, শুধু টিকার ওপর নির্ভর করে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। বাংলাদেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে গবেষণাতেও মশা নিয়ন্ত্রণকে প্রধান ভিত্তি হিসেবে শক্তিশালী ও নিয়মিতভাবে পরিচালনার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। আমাদের ব্যর্থতা এখানেই প্রকট। ২০২৩ সালে বাংলাদেশে ডেঙ্গুর ভয়াবহতম প্রাদুর্ভাবে ৩ লাখ ২১ হাজারের বেশি আক্রান্ত এবং ১ হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যুর কথা ভুলে গেলে হবে চরম উদাসীনতা।
কিউডেঙ্গা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কল্যাণে আসছে। কিউডেঙ্গা অনুমোদন করা হলে সামনে যে প্রশ্ন আসতে পারে তা হলো— বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীতে এর কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা সম্পর্কে আমাদের নিজস্ব তথ্য কতটা আছে? কোন বয়সীদের জন্য এটি অগ্রাধিকার পাবে? আগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত এবং আক্রান্ত না হওয়া মানুষের ক্ষেত্রে এর উপযোগিতা কি একই? দেশে কোন ডেঙ্গু সেরোটাইপ কতটা সক্রিয়—তার সঙ্গে টিকার কার্যকারিতার সম্পর্ক কী? এসব প্রশ্নের উত্তর জনসমক্ষে স্পষ্ট করা দরকার।
কারণ ডেঙ্গুর চারটি সেরোটাইপের বিরুদ্ধে টিকা তৈরি হলেও সুরক্ষা সব সেরোটাইপের ক্ষেত্রে একই মাত্রায় না-ও হতে পারে। বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষায় এ বিষয়টি স্পষ্ট করা দরকার। এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার দিকটিও গুরুত্ব পাবে বলে আমাদের প্রত্যাশা। একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো টিকার দাম। দাম বেশি হবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। কিউডেঙ্গা যদি কেবল সামর্থ্যবান মানুষের নাগালের মধ্যে থাকে, তাহলে এটি জাতীয় ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির বিকল্প হতে পারে না। ধনী ব্যক্তি টিকা নিলেন, কিন্তু পাশের বস্তি বা নিম্ন আয়ের এলাকায় এডিসের প্রজননস্থল রয়ে গেল— তাহলে ভাইরাসের বিস্তার থামবে না। পাশাপাশি ডেঙ্গু রোগীও কমবে না। জনস্বাস্থ্য ব্যক্তিগত সুরক্ষার পাশাপাশি সামষ্টিক সুরক্ষারও বিষয়। তাই কিউডেঙ্গা যেন সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকে সেটা বিবেচনায় রাখা জরুরি।
কিউডেঙ্গা অামদানি করা হলে অাগে ভাবতে হবে দেশের জনগোষ্ঠীতে এর কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা সম্পর্কে নিজেদের তথ্য কতটা আছে। কিউডেঙ্গা ডেঙ্গু প্রতিরোধে ভূমিকা রাখলে সেটা হবে এ উদ্যোগের বড় সাফল্য। অামরা সেই সফলতা কামনা করি।



